প্রথম দিন ক্লাসের শেষে প্রতিভা তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার বাড়ি কোথায়?’
‘কাছেই, এই গৌরীবাড়িতে। আপনার?’
‘আমারও কাছেই বাড়ি তবে তোমার উলটোদিকে, রাজাবাজারে।’
‘ওটা তো মুসলমান পাড়া?’
‘হ্যাঁ, তাতে কী হয়েছে?’
‘ভয় করে না?’
প্রতিভা হেসে উঠে মাথা নাড়ে। ‘আজ চব্বিশ বছর ওখানে আছি। রাজাবাজারের মোড়ে বড়ো মসজিদটা দেখেছ? তার পাশেই আমরা ভাড়া থাকি। হিন্দু—মুসলমানের মধ্যে কোনো দাঙ্গা বা গোলমাল হতে দেখিনি। শুনেছি চৌষট্টি সালে দাঙ্গা বাধাবার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু ওখানে বাধেনি। বেশ, তুমি চলো আমার সঙ্গে, নিজের চোখে দেখে আসবে। বাড়ি ফেরার তাড়া নেই তো?’
‘চলুন, আমার কোনো তাড়া নেই।’
মালবিকার খুব ভালো লেগে গেছে প্রতিভাকে। গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের থেকে লম্বা এবং আনুপাতিক হারে চওড়া। মোটা কবজি, চওড়া কাঁধ। ঘাড়ে পিঠে মেদ জমেছে, তলপেটের পেশি আর টানটান নেই। শান্ত চোখ, কথাও বলে শান্ত ভাবে। প্রথম দিনেই ধৈর্য ধরে সে মালবিকার অপটুত্বকে যত্ন নিয়ে শোধরাবার চেষ্টা করেছে।
মালবিকার শুধু একটাই ভয় ছিল, তাচ্ছিল্য বা বাঁকা মন্তব্য যেন না তাকে সইতে হয়। হয়নি। প্রতিভাকে সত্যিই তার দিদি বলে মনে হয়েছে।
আমহার্স্ট স্ট্রিট অর্থাৎ রামমোহন রায় সরণি ধরে দক্ষিণ দিকে ওরা হাঁটছিল। মালবিকা কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘প্রতিভাদি, সামনের মাসেই আপনার বিয়ে?’
‘কে বলল?’
‘সমীরণদার কাছে শুনেছি। উনি দুঃখ করে বলেন আপনার বোধহয় আর কিছু হবে না। সারাক্ষণ গান নিয়ে পড়ে না থাকলে তার কিছু হয় না। আপনাকে ওঁর সেরা ছাত্রী বললেন।’
‘শুধু ছাত্রী, আর কিছু নয়?’
প্রতিভার স্বরে কেমন যেন একটা বিদ্রূপের মতো স্পর্শ ছিল যেটা মালবিকাকে আরও কৌতূহলী করে দেয়।
‘আর কিছু মানে?’
প্রতিভা জবাব দেয়নি। মালবিকা হাঁটতে হাঁটতে আড়চোখে দেখল নরম মুখটা হঠাৎ যেন কঠিন হয়ে গেল।
‘যার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে তিনিও কি গান করেন?’
‘একদমই না। ভদ্রলোক বর্ধমান জেলার কোনো এক থানার ছোটোবাবু। বউ গায়ে আগুন দিয়ে মরেছে। সম্বন্ধটা এনেছে আমার দূর সম্পর্কের এক বউদি। ভদ্রলোকের ছেলেপুলে নেই, বর্ধমান শহরের ধারে দোতলা বাড়ি করেছেন, বয়স বিয়াল্লিশ, মাসে উপরি হাজার পাঁচেক টাকা। এমন পাত্র ভারতবর্ষে ক—টা পাবে? বাবা, মা দিনরাত শোনাচ্ছে, এখনই আমার বিয়ে করে ফেলা উচিত। আমার ছোটো দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। মালবিকা, আমার বয়স এখন বত্রিশ, ওদের মতে এই বয়সে চার সন্তানের মা হয় মেয়েরা, আমি কেন এখনও হইনি? এ তো এক বড়ো বিদঘুটে সমস্যা।’
প্রতিভার মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। মালবিকাও হাসল। ‘আপনি তো লেখাপড়া শিখেছেন?’
‘বিএ, ইতিহাসে অনার্স ছিল।’
‘এত ভালো গান জানেন!’
‘তাতে কী হল? এত গুণ আছে যখন চাকরিও তখন পেতে পারি, তাই তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘একটি চাকরি জোগাড় করে দিতে পারো?’
মালবিকা চুপ করে পাশাপাশি হেঁটে বলল, বাঁ দিকে একটা পার্ক। সেটা ছাড়িয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিট থানা তার উলটোদিকে সিটি কলেজ।
‘লোকের মুখে সবসময় শুনবে, লেখাপড়া জানে তা হলে চাকরি করে না কেন? আরে বাবা চাকরি করতেই তো চাই, পাচ্ছি কোথায়? এখানে গান শিখিয়ে, দুটো গানের আর একটা মাধ্যমিক ছাত্রীর টিউশানি করে, সমীরণদার সঙ্গে তানপুরায় বসে গড়ে মাসে আট—ন—শো টাকা হয়। এতে কি চলে?’
‘ছোটোখাটো ফাংশান তো কতই হয়, গাইতে পারেন তো?’
‘আমাকে নেবে না। পাবলিসিটি, ব্যাকিং, গ্ল্যামারাস সাজ, এখন এসব খুবই বড়ো ফ্যাক্টর। ভেবেছিলাম সমীরণদা আমায় দেখবেন।’
প্রতিভা চুপ করে মাথা নামিয়ে মন্থরভাবে হাঁটতে লাগল। মালবিকার মনে হল প্রতিভাদির আরও কিছু বলার কথা আছে, কিন্তু সদ্য পরিচিতের কাছে সেগুলো বলতে চান না।
‘জয় মা মনসা’ ফিল্মটা দেখেছ?’
‘না।’
‘সমীরণদা মিউজিক দিয়েছেন। আমাকে একটা গান দিয়েছিলেন। ওই পর্যন্তই। ছবিটা মফসসলে খুব চলেছে। গানটা ভালোই গেয়েছিলুম। দু—তিনটে জলসায় আমাকে গাওয়ার চান্স করে দিয়েছিলেন। রেডিয়োর অডিশনের ব্যবস্থা করেছেন, বছরে পেয়েছি তিনবার প্রোগ্রাম। একটা ক্যাসেট বার করে দেবেন বলেছিলেন, চেষ্টা করলে পারতেন কিন্তু করেননি। এইভাবে কি দিন চলে? সবটাই ভাগ্যের ব্যাপার মালবিকা, নাম করা, টাকা রোজগার করা এসব ভাগ্য না থাকলে হয় না।’
‘আপনাকে কেন সংসারের কথা ভাবতে হবে?’
‘একটা ভালো কথাই বলেছ। আমিও নিজেকে এই প্রশ্নই করি। আমি অনেক কিছু করেছি, এখনও করছি।’
প্রতিভা এত জোরে ‘এখনও করছি’ বলে উঠল যে মালবিকা ওর হাত চেপে ধরল। রাস্তার দু—তিন জন তাকিয়ে দেখে গেল।
‘আস্তে প্রতিভাদি।’
গলা নামিয়ে প্রতিভা বলল, ‘বলির পাঁঠা কিন্তু আমি হব না। আমি এখনও ঠিক করিনি বিয়েটা করব কি না। ভাবতে পারো, ছেলের বাড়ি থেকে কিছু চাই না বলেও নগদ মাত্র আট হাজার শুধু চেয়েছে বউভাতের খরচের জন্য। এই টাকা আমাকেই জোগাড় করতে হবে। কোন দেশে কোন সময়ে আমরা রয়েছি? লেখাপড়া শিখে এসব আমি মেনে নেব?’
‘আস্তে প্রতিভাদি।’
‘কেন আস্তে হব? সবাই জানুক, পণপ্রথা তুলে দাও, জাতপাত তুলে দাও, বিচ্ছিন্নতাবাদ ঠেকাও, অপসংস্কৃতি ধ্বংস করো বলে মিছিল, মিটিং সেমিনার প্রবন্ধ লেখা হয়। সব বাজে সব বাজে। মালবিকা, তুমি বাচ্চচা মেয়ে, জানো না কী ভণ্ডামিতে দেশটা ছেয়ে গেছে। আর এরই ধাক্কায় আমি—আমিও নিজেকে নীচে নামিয়েছি।’
