‘ঠিকই বলেছেন।’ মিহির সায় দিল।
‘আমাকে ‘বলেছেন’ ‘করেছেন’ বলবেন না, শুনলে বয়স বেড়ে যায়।’ মালবিকা এবার মিষ্টি ধমক দিল। খুশি হল মিহির।
‘আচ্ছা আচ্ছা আর বলেছেন নয়। মাসিমা, মালি যা বলল সেটাই উচিত। সমীরণদার কাছে শিখবে, অথচ আমি বলে দেব, তা হয় না। জানতে পারলে সমীরণদা ওকে আর ও বাড়িতে ঢুকতে দেবে না। তা ছাড়া আমি তো সবে শিখছি, মাস্টারি করার বিদ্যে এখনও হয়নি।’
‘ওরে বাবা, না না তোমাকে আর বলেটলে দিতে হবে না। সমীরণবাবু যা শিখিয়ে দেবেন তাই করবে। আমি চা নিয়ে আসি।’ বকুল ত্রস্ত হয়ে উঠে গেল।
খাটের আর একদিকে বসে দিলীপরঞ্জন শুনছিল ওদের কথা। গলাখাঁকারি দিয়ে সে বলল, ‘সমীরণ মিত্তির লোকটা কেমন বলো তো? শুনেছি খুব মদ খায়, মেয়েঘটিত কেলেঙ্কারিও আছে।’
মিহিরকে হুঁশিয়ার দেখাল। কুণ্ঠিত স্বরে বলল, ‘আমি গান শিখতে যাই, ঘণ্টা দেড়—দুই থেকে চলে আসি। আমরা তিন—চারজন শিখি। এর মধ্যে কিছু আমি দেখিনি।’
‘আহা তা কী করে দেখবে, এসব কী দেখিয়ে কেউ করে। শুনেছ কিছু?
মিহির ইতস্তত করে চুপ রইল। সমীরণদা সম্পর্কে যা শুনেছে সেগুলো বলতে তার বাধছে। অশোভনও হয়ে যাবে। বললে হয়তো মেয়েকে গান শেখাতেই পাঠাবে না। তাতে ক্ষতি হবে মালবিকারই।
মাথা নেড়ে সে বলল, ‘আমি তো কিছু শুনিনি।’
দিলীপরঞ্জন তীক্ষ্ন নজরে তাকিয়ে ছিল। বুঝে নিল ছেলেটি চেপে যাচ্ছে।
‘তুমি শোনোনি এক ছাত্রীকে সমীরণ রেপ করেছিল। কেস হয়। প্রমাণ না হওয়ায় খালাস হয়ে গেছল। অবশ্য বছর দশেক আগের কথা। আমাদের অফিসের একজনের পাড়ার মেয়ে। মেয়েটার আজও বিয়ে হয়নি।’
‘হ্যাঁ, এরকম একটা কথা শুনেছিলুম বটে। মেয়েটি নাকি রেগুলার ওর কাছ থেকে টাকা নিত। টাকা দেওয়া বন্ধ করতেই নাকি কেস করে।’
‘অ। বউয়ের সঙ্গে সমীরণ মিত্তিরের সম্পর্ক কেমন?’
‘কেন, ভালোই তো!’ মিহির আবার হুঁশিয়ার হল।
‘স্বামীকে ছেড়ে ক—বার চলে গেছল? জানো কি সেটা?’
‘না তো। আপনি জানলেন কী করে?’
‘হুঁ হুঁ, বহু জায়গায় আমার আড্ডা, কানে খবর ঠিকই আসে। ওই কেসটা হওয়ার পর থেকে ওদের রিলেশনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। টাকাপয়সা সব তো এখন বউয়েরই কন্ট্রোলে। বউ তো একসময় ওরই ছাত্রী ছিল। বাপের বাড়ির অমতে অনেক লটঘট করে বিয়েটা করেছিল। এখন পস্তাচ্ছে।’ দিলীপরঞ্জন বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে মেয়ের দিকে তাকাল।
মাথা নামিয়ে মালবিকা আদরের মতো করে আঙুল বোলাচ্ছিল তানপুরায়। এই সময় চকিতে তার মনে পড়ল, অনেকটা এই ভাবেই তার পিঠে একটা আঙুল নড়ে বেড়িয়েছিল। শিরশির করেছিল পিঠ। তানপুরা থেকে আঙুলটা তুলেই বাবাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল, ‘বউয়ের সঙ্গে সমীরণ মিত্রের সম্পর্ক দিয়ে আমার কী আসে যায়। আমি তো যাব গান শিখতে।’
কিছু একটা ভেবেই মালবিকা আর বলল না, ‘এখানে ওখানে যেতে হবে, রাতেও হয়তো থেকে যেতে হতে পারে।’ এতসব কথার পর এই কথা আর বলা যায় না। বাবাকে সে ভালোই জানে।
‘হ্যাঁ, শুধু শিখতে, শেখা হলেই বাড়ি চলে আসবে।’
‘ওঁর সঙ্গে ফাংশানেও যেতে হবে, বলে দিয়েছেন।’
দিলীপরঞ্জনের ভ্রূ কুঁচকে উঠল। ‘কেন?’
মিহির তাড়াতাড়ি বলল, ‘ছাত্রছাত্রীরা গুরুর গান শুনতে তো যায়ই, আমিও তো যাই। এই যে গোবরডাঙায় সমীরণদা গাইতে যাবেন, আমিও তো যাব।’
‘সত্যি! আমাকে নিয়ে যাবেন?’ মালবিকা প্রায় লাফিয়ে ওঠার মতো ভঙ্গি করল।
মিহির তাকাল দিলীপরঞ্জনের দিকে। তার মনে হল লোকটা কী যেন ভেবে নিল।
‘আর কে সঙ্গে যাবে?’
‘দু—তিনজন মিউজিক হ্যান্ডস, আর প্রতিভা তো যাবেই।’ একটি মেয়ে যাবে শুনে হয়তো মেয়েকে যেতে দিতে পারে ভেবেই মিহির প্রতিভার নাম জুড়ে দিল।
‘ওর না বিয়ে?’ মালবিকা বলল।
‘এখনও দিন পনেরো তো বাকি। হয়তো এইটেই ওর শেষবারের মতো তানপুরা নিয়ে বসা হবে।’
মালবিকা মনে মনে বলল, ‘তারপর আমি।’
‘যাবে—আসবে কীসে, মোটরে?’ দিলীপরঞ্জন আরও জানতে চাইল।
‘দুটো মোটর যাবে, তাই না মিহিরদা?’ মালবিকার মুখ থেকে আপনা থেকেই ‘মিহিরদা’ বেরিয়ে এল। মিহির হাসল।
‘সমীরণদা তো মোটরে একাই যান, বরাবরই। অন্য মোটরে হারমোনিয়াম, তবলা, তানপুরা আর হ্যান্ডসরা।
‘আমি কিন্তু আপনার মোটরে যাব, যাব বাবা?’ মালবিকা আদুরে গলায় বলল। মনে মনে কিন্তু সে জানে, বাবা রাজি না হলেও সে যাবে। তাকে সমীরণ মিত্রর কাছাকাছি হতেই হবে।
প্লেটে গরম লুচি আর বাটিতে রান্না মাংস নিয়ে বকুল ঘরে ঢুকল। টেবলে ওগুলো রেখে বলল, ‘এসো বাবা, আজ প্রথম দিন এলে, কিছু রাঁধার তো সময়ই পেলুম না। একটু মুখে দাও। চা পরে দোব। মালি, রান্নাঘর থেকে সন্দেশের প্লেটটা এনে দে।’
মিহির কোনো ওজর—আপত্তি না তুলে উঠে টেবলে এল। সে বুঝে গেছে নাছোড়বান্দা এই মহিলা সত্যি দুঃখ পাবে যদি সে কিছু না খায়। শুধু বলল, ‘যা দিয়েছেন এটা আমার দু—দিনের খাদ্য। অর্ধেক তুলে নিন।’
বকুল তুলল না এবং মিহির সবটাই খেয়ে নিল যেহেতু মাংসের রান্নাটা উপাদেয় লাগায়। বিদায় নেবার সময় বকুল বলল, ‘একদিন তোমাদের বাড়িতে গিয়ে তোমার মা—র সঙ্গে আলাপ করে আসব।’
‘যাবেন। আমি এসে নিয়ে যাব।’ মিহির কথাটা বলে মালবিকার দিকে তাকাল।
‘আমিও মা—র সঙ্গে যাব।’ মিহিরের চোখে অনুরোধ দেখে সে নিরাশ করল না।
