দিলীপরঞ্জন বলল, ‘তোমাদের প্রেসটা একদিন দেখে আসব। নতুন ধরনের যন্ত্রপাতি, কালিঝুলি, ঘটংঘটং শব্দের কোনো ব্যাপারই নেই! একবার তো দেখতেই হয়।’
তিনতলা থেকে মিহিরের সঙ্গে মালবিকাও নামল। দু—তিনটি ঘর থেকে কৌতূহলী মুখ উঁকি দিয়ে মিহিরকে দেখল। জানলা থেকে দিলীপরঞ্জন দেখল গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ওরা দুজন কথা বলছে।
‘ছেলেটাকে ভালোই মনে হল। ব্যবসা—ট্যাবসা কেমন চলছে সেটা বোঝা দরকার। গাড়ি থাকলেই তো আর বড়োলোক হয় না। প্রেসটা দেখে আসতে হবে।’ খাটে পা ঝুলিয়ে বসে বকুলকে ইশারা করে বলল, ‘ওটা এবার আনো।’
রান্নাঘর থেকে বকুল দিশি মদের বোতলটা এনে টেবলে রাখল, সঙ্গে কাচের গ্লাস। বিকেলে বাজার থেকে ফেরার সময় পান সিগারেটের দোকান থেকে দিলীপরঞ্জন এটা কিনে এনে বকুলকে রান্নাঘরে রাখতে দিয়েছিল।
‘মালি তো গানের টিউশনিও করতে পারবে।’
বকুল চেয়ারে বসল স্বামীর মুখোমুখি হয়ে। গ্লাসে ছোটো একটা চুমুক দিয়ে মুখবিকৃতি করে দিলীপরঞ্জন বলল, ‘নামি গাইয়ের ছাত্রী হলে দরটা বাড়বে।’
বকুল আশ্বস্ত হল। মিহির সম্পর্কে তো নয়ই এমনকী সমীরণ সম্পর্কেও দুশ্চরিত্র, মাতাল বলে তার স্বামীর এখন আর কোনো আপত্তি নেই। হঠাৎ তার বুকের মধ্যে ক্ষীণ একটা কষ্ট এই লোকটির জন্য তৈরি হল।
সেই সময় গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে মালবিকা বলল, ‘তা হলে সত্যি সত্যিই আর একদিন আর হল না।’
‘হত, কিন্তু দেখলুম বেশিদিন দেরি হয়ে গেলে আমাকে তোমরা আর মনে রাখবে না। মনে রাখার মতো তো আমার চেহারা নয়, গুণও কিছু নেই।’
‘কে বলল নেই?’ মালবিকার স্বর মৃদ গাঢ় হয়ে এল।
‘তানপুরাটা দিলেন, আমার উপকারই করলেন। কিনতে হলে বাবাকে খুবই অসুবিধেয় পড়তে হত। আপনার হৃদয় আছে আর পুরুষমানুষের রূপ তো তার হৃদয়, এটা ক—জনের থাকে?’
‘পুরুষদের থাকে কি না জানি না তবে সুন্দরী মেয়েদের বোধহয় থাকে না।’
‘আপনি জানেন?’ মালবিকা মুখ টিপল। এখন সে বেশ সহজ ঝরঝরে বোধ করছে। মিহিরকে তার ভালো লাগছে ওর কথাবার্তা আর আচরণের জন্য। তবে এটাই তার কাছে ভালো লাগার শেষ কথা নয়। সে পুরুষদের কাছ থেকে আরও কিছু চায়।
‘জানার চেষ্টা করছি।’
‘করে কী বুঝছেন?’
‘আরও চেষ্টা করতে হবে।’ মিহিরের চোখে ঝিলিক দিল প্রত্যাশা।
‘কী চেষ্টা করবেন সুন্দরীদের হৃদয় বুঝতে?’
‘নিজেকে তুমি তা হলে সুন্দরী স্বীকার করলে।’
‘কে বলল? আমি তো একজন সুন্দরীর কথা বলিনি, বলেছি সুন্দরীদের কথা।’ মালবিকা গাড়ির জানলায় হাত রেখে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। উপরে তাকিয়ে দেখল তিনতলার জানলায় কেউ নেই। রাস্তা দিয়ে অল্প লোক চলাচল করছে। দু—বার কেউ তাকাল না তাদের দিকে।
‘আমি তো একজনকেই সুন্দর জানি।’ মিহিরও গাড়ির জানলায় হাত রাখল।
‘খুব হয়েছে, উঠুন এবার।’
‘সুন্দরী মেয়েদের যে হৃদয় থাকে না নিজেই কিন্তু তা প্রমাণ করে দিলে। ‘উঠুন এবার’, এমন একটা কুচ্ছিত কথা কার পক্ষে বলা সম্ভব?’
‘আমি তা হলে কুচ্ছিত?’
‘অবশ্যই।’
‘দূর হও আমার সামনে থেকে।’ মালবিকা মিহিরের হাতের উপর চড় মেরে ঠোঁট ওলটাল।
মিহির অবিশ্বাস ভরে মালবিকার দিকে তাকাল। ‘হও’ বলল। দূর ‘হোন’ নয়। মালবিকার আঙুলগুলো মুঠোয় রেখে সাহস পেয়ে ধরা গলায় মিহির বলল, ‘তোমাকে আমার ভালো লাগে মালি।’
‘হাত ছাড়ো, বাড়ি থেকে দেখছে।’ মালবিকা ফিসফিসিয়ে বলার ধরনে মিহির দ্রুত হাত সরিয়ে নিল। তিনতলার জানলায় অবশ্য কেউ ছিল না।
‘কাল যেয়ো সমীরণদার ওখানে, আমিও যাব।’ দরজা খুলে মিহির গাড়িতে উঠল।
‘যাচ্ছ তো? গোবরডাঙায়?’
‘হ্যাঁ। তোমার সঙ্গে গেলে সমীরণদা কিছু মনে করবে না তো!’
গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট নিল। ‘মনে করার কী আছে। বরং খুশিই হবেন। তখন তোমার বাবাকে বললুম সমীরণদা গাড়িতে একাই যান। মোটেই যান না, ওঁর সঙ্গে আর একজন যায়। প্রতিভা।’ প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য মিহির অপেক্ষা করল না।
গাড়ি চলতে শুরু করার পর মালবিকার মনে হল সে যেন মিহিরের ঘাড়ে সাদা একটা দাগ দেখল।
সমীরণ খুশি হয়েছিল। কেন হয়েছিল সে—কথা এবার বলা দরকার কেননা গোবরডাঙা থেকে ফেরার সময় মালবিকা বুঝে যায় তার জীবন এবার অন্য একটা খাত ধরে বইবে এবং সেই খাতটা শুধুই কাদায় ভরা।
আসরটা মূলত গানের নয়, যাত্রার। টিন দিয়ে ঘিরে হাজার আষ্টেক লোক বসার ব্যবস্থা হয়েছে। যাত্রা হচ্ছে তিন দিন ধরে। সমীরণ মিত্রের গানের পর রাত ন—টায় ‘তোমার মতো বউ হয় না’ পালা শুরু হবে। মিহিররা পৌঁছে দেখল টিকিট ঘরের সামনে প্রায় যুদ্ধ চলছে। চাউমিন, ঘুগনি, রোল, ওমলেট ইত্যাদির দোকান বসে গেছে। যাত্রাকে ঘিরে একটা মেলা—মেলা ভাব। মিহির একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানল, দলবল নিয়ে সমীরণ একটু আগে পৌঁছেছে, বিশ্রাম নিচ্ছে ক্লাবের সেক্রেটারির বাড়িতে। সেই লোকটিকেই গাড়িতে তুলে নিয়ে মিহির সেক্রেটারির বাড়িতে পৌঁছল এক মিনিটেই।
ঘরে সোফায় বসেছিল সমীরণ, তার পাশে প্রতিভা। অন্য সোফায় বসে বিজনবাবু, সোমনাথবাবু। তবলা আর সারেঙ্গি নিয়ে সংগত করছেন দুজনে। তাদের দেখেই সমীরণ বলে উঠল, ‘আয় আয় মিহির, বোস এখানে।’ মালবিকাকে বলল, ‘ভাবতেই পারিনি তুমি আসবে, বসো।’
মালবিকা সবাইকেই গানের স্কুলে দেখেছে। প্রতিভা অল্পবয়সিদের গান শেখায়। সমীরণ ওর কাছেই মালবিকাকে গান শিখতে বলেছে। ‘যতদিন প্রতিভা রয়েছে, ওর কাছেই প্রাথমিক শেখাটা শিখে নাও। ক্ল্যাসিকাল জানে, শেখাবার কায়দাটা খুব ভালো। যেরকম বলবে, দেখিয়ে দেবে সেইভাবে বাড়িতে করবে।’ মঙ্গল আর বুধবার প্রতিভা ক্লাস করে। মালবিকা দু—দিন ক্লাস করেছে। দিলীপরঞ্জন অফিসে যাবার পর গত চারদিন সে নিজের ছোটো ঘরটায় প্রবল উৎসাহে তানপুরা নিয়ে বসেছে।
