কিন্তু কীভাবে সে শোধ নেবে? ভেবেচিন্তে সে ঠিক করল মালবিকাকে আগে মুঠোয় আনতে হবে। সে ওকে বিয়ে করবে। তারপর ওর উচ্চচাকাঙ্ক্ষা ঘোচাবে। বাড়ি থেকে এক পা—ও যদি বেরোয় তা হলে হাত—পা বেঁধে চাবকাবে। যতই সে এইভাবে ভেবেছে ততই একটা তপ্ত শলাকা তার হৃৎপিণ্ডের গভীরে ধীরে ধীরে ঢুকে গেছে। রক্তাক্ত করেছে তার প্রতিশোধ বাসনাকে।
মিহিরের মতো স্থিরবুদ্ধির যুবক যে ভুল চিন্তা করেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কখনো কখনো মানুষ ষড়রিপুর তাড়নায় দিগবিদিক বোধ হারায়, মনের ভারসাম্যতা নষ্ট করে। মিহিরেরও তাই ঘটল। সে মালবিকাদের বাড়িতে যাতায়াত বন্ধ করল না। আগের মতোই রসিকতা করে সে কথা বলে, মোটরে বকুল আর মালবিকাকে সে কয়েকবার নিয়ে গেল পাতিপুকুরে। উমার নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করল। সুধাংশুর পরামর্শ : ডেস্কটপ পাবলিশিং অর্থাৎ ডিটিপি তার প্রেসে চালু করার যৌক্তিকতা মেনে নিল। দক্ষিণেশ্বরে উমা ও বকুলকে নিয়ে পুজো দিয়ে এল। আর একটা কাজ সে করেছে, সমীরণ মিত্রর কাছে আর সে গান শিখতে যায় না। আরও একটা কাজ করেছে, বকুল, দিলীপরঞ্জন ও মালবিকাকে বাড়িতে এনে তার বাবা ও মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছে।
পুত্রবধূ করায় মায়ের আপত্তি নেই, মালবিকাকে তাঁর পছন্দ হয়েছে। ছেলের পছন্দ যখন, বাবা তা মেনে নিতে আপত্তি তুললেন না। এরপর মিহির প্রস্তাবটা দেয় বকুলের কাছে।
ইতিমধ্যে আমরা মালবিকা ও সমীরণের সম্পর্কের খোঁজ নিতে পারি।
গোবরডাঙা থেকে ফেরার সময়কার ঘটনার পর প্রতিভা আর গানের স্কুলে আসেনি। মালবিকা একবার ভেবেছিল খোঁজ নিতে রাজাবাজারে যাবে। কিন্তু কী এক কুণ্ঠা তাকে বাধা দেয়। কপালে হাত দিয়ে সেদিন মুখ ঢেকে থাকলেও কান তো খোলা ছিল। প্রতিভা এখন তাকে কী চোখে দেখবে, কী ধরনের কথা বলবে তা বুঝে উঠতে না পারায় সে আর যায়নি। সমীরণ এখন নিজে তার সংগীত শিক্ষার তত্ত্বাবধায়ক।
মালবিকা সমীরণের সঙ্গে নানান ধরনের আসরে এখন বসছে তানপুরা নিয়ে। দূরদর্শনেও সমীরণের পিছনে তাকে দেখা গেছে। ফলে দত্তবাড়িতে তাকে এখন যে—নজরে দেখা হয়, সেটাই সে চেয়ে এসেছে—গুরুত্ব! সমীরণ প্রতিভাকে টাকা দিত, মালবিকাকে দিল তার থেকে বেশি, তিনশো টাকা।
দোতলায় ছাত্রছাত্রীরা চলে যাবার পর মালবিকাও যখন যাওয়ার উদ্যোগ করছে, তখন সমীরণ তাকে অপেক্ষা করতে বলে পাশের শোবার ঘরে যায়। ফিরে এল তিনটি একশো টাকার নোট নিয়ে।
‘এই নাও, তোমার পরিশ্রমের জন্য।’
জীবনে তার প্রথম রোজগার। মালবিকার ঠোঁট কেঁপে ওঠে কথা বলতে গিয়ে। কথার বদলে চোখ ভরে ওঠে জলে। সে তা হলে একটা কিছু হয়েছে, একটা জায়গায় দাঁড়িয়েছে। সমীরণের পায়ের উপর সে ভেঙে পড়ে। আঁকড়ে ধরে পাতা দুটো।
সমীরণ দুই বাহু ধরে তুলে শুধু একদৃষ্টে মালবিকার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কী সে দেখছিল, খুঁজছিল মালবিকা তা বুঝতে পারল না।
‘কী দেখছেন?’
‘হালকা লাইট গান গাও, ভারী গান তোমার হবে না। সুরেলা গলা দিয়েছেন ভগবান, তাড়াতাড়ি উঠে আসবে তুমি।’
‘শুধু এইটুকুই দেখলেন, আর কিছু দেখতে পাচ্ছেন না?’ মালবিকা পূর্ণ দৃষ্টি মেলে ধরল।
সমীরণের দু—হাত মালবিকার কাঁধে। কাছে টানল সমীরণ। সে পিছিয়ে গেল।
‘বললেন না তো কী দেখতে পেলেন?’
‘বলব সন্ধেবেলায় এসো।’
‘বউদি?’
‘থাকবে না।’
তিনশো টাকা হাতে নিয়ে বকুল আনন্দে কেঁদে ফেলেছিল। এই তিনশো হবে তিন হাজার, তিন হাজার হবে তিন লাখ। সে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল একটা বাড়ি, যেখানে থাকে শুধু মা আর মেয়ে। সদর দরজার বাইরে কৃপা—ভিক্ষুকের মতো বসে আছে দিলীপরঞ্জন। অনেক কষ্ট অনেক অপমান বকুল সহ্য করেছে।
সন্ধ্যাবেলায় আসে মিহির। মালবিকা নেই, বেরিয়ে গেছে। কোথায় গেছে বলে যায়নি। এখন বলে যাওয়ার দরকার আর হয় না। বকুল প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘মালির প্রথম রোজগারের টাকায় কেনা, সব তোমায় খেতে হবে বাবা।’
‘নিশ্চয় খাব।’ মিহিরের হাসিতে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল। তার চোয়াল শক্ত হওয়াটা বকুল লক্ষ করল না।
‘মাসিমা, একটা কথা।’
‘কী?’
‘মালিকে আমি বিয়ে করতে চাই। বাবা—মার এতে অমত নেই। আপনারা মত দিলেই—।’ মিহির শুধু ‘হ্যাঁ’ শোনার জন্য তাকিয়ে রইল। সে এদের মানসিক ও আর্থিক দৈন্যের আদ্যোপান্ত জেনে গেছে।
‘আমাদের মত! বলছ কী বাবা, এ তো আমাদের পরম ভাগ্যি, মালিরও ভাগ্যি।’
কথাটা বলার পর বকুলের চোখ দিয়ে টসটস জল পড়ল। ‘এত বড়ো ঘর! এত ভালো ছেলে! আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। বাবা তুমি সত্যি বলছ তো?’
ঠিক সেই সময় সমীরণের শোবার ঘরে খাটের উপর শিথিলভাবে মালবিকা শুয়ে। সমীরণ বসে তার পাশে।
‘সত্যি বলছ?’ মালবিকার চোখে গাঢ় আবেগ।
‘সত্যি বলছি।’ সমীরণ ঝুঁকে মুখ নামিয়ে আনল। কপালে, গালে, চোখে তারপর আলতো চুমু দিল ঠোঁটে। চোখ বন্ধ হয়ে এল মালবিকার। দু—হাতে সমীরণের মুখটা ধরে ফিসফিস করল, ‘আমিও ভালোবাসি, সত্যি বলছি। তোমাকে ছুঁয়ে।’
মালবিকার বুকে মুখ চেপে ধরল সমীরণ। ওর চুলের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে মালবিকা বলল, ‘সারাজীবন ভালোবাসবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমিও বাসব। সারাজীবন তোমার থাকব।’
‘আমিও থাকব।’
‘আমাকে ছুঁয়ে বলো।’
