সমীরণ মুখ তুলল। মালবিকা আকুল দৃষ্টিতে উত্তরের অপেক্ষায়। তার মনে হল, মেয়েটা সত্যিই ছেলেমানুষ। ছুঁয়ে বললেই ও বিশ্বাস করে নেবে, নাকি এই সময় এই ধরনের কথাই বলতে ভালো লাগে!
‘কোথায় ছুঁয়ে বলব? এখানে ছুঁয়ে?’ সমীরণ ওর বুকের উপর হাত রাখল।
‘হ্যাঁ, ওখানে ছুঁয়ে।’
‘ব্লাউজটা না খুললে ছোঁব কী করে?’
‘পাজি কোথাকার! যত বদ বুদ্ধি!’
‘তা হলে ব্লাউজ ছুঁয়েই বলি?’
‘না।’ মালবিকার স্বর খসখসে হয়ে এল। চোখ আধ খোলা। সামান্য ফাঁক হয়ে রয়েছে ঠোঁট। কপাল ঘেমে উঠেছে। ‘ওরা এসে পড়বে না তো?’
‘থিয়েটার ভাঙতে এখনও অনেক দেরি। রবীন্দ্রসদন থেকে আসতেও সময় লাগবে।’
ব্লাউজের হুকে হাত দিয়ে মালবিকা বলল, ‘আলোটা নিভিয়ে দাও।’
প্রায় এক ঘণ্টা পর শিঞ্জিনীর ড্রেসিং টেবলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির কুঁচির পাট ঠিক করতে করতে মালবিকা বলল, ‘দেরি হয়ে গেল। বলে এসেছি আটটার মধ্যে ফিরব। এখনই আটটা বাজে।’
‘কেন, কেউ কী অপেক্ষা করবে?’ সমীরণ বিছানায় আধ শোওয়া হয়ে দেখছে কত দ্রুত মালবিকা নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে। ‘চুলটা আঁচড়ে নাও।’
শিঞ্জিনীর চিরুনিটা তুলে নিয়ে মালবিকা বলল, ‘কে আবার অপেক্ষা করবে? আমার জন্য তো ভাবে আমার মা।’ আড়চোখে সে সমীরণের দিকে তাকাল। ‘আর কেউ না।’
সমীরণ চোখ মিটমিট করে হাসল। ‘তবু তোমার মা আছে ভাববার জন্য, আমার তো কেউ নেই।’
‘কেন তোমার বউ?’
‘ভাবে না। আলাদা থাকতে চায়।’
‘ডিভোর্স করবে?’ মালবিকার অজান্তেই তার গলায় প্রত্যাশার ছোঁয়া লাগল। সমীরণের কানে সেটা ধরা পড়ল। মনে মনে সে হাসল।
‘এখনও তো ওর শরীর ভালোই রয়েছে বিয়ে করতে পারবে।’ মালবিকা আয়নায় নিজেকে শেষবারের মতো দেখে নিল। সমীরণ উঠে বসল।
‘তা পারবে, আমিও পারব।’ ইঙ্গিতে ভরা হাসি সমীরণের মুখে খেলে গেল। মালবিকার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হল। ‘আমিও পারব’ বলে সমীরণ কী বোঝাতে চাইল?
নীচের থেকে ‘সমীরণদা আছেন নাকি?’ বলে কার ডাক শোনা গেল। সমীরণ তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘কে ভব নাকি? আয় আয়, ঘরে গিয়ে বোস, আমি আসছি।’
ঘরে ফিরে এসে সে মালবিকাকে বলল, ‘আমি ও—ঘরে যাচ্ছি, তুমি চুপচাপ বেরিয়ে যেয়ো।’ পাশের ঘরে যাবার জন্য পা বাড়িয়েও সে ঘুরে এল। মালবিকাকে দু—হাতে বুকে টেনে নিয়ে পিষে জড়িয়ে ধরে দীর্ঘ গভীর চুমু দিল। সমীরণ ছেড়ে দিয়ে মুখ তোলামাত্র মালবিকা বলল, ‘আমি কিন্তু সবসময় তোমার জন্য ভাবব।’
সমীরণ মনে মনে আর একবার হাসল।
.
মালবিকা যথেষ্ট বুদ্ধিমতী আবার যথেষ্ট বোকাও। তার মায়ের মতোই আবেগ, অনুভব, হর্ষ, বেদনা সে চাপা দিয়ে রাখতে পারে না। পার্থিব সুখগুলি পাওয়ার জন্য তার ব্যাকুলতা যে—কোনো চতুর লোকের কাছেই ধরা পড়ে যায়। সে মিহিরকে অপছন্দ করে যেহেতু তার রূপ নেই, গুণ নেই, পরিচিতি নেই। আছে শুধু বিত্ত, যেটা মালবিকার বয়সের চোখে পছন্দের তৃতীয় সারিতে। এর উপরে কাঁধের চামড়ায় রয়েছে একটা সাদা দাগ। আবার মিহিরের মোটরে বেড়াতে, চিনা বা মোগলাই রেস্টুরেন্টে মিহিরের অর্থে খেতে, বাড়ির এবং পাড়ার লোকেদের দেখিয়ে মিহিরের মোটরে চড়তেও তার ভালো লাগে। তার চরিত্রের দুটো বিপরীত দিক রয়েছে এবং তাদের মধ্যে এতকাল কোনো সংঘাত ছিল না। কিন্তু এবার সেটা শুরু হল সমীরণের শোবার ঘর থেকে।
মালবিকা বাড়ি ফিরে দেখে ঘরে কেউ নেই। এই সময় বাবার থাকার কথা নয়, কিন্তু মা? বকুল তখন দোতলায় বড়োজয়ের ঘরে। মেয়ে ফিরেছে খবর পেয়ে তিনতলায় ছুটেই উঠে এল।
‘খবরটা বড়দিকে দিতে গেছলুম।’
‘কী খবর?’
‘দারুণ খবর।’ বকুল খাটে বসেই আবার উঠে দাঁড়াল। ‘তোর বিয়ে! মিহির এই সন্ধেবেলায় বলে গেল তোকে বিয়ে করতে চায়।’
‘ধ্যাত, কী আজেবাজে কথা বলছ!’ মালবিকা শাড়ি বদলাবার জন্য নিজের ঘরে ঢুকল। বকুল তার পিছু নিল।
‘আজেবাজে বলছিস কেন, তোর মত নেই নাকি?’
‘মত—অমতের কথা নয়। এখন বিয়েটিয়ে করা সম্ভব নয়, একদমই নয়। তা হলে গান শেখার বারোটা বেজে যাবে।’
‘সে কী কথা! বিয়ে করে কেউ গাইয়ে হয়নি নাকি! ওসব বাজে কথা ছাড়। আমি রাজি, তোর বাবার ইচ্ছেটাও জানি। দোতলার ওরা তো বলল, মালি ভাগ্য করে এসেছে বটে। উঁচু ঘর, বাপের এক ছেলে, এত ভালো ব্যবসা!’
‘ব্যস, তা হলেই খুব সুপাত্র।’ মালি রেগে উঠল। ‘আমার ওকে পছন্দ নয়।’
বকুল স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে রইল মেয়ের কথা শুনে। বলছে কী? মিহির সুপাত্র নয়!
‘মিহিরকে তোর পছন্দ নয় কেন? বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা, বয়সও কম, দেখতে কুচ্ছিত নয়, লেখাপড়া করেছে, বংশ ভালো। বোন আমেরিকায় পড়ছে—।’
‘থাক থাক। তোমায় আর ওকালতি করতে হবে না। কেন পছন্দ নয় তা অত বুঝিয়ে বলতে পারব না। আমার মোট কথা ওকে ভালো লাগে না।’
‘এটা কি একটা কথা হল? আমাদের সবাইয়ের পছন্দ, তার কি কোনো দাম নেই?’
‘না নেই। বিয়ে করব আমি, আমার পছন্দেরও কি কোনো দাম নেই?’
‘তুই এখনও ছোটো, অভিজ্ঞতা নেই। দামাদামির কী বুঝিস।’
‘ছোটো বলেই তো এখন বিয়ে করতে চাই না। অভিজ্ঞতা আর একটু হোক। ততদিন বিয়ের কথা তুলো না।’
‘এসব কী বোকার মতো বলছিস! অভিজ্ঞতা হতে হতে তো বুড়ি হয়ে যাবি। আমি কোনো কথা শুনতে চাই না, মিহিরকে বিয়ে করতে হবে তোকে। আহ্লাদিপনা দেখলে গা জ্বালা করে। পেটে ধরলুম, মানুষ করলুম, আর আমার ইচ্ছে—অনিচ্ছের কোনো দাম নেই।’ বকুলের গলা চড়ে উঠল। চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। মালবিকার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে খাওয়ার টেবলে একটা চেয়ারে গুম হয়ে বসে রইল।
