‘তুমি ভালো। দেখামাত্র তোমাকে ভালো লেগেছে।’ ফিসফিস করে সমীরণ বলল। ‘প্রতিভাও ভালো।’
‘হ্যাঁ প্রতিভাদি ভালো।’
‘কিন্তু যেমনটি চাই ও তা নয়।’
মালবিকা দেখল মাথা নীচু করে কপালে হাত দিয়ে রয়েছে প্রতিভা। মুখ দেখা গেল না। সমীরণের ডান হাত এখনও তার ঊরুর উপর। একবার জোরে আঁকড়ে ধরেই শিথিল করল আঙুলগুলো। কাঁধ ধরা হাত দুটো এবার সরিয়ে নেবে কি না মালবিকা বুঝতে পারছে না। যদি আবার সামনে ঝুঁকে পড়ে!
সেই সময় ঊরু থেকে হাতটা উঠে এল মালবিকার মাথার পিছনে। মাথাটাকে সামনের দিকে আলতো করে হাতটা ঠেলল। তার মুখটাও নিয়ে গেল সমীরণের মুখের দিকে। মদের কটু গন্ধ তার মুখে ছড়িয়ে যাচ্ছে। মাত্র তিন—চার ইঞ্চির ব্যবধান। দূরত্বটা ঘুচিয়ে দেবে কী দেবে না? তার শরীর, মন আর যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারছে না। আড়চোখে সে দেখল, প্রতিভা একইভাবে কপালে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে স্থির রয়েছে। মিহিরকে তার মনে পড়ল। ‘ঠিক আছে, যাও তুমি।’ ওর ঘাড়ের কাছে একটা সাদা—।
মালবিকা সদ্য যুবতী, বোধ অপরিণত। বয়সকালের আবেগ সে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। সে বড়ো হয়ে উঠেছে শিক্ষা ও রুচিবর্জিত, জীবন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণাবিহীন। তরল মানসিকতাসম্পন্ন অভিভাবকদের আওতায়। সময় এখন একটা ছুটন্ত নেকড়ের মতো, তার থাবার আঁচড় সে দেগে দিচ্ছে মানুষের চেতনায়। মালবিকা উচ্চচাকাঙ্ক্ষী হয়েছে সময়ের দাগানো নির্দেশ মেনে নিয়ে। তার অনেক কিছুই চাই এবং খুবই তাড়াতাড়ি। তার কোমল একটি হৃদয় আছে এবং সময়বিশেষে সেটি কঠিন, স্বার্থপর হয়ে যায়। তার শিক্ষা নেই, ধৈর্য নেই। গুণাবলীও কিছু নেই। অথচ প্রচারমাধ্যমগুলি নিয়ত যে রাশি রাশি স্বপ্ন তৈরি করে চলেছে সেগুলি থেকে নিস্তার পাবার মতো মানসিক জোরও তার নেই। তার বয়সিদের মধ্যে ক—জনেরই বা তা আছে? মালবিকা স্বভাবজাত বাস্তববোধ থেকে এইটুকু বুঝে গেছে, তার তারুণ্য, তার চাপল্যই তার সহায়, পুরুষদের হাতেই যাবতীয় ক্ষমতা এবং পুরুষদের প্রতিরোধশক্তি খুবই ক্ষীণ, তাতে বহু রন্ধ্র আছে। তার একজন পুরুষ দরকার ছিল নিজের ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য। সে পেয়েছিল সমীরণ মিত্রকে। সে দেখতে পেয়েছিল সমীরণের রন্ধ্রগুলোকে, তার দুর্বলতাকে। চার ইঞ্চির ব্যবধানটা সেদিন ঘোচানোমাত্রই সে চূর্ণ করে দিয়েছিল বিখ্যাত ও জনপ্রিয় গায়কটিকে আর সেই সঙ্গে পা বাড়িয়ে দেয় বেপরোয়াভাবে কর্দমাক্ত পথে চলার সাহস। নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নেবার জেদ তাকে পেয়ে বসে। সে জানে তাকে শক্ত হতে হবে, দ্বিধা—সংকোচ মানেই পতন।
উদ্ভট ও অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখা গেছল গোবরডাঙা থেকে ফেরা মোটরগাড়িটার মধ্যে। দু—পাশে দুই নারী মধ্যে এক পুরুষ। পুরুষটির জীবন থেকে এক নারী অস্তাচলে। অন্য নারী উদীয়মানা। পাশাপাশি বসে তারা বিচিত্র একটা পরিস্থিতি তৈরি করল। এর মধ্যে কে যে নির্মম, কে যে করুণ, কে যে সজীব সেটা বিচার করার দায় আমার নয়।
গোবরডাঙা থেকে একা মোটরে ফেরার সময় মিহিরও অসহ্য এক জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতে ভেবেছিল, তার ঘাড়ে একটা দায় চাপল। এই আচরণ এই প্রত্যাখান আর অপমানের শোধ নেওয়ার দায়। সে শিক্ষিত, মার্জিত ও আর্থিক দিক থেকে সম্পন্ন এবং সে জানে মেয়েদের আকর্ষণ করার মতো চেহারা অথবা বিশেষ কোনো গুণ তার নেই। কিন্তু সে চেয়েছিল কারুর কাছ থেকে সাড়া পেতে। হৃদয়ের সাড়া। সে জানে চেহারাটাকে বদলানো, কান্তিমান করে তোলা, আরও দীর্ঘদেহী হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু একটা কোনো গুণ অর্জন, চেষ্টা করলে হয়তো সম্ভব। সে খেলাধুলা করেনি, অভিনেতা হওয়ার যোগ্যতা নেই, গল্প—কবিতা লিখতে পারে না, ছবি আঁকতে জানে না। জনপ্রিয় হবার কোনো পথই তার সামনে নেই। শুধু গানের পথটাই সে দেখতে পায় এবং ক্রমশ সে বুঝে যায় এ—পথেও তার সাফল্য আসবে না। অতি সাধারণ এক গায়ক হওয়া ছাড়া সে আর কিছু হতে পারবে না। সে কোনো মেয়েরই হৃদয় জয় করতে পারবে না। হীনন্মন্যতায় সে আক্রান্ত হয়।
মালবিকাই তাকে প্রথম আশার আলো দেখিয়েছিল। মহাজাতি সদন থেকে গাড়িতে বকুল ও মালবিকাকে রাত্রে বাড়ির সামনে নামিয়ে দেবার পর মালবিকা তার সঙ্গে আলাদা দু—চারটে কথা বলেছিল। মিহিরের সেটা ভালো লাগে। দ্বিতীয় দিন ওদের নিয়ে সমীরণের বাড়ি থেকে ফেরার সময় তার মনে হয়েছিল মালবিকা তার সম্পর্কে কৌতূহলী। সেদিনই সন্ধ্যার তানপুরাটা সে দিয়ে আসে। ফেরার সময় মালবিকা তার সঙ্গে তিনতলা থেকে নেমে এসে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তাকে চটুল আলাপের মধ্যে টেনে নেয়। ‘দূর হও’ বলে মালবিকা তাকে আকাশে ওড়ার জন্য পাখা লাগিয়ে দিয়েছিল। গোবরডাঙায় আসার সময় মিহিরকে সে কয়েকবার হাত ধরতে দেয়।
আমাকে নিয়ে খেলা করার জবাব ওকে আমি দেব, এই চিন্তাটাই মিহিরকে পেয়ে বসে। এক একসময় সে নিজের উপরও রেগে ওঠে। কেন সে চিনতে পারেনি মালবিকাকে। কেন শুধু ওর প্রখর যৌবন, সুন্দর মুখ আর রঙ্গভরা আলাপে নিজের বোধবুদ্ধি হারাল? যতই সে ভেবেছে ততই বুকের মধ্যে ধিকি ধিকি জ্বলেছে অপমানের আগুন। আর একজন হল ওই সমীরণ মিত্তির। তার সামনে থেকেই ছিনিয়ে নিয়ে গেল তার মধুর ভবিষ্যৎ, তাকে উপহাসের স্তরে নামিয়ে দিয়ে।
