‘হ্যাঁ জানি। আর জানি বলেই—’
‘তোমাকে কী বিয়েটা করতেই হবে? না করলেই নয়?
‘করতে হবে। না করলেই নয়।’
‘কিন্তু কেন? তুমি কী আমাকে বিশ্বাস করো না?’
এবার নীরবতা। কিছুক্ষণ পর প্রতিভার গলা মালবিকা শুনল, ‘আর করি না।’ স্বরটা খুব নরম।
‘ওহহ।’
কিছুক্ষণ পর সমীরণ ডান দিক ফিরে মালবিকাকে বলল, ‘অর্ধেকটা খেয়েছি, বাকিটা যদি এখন খাই তোমার অসুবিধে হবে?’
‘না। আমার বাবাও তো খায়।’
ডান দিকের পকেট থেকে সমীরণ হুইস্কির পাঁইটটা বার করল। বোতলটা ডান হাতে মালবিকার সামনে ধরে বলল, ‘ছিপিটা খুলে দাও।’
ছিপির প্যাঁচ ঘোরাবার সময় মালবিকার হাত কেঁপে গেল। সমীরণ কাঁচা মদ ঢক ঢক গিলে নিয়ে গুম হয়ে রইল চোখ বন্ধ করে।
‘কেন যে খাই লোকে তা বোঝে না, তুমি কখনো খেয়েছ?’
‘না।’ মালবিকার গলা থেকে কোনোক্রমে শব্দটা বেরোল। এমন প্রশ্ন কখনো সে শোনেনি। এখন যদি খেতে বলে?
বোতলটা প্রতিভার মুখের সামনে ধরে সমীরণ বলল, ‘নাও।’
‘কী হচ্ছে কী?’ তিক্তস্বর প্রতিভার। ‘একটি অল্পবয়সি মেয়ে, একেবারে নতুন, তার সামনে এইসব বলে তুমি নিজেরই মান খোয়াচ্ছ।’
‘তুমি’? মালবিকা অবাক হল। তা হলে তলায় তলায় এদের সম্পর্কটা তুমির। সম্পর্ক যে একটা আছে সেটা সে আন্দাজ করেছিল, এখন নিশ্চিত হল এবং উত্তেজিতও।
‘নতুন তো একদিন পুরনো হবে, জানবে আমি লোকটা কেমন। কিন্তু পুরনো মদের কী তুলনা আছে। আর লজ্জা করতে হবে না। নাও, নাও।’ অমার্জিত কর্কশ স্বরটা আদেশের মতো। কথাটা বলেই বাঁ দিকে কাত হয়ে সমীরণ বাঁ হাতে প্রতিভার গলা ছড়িয়ে ঠোঁটের উপর হামলা চালাল।
কাঁটা হয়ে রইল মালবিকা। বাঁ দিকে তাকাবার সাহসও সে হারিয়ে ফেলেছে। ডান হাতে ধরা বোতলটা কাত হয়ে যাওয়ায় সমীরণের পাঞ্জাবির উপর অনেকটা মদ পড়ে গেল। মালবিকা বোতলটা আস্তে তুলে নিল নিজের হাতে। একবার আড়চোখে সে তাকাল। ধস্তাধস্তির মতো একটা ব্যাপার চলেছে। সমীরণ দু—হাতে প্রতিভাকে জড়িয়ে ওর বুকে মুখ ঘষছে। প্রতিভা একহাতে ঠেলে মুখটা সরাবার চেষ্টা করছে। কারুর মুখে কথা নেই, শুধু শ্বাস—প্রশ্বাসের ভারী শব্দ। মালবিকার বুঝতে অসুবিধে হল না ব্যাপারটা প্রতিভার মোটেই পছন্দের হচ্ছে না। অবশেষে চওড়া কবজিওয়ালা হাতের মুঠোয় সমীরণের চুল ধরে প্রতিভা মাথাটা সোজা করে দিল হ্যাঁচকা টানে। সমীরণ চাপা স্বরে ‘উহহ’ করে উঠল।
মুঠি থেকে চুলের গোছা ছেড়ে দিয়ে প্রতিভা গুম হয়ে জানলার দিকে বাইরে তাকিয়ে রইল। সমীরণ মালবিকার হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বোতলটা মুখ ধরে উঁচু করল। আর কিছু অবশিষ্ট আছে কি না মালবিকা বুঝতে পারল না তবে বিশ্রী একটা গালাগাল দিয়ে সমীরণ বোতলটা বাইরে ছুড়ে ফেলে দিল।
প্রতিভা নিশ্চয়ই অনুমান করেছিল এইরকম কিছু ঘটতে পারে আর সেজন্যই বোধহয় তাকে সঙ্গে যেতে বলেছে। নতুন ছাত্রীর সামনে সমীরণ অসভ্যতা করবে না, এটাই সে ভেবে নিয়েছিল। মালবিকা বুঝে উঠতে পারছে না এখন সে কী করবে। কিন্তু তার করারই বা আছে কী? ব্যাপারটা সম্পূর্ণতই ওদের দুজনের মধ্যে, এ—ক্ষেত্রে তার নিরপেক্ষ থাকাই উচিত। বাড়ি থেকে অনেক দূরে, অন্ধকারের মধ্যে ছুটন্ত মোটরগাড়িতে, অল্প পরিচিত দুটো মানুষ আর একদমই অপরিচিত ড্রাইভার, পরিস্থিতিটা থমথমে এবং বিস্ফোরক। এমন অবস্থার মধ্যে পড়ে তার বুক শুকিয়ে যাচ্ছে। দেহ শক্ত করে কাঠের মতো বসে থাকা আর প্রতিভার জন্য সহানুভূতি জড়ো করা ছাড়া তার আর কী করার আছে? এখন তার মনে হচ্ছে মিহিরের গাড়িতে উঠলেই ভালো হত।
বুকের কাছে মুখ ঝুলিয়ে দিয়ে সমীরণ বসে। বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। মালবিকা শোনার করল চেষ্টা।
‘এত করেছি, তবু আরও চাই…বিয়ে করতে হবে, কেন?…ফুঃ, বিয়ে করলে মুটকিটাকে কেন করব! উঃ, এই ধুমসিকে?’
মালবিকার বাম ঊরুর উপর সমীরণের হাত এসে পড়ল। চমকে উঠে সে প্রথমেই ভাবল, হাতটা সরিয়ে দেবে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল মদ খেয়ে বাড়ি ফেরা দিলীপরঞ্জনকে। যখন চড়চাপড় মারে, মা না চেঁচিয়ে ঝগড়া না করে বাবাকে ধরে শোয়াবার চেষ্টা করে। উত্তেজনা উসকে দেবার মতো কোনো বাধা না পেয়ে বাবা ঝিমিয়ে আসে। সমীরণের হাতটা সে সরাল না। চড়চাপড় হয়তো মারবে না তবে গাড়ি থামিয়ে এখন যদি বলে ‘নেমে যাও!’ তা হলে সে কী করবে!
সমীরণের মাথাটা আর একটু ঝুলে পড়েছে। চাকা গর্তে পড়ে গাড়ি যখন লাফিয়ে উঠছে সমীরণের তখন হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হচ্ছে। একবার সামনের সিটে মাথা ঠুকে গেল।
‘মালবিকা ওকে সিধে করে বসিয়ে দাও তো।’
প্রতিভা মুখ বাইরের দিকে রেখেই বলল। স্বরের মধ্যে নিস্পৃহতা ছাড়া আর কিছু নেই। মালবিকা দুটো কাঁধ ধরে সমীরণকে টেনে তুলে সিটের পিছনে হেলান দেওয়াল। সবল, পুষ্ট কাঁধ আর বাহুর পেশি। সে দু—হাতের আঙুল ছড়িয়েও আঁকড়ে ধরতে পারছে না।
‘আমি ঠিক আছি।’ বলে সমীরণ সিধে হয়ে বসতে চেষ্টা করল। ‘ওইটুকু খেয়ে সমীরণ মিত্তিরের কিছু হয় না।’
মালবিকা জোর করে চেপে ধরে রইল। সমীরণ তার দিকে মুখ ফিরিয়ে অনেকক্ষণ কী যেন দেখার চেষ্টা করল। গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে আসা হালকা কুয়াশার মতো অস্বচ্ছ আলোয় মালবিকা দেখল পাতলা ঠোঁট, একটা তিল, বাঁকা দুটি সরু ভুরু আর স্থির দৃষ্টিতে থাকা দুটি হালকা ধূসর চোখের মণি। মহাজাতি সদনে এই চোখের চাহনিতে তার বুক কেঁপে উঠেছিল।
