ওরা তিনজন বিভ্রান্ত বিষণ্ণ হয়ে সন্ধ্যায় দালানে বসে ছিল। অবিনাশকে লক্ষ করে অনন্ত বলে, ‘কাকা কী করব বলুন? পরে সবাই আমাকে বলবে, হাত—পা বেঁধে মেয়েটাকে দাদা জলে ফেলে দিল, তা হতে দেব না।’
‘এমন ঘর, জল ভাবছিস কেন?’
‘বয়সের পার্থক্যটা? অনুর প্রায় দ্বিগুণ!’
‘এমন পার্থক্যে কি বিয়ে হয় না? আমার মা আর বাবার মধ্যে পার্থক্য তো একুশ বছরের, কোনো অসুবিধা হয়নি…বাহান্ন বছর দিব্যি কাটিয়ে গেছে একসঙ্গে।’
‘সে আমলে ওসব হত এখন কি আর হয়?’
শীলা অস্ফুটে বলল, ‘গিয়েই ছেলে ধরতে হবে। লেখাপড়ার কথা নয় ধরছি না, পুরুষমানুষের রোজগারই আসল গুণ।’
অনন্ত বুঝতে পারছে না সে রাজি হবে কি হবে না। শীলার খুঁতখুঁতনি বিপত্নীক হওয়ার জন্য। অবিনাশের মত আছে।
‘আমার মনে হয় অনুকেই জিজ্ঞাসা করা উচিত…ওর মতামতটাই আসল। ও যদি রাজি থাকে তা হলেই আমরা এগোব।’
অনু ঘরে ছিল। সব কথাই তার কানে গেছে। অনন্তর কথাগুলো শেষ হওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরই ঘর থেকে তার গলা শোনা গেল।
‘আমার অমত নেই, তোমরা যেখানে বিয়ে দেবে সেখানেই বিয়ে করব।’
ওরা স্বস্তিবোধ করেছিল। কিন্তু অনন্তের বুকের মধ্যে শুরু হয়ে যায় নতুন একটা খচখচানি। সে মুখ নামিয়ে বসে থাকে।
তখন অবিনাশ মৃদুকণ্ঠে বলেন, ‘যার যেখানে অন্ন বাঁধা সেখানেই পাত পাততে হবে।’
এক মাসের মধ্যেই অনুর বিয়ে হয়ে গেল। পাত্রের দাদা ও সম্পর্কিত মামা এসে মেয়ে দেখে পছন্দ করে যায়। অনু বলেছিল, তার কোনো বন্ধুকে সে নিমন্ত্রণ করবে না। প্রায় নিঃসাড়েই বিয়ে হল। সদরে বাড়তি একটি বালব ছাড়া বিয়েবাড়ির কোনো চিহ্ন ছিল না। বরের সঙ্গে এসেছিল চারজন। উঠোনে উনুন পেতে রান্না হয়, খাওয়া হয় দালানে। পাড়ায় কাউকেই তারা বলেনি, শুধু সাধন বিশ্বাস আর তার ছেলে উৎপলকে নিমন্ত্রণ করেছিল। তিনি আসেননি শরীর ভালো না থাকায়, উৎপল এসে একটা তাঁতের শাড়ি দিয়ে গেছে। দোতলার জ্যাঠামশাই বাদে আর সবাই খেয়ে গেছে। দু—তিনজন কাঙালি সদরের সামনে অপেক্ষা করে করে বিরক্ত হয়ে চলে যায়।
পরদিন বর—বউ বাড়ি থেকেই হাওড়া স্টেশনে যায়। ওদের ট্রেনে তুলে দিতে সঙ্গে গেছল অনন্ত। অনু ট্যাক্সিতে ওঠার সময় কাঁদেনি। ট্রেন ছাড়ার মুহূর্তে কেঁদে উঠবে এমন একটা ব্যাপারের জন্য সে তৈরি ছিল। ট্রেন ছেড়ে দিল। অনন্ত দেখল হাজার বছরের পুরোনো কাঠের মতো শুকনো মুখ নিয়ে তার বোন একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে বসে। মুখটাকে চিরকালের মতো অনন্তের বুকে খোদাই করে দিয়ে ট্রেনটা চলে গেল।
আট
অনন্ত ঠিক করেছিল অলুর বিয়ে এমনভাবে দেবে যাতে ওর মনে কোনো খেদ না থাকে।
বি এ পাশ করার দু—বছর পর অলু ফুড কর্পোরেশনে চাকরি পায়। নিজের চেষ্টাতেই জোগাড় করেছে। অনন্ত শুনে থ হয়ে গেছিল। তাদের বাড়ির মেয়ে চাকরি করবে দশটা—পাঁচটা! বিস্ময়টা ক্রমশ ভয়ে রূপান্তরিত হয়ে তাকে কিছুদিন নানান অশুভ ভাবনায় ডুবিয়ে দিয়েছিল। প্রায়ই তার মনে হত, অলু বাবার মতো বাস চাপা পড়ে মরে যাবে। এই পরিবারের মধ্যে অলু একটু আলাদা ধরনের। অমরের সঙ্গে ওর মিল আছে। কলেজে পড়ার সময় কিছু ছেলেমেয়ে ওর সঙ্গে দুপুরে বা বিকেলে আসত। বাড়ি ফিরে অনন্ত সে খবর পেত শীলার কাছে।
‘অলুর বন্ধুরা বেশ মিশুকে। মুড়ি খেতে চাইল, আমি বললুম দোকানে যাবার লোক নেই, ওদেরই একজন মুড়ি, বেগুনি কিনে আনল। চা করে দিলুম। ছেলেগুলো বেশ।’
‘ছেলে?’
‘ওর সঙ্গেই পড়ে।’
অলু কলেজ ইউনিয়নের সহ—সম্পাদিকা হয়েছিল। অনেকদিনই সে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরত। অনন্তের সেটা ভালো লাগত না।
‘ওকে বলে দিয়ো বিকেল থাকতে থাকতেই যেন বাড়িতে ঢোকে। এ—বাড়ির মেয়েরা সূর্য ডুবলে বাড়ির বাইরে থাকে না।’
‘বিকেলে টিউশানিতে যায়, হয়তো কোনো কারণে দেরি হয়েছে।’
একদিন শীলা একটি পাতলা পত্রিকা অনন্তকে দেখাল। ‘অলু কেমন পদ্য লিখেছে দেখ।’
অনন্ত অবাক হয়ে পত্রিকার পাতাটার দিকে তাকিয়ে থেকেছিল। ছাপার অক্ষরে তাদের কারোর নাম সে জীবনে এই দ্বিতীয়বার দেখল। বাবার বাসচাপা যাওয়ার খবরটার সঙ্গে ‘শক্তিপদ দাস’ নামটা খবরের কাগজে বেরিয়েছিল।
ষোলো লাইনের পদ্যটা তিন—চারবার সে পড়ে। একদমই মাথামুণ্ডু বুঝতে পারেনি। কিন্তু ‘স্তন’ আর ‘চুম্বন’ শব্দদুটি তাকে রীতিমতো ভয় পাইয়ে দেয়। অলুর হাত দিয়ে এইসব নোংরা জিনিস বেরোয় কী করে? একটা মেয়ে! তাদের বাড়ির মেয়ে এইসব অসভ্য চিন্তা করছে আর পাঁচজনকে তা জানাচ্ছে, লোকে কী ভাববে! তারই বোন, তার সম্পর্কে কী ধারণা হবে? পাড়ার কেউ পড়েছে কি না কে জানে।
অলুর পদ্যটা কয়েকদিনের জন্য তাকে সন্ত্রস্ত রেখেছিল। সে আবার ভয় পায় যখন শীলা বলল, ‘অলু দু—দিনের জন্য বন্ধুদের সঙ্গে দিঘায় বেড়াতে যাবে।’
‘কী দরকার যাবার?’
‘মানুষ বেড়াতে যায় না? এই তো ওপরের ওরা পুরী—টুরি ঘুরে এল।’
‘ঘুরুক গে, পয়সা আছে তাই গেছে।’
‘তোরও তো পয়সা আছে, সেদিন তো বললি এখন সাড়ে ছ—শো টাকা মাইনে। আমায় নিয়ে চল না, কাশীটা একবার দেখে আসি।’
‘শুনতেই ওই সাড়ে ছ—শো। হাতে আর একটু জমুক। জিনিসপত্রের দাম কত বেড়েছে জানো? একজোড়া কাঁচকলা চল্লিশ পয়সা, শুনেছ কখনো?’
