প্রতিভা আর কথা না বলে জোরে হাঁটতে শুরু করল। ওর সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে মালবিকাকে আধা—দৌড় দিতে হচ্ছে।
‘আস্তে প্রতিভাদি।’
প্রতিভা মন্থর হয়ে হেসে ফেলল, ‘খুব জোরে হেঁটে ফেলেছি, না? মোটা হয়ে গেলেও আমি কিন্তু হাঁটায় তোমায় হারিয়ে দিতে পারি। এইবার বাঁ দিকে কেশব সেন স্ট্রিটে।’
ওরা বাঁ দিকের রাস্তা ধরে রাজাবাজারের মোড়ের কাছাকাছি এসে বড়ো মসজিদের আগের গলিটায় পৌঁছল।
‘কি, ভয় করছে?’ প্রতিভা দাঁড়িয়ে পড়ল।
মালবিকা দু—ধারে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, ‘না।’
কলকাতার যে—কোনো একটা বড়ো রাস্তার মোড় যেমন হয় এই মোড়টা তার কাছে তেমনই লাগল, শুধু দারিদ্র্যের ছাপটাই প্রকট। দোকানগুলোয় ঔজ্জ্বল্য নেই, ভিড়ে রাস্তায় চলা বিরক্তিকর, ফুটপাথ আছে কী নেই বোঝা যায় না। পোশাক বা দোকানের সামগ্রী থেকে বোঝা যায় এখানে অভাবী মানুষই বেশি। অনেকগুলো খাওয়ার হোটেল। কাঠের টেবল আর বেঞ্চ ছাড়া হোটেলে আসবাব নেই। হিন্দু নামের সাইনবোর্ড লাগানো কয়েকটা মিষ্টির দোকান দেখে মালবিকা বলল, ‘প্রতিভাদি এইসব হোটেলে, মিষ্টির দোকানের মিষ্টি কখনো খেয়েছেন?’
প্রতিভা গলির মধ্যে ঢুকল। সরু গলি। পাকা বাড়িগুলোর সঙ্গে টালি ও টিনের ছাদওলা কাঠের দোতলা বাড়িও রয়েছে। একটা ঠেলাগাড়ির জন্য দেয়ালে প্রায় লেপটে গিয়ে প্রতিভা বলল, ‘না, একদম বাজে খাবার। তবে বাড়ির থেকে হোটেলে খাওয়াটা সস্তায় হয়, রুটি আর গোরুর মাংস। একটু পরে দেখবে হোটেলগুলোয় কী ভিড়!’
রাস্তা থেকে একহাত উঁচুতে সদর দরজা। দরজার কাঠের অবস্থা শোচনীয়। একফালি পথ, দু—ধারে ঘর, ঘরগুলোয় একটিমাত্র ছোটো জানলা, তারপর দোতলার সিঁড়ি যেটা চওড়ায় দু—হাত।
‘দেখে উঠো, সিঁড়িতে নানান জিনিস পড়ে থাকে অনেক সময়।’
দোতলায় সরু শিক লাগানো বারান্দা। পর পর দুটি ঘর প্রতিভাদের। দ্বিতীয় ঘরটায় থাকে সে। দরজায় নীল রঙের পর্দা। ঘরের একধারে তক্তপোশ। অন্যধারে একটা তানপুরা আর হারমোনিয়াম। প্রতিভার বাবার বৈঠকখানায় একটা লন্ড্রি আছে, এখন তিনি দোকানে। ওর মা—র সঙ্গে আলাপ করে মালবিকার ভালো লাগল।
প্রতিভার মা দুর্গা ঘর দুটো পরিষ্কার ফিটফাট রেখেছেন। চারদিকের নোংরা অপরিচ্ছন্নতার মধ্যে এদের সংসারটা যেন একটা বাগান।
‘আমি চা করে আনছি।’ দুর্গা রান্নাঘরে যাবার জন্য খাট থেকে উঠলেন। চারটে কাঠ দিয়ে উঁচু করা খাটটা বোধহয় ওনার বিয়েতে পাওয়া। খাটের নীচে সংসারের নানান জিনিস রাখা।
‘শুধু চা কিন্তু মাসিমা।’ মালবিকা তাড়াতাড়ি জানিয়ে দিল।
‘কেন! একটু মিষ্টিমুখ করবে না? প্রথম দিন এলে।’
‘মিষ্টি আমি একদম খাই না।’
‘একটু আগেই আমি ওকে বলেছি এখানকার খাবারগুলো বাজে।’ বলেই প্রতিভা জোরে হেসে উঠল।
‘না না, সে জন্য নয়। সত্যিই আমি মিষ্টি খাই না।’ কথাটা বলে মালবিকার হাসি পেল। মহাজাতি সদনে সমীরণের দেওয়া মিষ্টি সে খায়নি, বলেছিল, ‘খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।’ বলেছিল, ‘এইমাত্র ছেড়েছি।’ কীরকম অবাক চোখে সমীরণ তার দিকে তাকিয়ে জুঁই ফুলের মালাটা তাকে উপহার দিয়েছিল। মালবিকার মনে হয়েছে ওইটেই সেই মুহূর্ত যখন সে সমীরণের চোখ টেনেছিল। পরে সংশোধন করে নিজেকে সে বলে, সমীরণের মন টেনেছিল, তা যদি না হত, তা হলে সমীরণ কেন তার পিঠে আঙুল দিয়ে—।
‘কী ভাবছ অত? বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাচ্ছে?’ প্রতিভা জিজ্ঞাসা করল।
‘আমার বাবা একটু ভিতু ধরনের। মেয়ের বাড়ি ফিরতে দেরি হলে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে।’ মালবিকা কথাটা বলে মজা পেল। বাবা তার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে, ভাবা যায়!
চা—এর সঙ্গে দুটো বিস্কুট খেয়ে সেদিন মালবিকা বেরিয়ে আসে। প্রতিভা তাকে বাস স্টপ পর্যন্ত এগিয়ে দিতে চেয়েছিল। সে বারণ করে।
.
সমীরণ ঠিক দু—ঘণ্টাই গাইল। দেড় হাত উঁচু আসর ঘিরে জমি ও গ্যালারিতে কয়েক হাজার শ্রোতা। যাত্রার জন্য সাত—আটটা মাইক্রোফোন আসরের উপর ঝুলছে। মালবিকা আর মিহির জমিতে ফরাসের উপর বসে। তাদের মুখোমুখিই আসরের মাঝখানে বসেছিল সমীরণ আর তার সামান্য পিছনে, বাঁ দিকে ছিল প্রতিভা।
সমীরণের আসরে এসে বসা, গান গাইবার সময় শ্রোতাদের দিকে তাকানো, তবলচির দিকে মুচকি মুচকি হাসি, মাথা নাড়া, চোখ বন্ধ করা ইত্যাদি ওর প্রত্যেকটি সঞ্চালনই যেন মেপে করা এবং দেখতে ভালো লাগে। ওর জনপ্রিয়তার পিছনে এইগুলিরও অবদান রয়েছে।
মালবিকা প্রথম গান থেকেই লক্ষ করল সমীরণ গাইছে তার দিকেই তাকিয়ে। মাথার দোলানি, ভ্রূ তোলা, মুখ টিপে হাসা সবই যেন তার জন্য। নিধুবাবুর একটা গানের শেষ দুটো পঙক্তি ছিল—’ছলে বলে কৌশলে, মালিনীরে ফাঁকি দিলে। উভয়ের মন অন্তঃশীলে, বহে ফল্গু নদী যেমন।’ সমীরণ মালিনী শব্দটাকে দু—ভাগ করে শুধুই ‘মালি’ শব্দটাকে গলায় খেলাতে থাকে অনেকক্ষণ পরে। ঊর্ধ্বাঙ্গ দুলিয়ে, কখনো চোখ টিপে, সাজানো দাঁতগুলোর ঝলসানি দিয়ে বারবার সে ‘মালি’ শব্দটাকে সুরের বাহারে সাজিয়ে তুলতে লাগল এবং মালবিকার দিকে তাকিয়ে।
ব্যাপারটা যে সে বুঝেছে সমীরণকে তা জানাবার জন্য মালবিকা ভ্রূকুটি করে নাক কুঁচকে কয়েকবার হাসল। তারপর পাশে বসা মিহিরকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখল মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে আর গম্ভীর। ব্যাপার কী? সমীরণ তার নামটা নিয়ে এমন করে গাইছে বলে মিহিরের কি পছন্দ হচ্ছে না? এত লোক শুনছে অথচ মিহির ছাড়া কেউ জানে না সমীরণের এই ‘মালি’টি কে! এটা ভেবে মালবিকা মজা পেল।
