‘সমীরণদার কাণ্ডটা দেখেছ?’ মালবিকা ফিসফিসিয়ে বলল। মিহির কথা বলল না। কিছুক্ষণ পর অস্ফুটে মিহির বলল, ‘ড্রিঙ্ক করেছে।’
মিহিরের সঙ্গে দু—তিনবার কথা বলার চেষ্টা করল মালবিকা। হুঁ, হ্যাঁ ছাড়া জবাব পেল না। এবার মালবিকা বিরক্ত হয়ে ভাবল, তানপুরা দিয়ে আর মোটরে চড়িয়ে কি ভাবছে আমি ওর কেনা বাঁদি হয়ে গেছি? হঠাৎ—ই মিহিরের প্রতি বিতৃষ্ণা বোধ করল, আর মনে পড়ল ওর কাঁধে একটা সাদা দাগ আছে।
মালবিকা গোনেনি সমীরণ ক—টা গান গাইল। নিধুবাবু, নজরুল, নিজের দেওয়া সুরে রাগপ্রধান, দ্বিজেন্দ্রলাল, নানান জনের লেখা বোধহয় পনেরোটি গান।
‘ক—টা গাইল গুনেছ?’ সে মিহিরকে জিজ্ঞাসা করল।
‘না। গোনার জন্য আসিনি, শোনার জন্য এসেছি।’
মিহিরের বলার ভঙ্গিতে মালবিকা অপ্রতিভ হয়ে চুপ করে রইল।
‘এগারোটার মধ্যে পৌঁছে দেব বলে এসেছি। আমি গাড়িতে আছি তুমি তাড়াতাড়ি এসো।’ মিহির তার গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
আসর থেকে বেরিয়েই সমীরণদের গাড়িতে ওঠার কথা। একটু হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠতে হবে। বাইরে আসামাত্র অটোগ্রাফ নেবার জন্য একটা ভিড় সমীরণকে ঘিরে ফেলল। কখনো দাঁড়িয়ে কখনো চলতে চলতেই সে সই করে যাচ্ছিল।
কাঁধে একটা টোকা পড়তেই মালবিকা পিছনে তাকাল।
‘প্রতিভাদি।’
‘তুমি আমাদের গাড়িতে এসো।’
‘সে কী! আমি তো মিহিরদার গাড়িতে এসেছি।’
‘ফেরাটা নয় আমাদের গাড়িতেই হোক। এসো না।’
কীরকম একটা কাতর আবেদনের মতো শোনাল ‘এসো না’। মালবিকা ইতস্তত করে বলল, ‘মিহিরদা কী মনে করবেন।’
‘কিছু মনে করবে না। বলবে প্রতিভাদি অনেক করে বলছেন।’
‘সমীরণদাকে বলা দরকার।’
‘বলো। তবে আমার নাম কোরো না।’
মালবিকা প্রায় ছুটেই সমীরণের কাছে গেল। কয়েকজন কর্মকর্তা তখন ওর সঙ্গে চলেছে তাকে গাড়িতে তুলে দিতে।
‘সমীরণদা একটা কথা।’
মোটরের কাছে দাঁড়িয়ে পড়ল সমীরণ। মালবিকা তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নীচু গলায় বলল, ‘আমি আপনার সঙ্গে যাব।’
‘আমার গাড়িতে? কিন্তু মিহির কিছু মনে করবে না?’
‘করুক। আমি আপনার সঙ্গে যাব।’ গলায় আবদার ছাড়াও মালবিকা অনুরোধকে আন্তরিক করতে সমীরণের কনুই আঁকড়ে ধরল। মদের গন্ধ সে চেনে, সমীরণের মুখ থেকে ক্ষীণভাবে সে গন্ধ পেল। বোধহয় আসরে আসার আগে সেক্রেটারির বাড়িতে অপেক্ষার সময় খেয়েছে। প্রতিভা গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে, তাকিয়ে রয়েছে তাদের দিকে।
‘বেশ, চলো।’ সমীরণ গাড়ির দরজায় হাতলে হাত রাখল। ‘মিহিরকে বলে এসো।’
একটু দূরে মিহির তার গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছে। মালবিকাকে হনহনিয়ে আসতে দেখে সে ইঞ্জিন চালু করল।
‘আমি সমীরণদার গাড়িতে যাব।’
‘সে কী!’
‘সমীরণদা বললেন একপিঠ তো মিহিরের গাড়িতে এলে এবার ফেরাটা আমার গাড়িতে। এমনভাবে বললেন যে না করতে পারলুম না।’
‘সে কী!’ মিহিরের স্বরে এবার বিস্ময়ের বদলে ফুটে উঠল অধৈর্যতা। ‘যার সঙ্গে এলে তার সঙ্গেই তো ফেরার কথা! আর তুমি হ্যাঁ বলে দিলে?’
‘কী করব। বললুম তো, এমনভাবে উনি বললেন যে—’, মালবিকা থমথমে মুখটা দেখে কথা অসমাপ্ত রাখল।
‘এমনভাবে বললেন। কীভাবে বললেন? ওর মুখে গন্ধ পাওনি?’
‘পেয়েছি। মদ খেয়েছেন। তা কী হয়েছে? উনি কী গাড়িতে আমার রেপ করবেন? ড্রাইভার রয়েছে, প্রতিভাদি রয়েছে। এত নীচ কেন তোমার মন?’ কথাটা বলেই তার মনে হল, না বললেই ভালো হত। মিহিরকে তার আরও অনেকবার দরকার হবে। কিন্তু সমীরণকে দরকার আরও বেশি। তার ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেবার লোক তো ওই একজনই। বকুলও তাই বলে।
‘এটা ভদ্রতারও ব্যাপার। যার সঙ্গে আসা, উচিত তার সঙ্গেই যাওয়া। ঠিক আছে যাও তুমি’। মুখটা কালো হয়ে বসে গেছে। মিহির দাঁত চেপে নিজেকে সামলে রাখল।
‘রাগ করলে?’ জানলা গলিয়ে মিহিরের কাঁধে হাতটা রেখেই সে তুলে নিল। মিহির গাড়ি ছেড়ে দিল।
গাড়িতে বসে সমীরণ আর প্রতিভা অপেক্ষা করছে। অন্য গাড়িটা বিজনবাবু, সোমনাথবাবু আর বাজনাগুলো নিয়ে রওনা হয়ে গেছে। প্রাইভেট ট্যাক্সি, অবাঙালি হিন্দিভাষী ড্রাইভার, গ্যারেজ কলকাতায়। ওধারের জানলায় প্রতিভা, মাঝখানে সমীরণ। মালবিকা গাড়িতে উঠে সমীরণের ডানদিকে বসল।
গাড়ি গোবরডাঙা থেকে বেরোবার পরই সমীরণ ক্লান্ত শরীরটা পিছনে হেলিয়ে, নাগরা জোড়া খুলে পা দুটো ছড়িয়ে বলল, ‘এতগুলো গান গাওয়া সত্যিই কষ্টের।’
একটা পা মালবিকার বাঁ পায়ের পাতার ওপর রাখা। টেনে নিতে গিয়েও সে নিল না। বলল, ‘তা হলে কম গাইলেই তো পারেন।’
‘পারি না। প্রতিভা জানে কেন পারি না।’
‘আমি? আমি কী করে জানব।’ প্রতিভা এতক্ষণ জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। মুখ ফিরিয়ে সে কথাটা বলার সঙ্গেই, মালবিকার মনে হল, ডান পা টেনে নিয়ে বাঁ দিকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল।
‘তুমি জানো না? ন্যাকামো কোরো না। আমার বউ কী জিনিস তুমি জানো না?’ সমীরণ মাথাটা পিছনের গদিতে চেপে মুখ তুলে বড়ো একটা শ্বাস ফেলল। আড়মোড়া ভাঙার মতো করে দু—হাত তুলল। ডান হাত নামাল, বাঁ হাত প্রতিভার কাঁধের পিছনে সিটের উপরে রাখল।
প্রতিভা জবাব দেয়নি। সমীরণ আবার বলল, ‘আমার অসুবিধেটা তুমি জানো প্রতিভা।’
মালবিকা ডান দিকে মুখ ঘুরিয়ে বাইরে তাকিয়ে। অন্ধকার রাস্তা। বাড়ির আর দোকানের ছাড়া কোনো আলো নেই। একঘেয়ে অন্ধকার। কিন্তু তার বাঁ দিকে একটা ব্যাপার হচ্ছে যেটা একঘেয়ে নয়।’
