অসমান রাস্তার জন্যই গাড়িটা অস্থির, আয়নাটা কাঁপছে, মিহিরের মুখটাও। উঁচু কলারের হাওয়াই শার্ট। মালবিকার মনে হল, ঘাড়ের সাদাটা ঢাকার জন্যই এমন একটা জামা পরেছে। তাদের পাড়ার স্টেশনারি দোকানের রাজেনদার দুই চোখের কোণে প্রথমে ফুটকির মতো সাদা দাগ হয়। ক্রমশ সেটা বড়ো হতে হতে সারামুখে ছড়াতে থাকে। তিন—চার বছরের মধ্যে রাজেনদা পুরো সাদা হয়ে যায়। ছোটোরা ওকে সাহেবদা বলে ডাকতে শুরু করে। ওকে দেখলেই মালবিকা কীরকম যেন একটা অস্বস্তি বোধ করত। সে শুনেছে এটা কোনো রোগ হয়, ছোঁয়াচেও নয়। তবু সে রাজেনদার দোকান থেকে জিনিস কেনা বন্ধ করে।
মিহিরের ঘাড়ের দাগটা চামড়া পুড়ে যাওয়ার জন্যও হতে পারে। মালবিকা মনে মনে বলল, তাই যেন হয়। নয়তো তিন—চার বছর পর ধবধবে মিহিরের চেহারা যে কেমন দেখতে হবে, সে কল্পনাও করতে পারল না। জানলা দিয়ে সে বাইরে তাকিয়ে রইল। যে উত্তেজনা নিয়ে সে সমীরণের বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল, আপ্লুত আশায় যে গড়াগড়ি তার মনের মধ্যে চলেছে সেটা ক্ষণেকের জন্য স্তিমিত মৃদু হয়ে পড়ল। বেচারা! তারপরই সে ভাবল, ও তো মেয়ে নয়। প্রচুর টাকা আছে কোনো অসুবিধে হবে না।
পথটা একেবারে চিনে গেছে মিহির। বাড়ি পর্যন্ত ঠিকই চলে এল। গাড়ি থেকে নামবার আগে মালবিকা বলল, ‘আর একদিন এসে চা খেয়ে যাবেন বলেছিলেন। নিশ্চয়ই সেই আর একদিনটা আজ নয়?’
‘এই দুপুরবেলায় চা খেতে বলছেন?’
‘না, বলছি না।’ মালবিকা গাড়ি থেকে নেমে আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে নিল। চোখ তুলে তিনতলায় নিজেদের ঘরের জানলাটাও দেখে নিল। পর্দাটা গুটিয়ে তুলে রাখা। জানলায় তার বাবার মুখটা নেই।
‘দুপুরে লোকে ভাত খায়, কই ভাত খাওয়ার কথা তো বললেন না?’
‘খাবে বাবা?’ বকুল ঝুঁকে জানলাটা ধরে মিহিরকে অনুরোধ জানাল।
‘না মাসিমা, আর একদিন…এই দেখুন আবার বলে ফেললুম আর একদিন। আমার মা বসে থাকবেন ভাত নিয়ে, এক ছেলে হওয়ার এই এক প্রবলেম। আর শুনুন।’ একটু জোরেই মিহির ডাকল বাড়ির ফটকে পৌঁছে যাওয়া মালবিকাকে।
‘তানপুরা নিয়ে গলা সাধতে হলে আগে একটা তানপুরা চাই, সেটা আছে কি?’
‘নেই।’ মালবিকার হঠাৎই খেয়াল হল সমীরণের মতো মিহির তানপুরাকে ‘তানপুরো’ বলে না।
‘আমার একটা আছে, সেটা দিয়ে যাব।’
‘আর একদিন এসে, তাই তো?’
‘আজই, সন্ধেবেলায়। চা—ও খাব।’
‘তানপুরাটা দিয়ে দিলে আপনি কী নিয়ে গাইবেন?’
‘আমার দুটো আছে।’
মিহির গাড়ি ছেড়ে দিল।
.
একটি দিনেই প্রধান চরিত্রগুলোকে নিয়ে কাহিনিটি পৌঁছল আর এক পর্যায়ে। আরও দু—তিনটি পর্যায় পেরিয়ে পৌঁছবে মালবিকার আইবুড়ো ভাত খাওয়াবার সেই রবিবারে। তার মধ্যে দ্রুত সম্পর্কের হেরফের ঘটে যাবে, তার কিছু কিছু অংশ এবার বলা যাক।
যেমন শনিবার সন্ধ্যায় মিহির তানপুরাটা দিতে এল। হঠাৎ একজন অপরিচিত একা লোকের পক্ষে বাড়ির মধ্য দিয়ে তিনতলায় উঠে আসা, এ—বাড়িতে সম্ভব নয়। অসুস্থ মেজোভাসুরের অফিসের লোক একবার উঠে এসেছিল না বলে। পার্বতী ডেকে মেজোজাকে বলে দেন, ‘এটা ফ্ল্যাট বাড়ি নয়।’
মালবিকা আর বকুল পালা করে সন্ধে থেকে তিনতলার জানলা দিয়ে রাস্তায় চোখ রাখে। দিলীপরঞ্জনকে বলে রেখেছিল বকুল, ‘সেই ছেলেটি আসবে যে গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে।’
কী যেন ভেবে দিলীপরঞ্জন বলেছিল, ‘আমাদের স্বজাতি?’
‘হ্যাঁ, শীল। বিকেলে যদি বেরোও তা হলে রাত করে ফিরো।’
রেগে খেঁকিয়ে ওঠার বদলে স্বাভাবিক গলায় দিলীপরঞ্জন বলেছিল, ‘শরীরটা ভালো লাগছে না, আজ বেরোব না।’
বকুল অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। শনি—রবি পরপর দু—দিন অফিসের ছুটি, অথচ মদ খেতে বেরোবে না! তখন সে বলেছিল, ‘বিকেলে তা হলে একটু বাজারে যেয়ো।’
গাড়িটা ফটকের সামনে থামতে দেখেছিল মালবিকাই। ‘এসেছে।’ বলেই সে ছুটে নেমে যায় মিহিরকে উপরে আনতে। দিলীপরঞ্জন তখন পাঞ্জাবিটা ট্রাউজার্সের উপর ঝুলিয়ে আয়নায় দাঁড়ায় চুল আঁচড়ে নিতে। বকুল কলঘর থেকে ভিজে শরীরে কোনোরকমে শাড়ি জড়িয়ে ছুটে এসে মালির ঘরে ঢুকল, ঢোকার আগে লন্ড্রি থেকে আনা শাড়িটা আলনা থেকে তুলে নেয়।
মিহির প্রায় তিন ঘণ্টা ছিল। তার মধ্যে সে বুঝে নিল এদের তিনজনের পারস্পরিক সম্পর্কটা কেমন। দিলীপরঞ্জন জেনে নিল মিহিরের জ্ঞাতিগোষ্ঠীর খবর ও পারিবারিক অবস্থা। বকুল খোঁজ করল, মালবিকার বড়ো গাইয়ে হবার জন্য কতদিন সময় লাগবে আর মালবিকার মনে হল মিহিরের তাকে ভালো লেগেছে এবং সেটা কিছু জটিলতা তৈরি করবে।
তানপুরা কীভাবে বাঁধতে হয়, কীভাবে সুর ছাড়তে হয় মিহির খাটের উপর বসে পদ্ধতিগুলো শিখিয়ে দিল। শেখাবার সময় অবশ্যই কয়েকবার সে মালবিকার করস্পর্শ করল! তার আঙুল ধরে, যার কোনো দরকারই ছিল না, মিহির যখন দেখিয়ে দিচ্ছিল কীভাবে তারের উপর দিয়ে পরপর টেনে নিয়ে যাবে তখন সে ওর ঘাড়ের সাদা দাগটা দেখার চেষ্টা করেছিল। উঁচু কলারের পাঞ্জাবি এবং বোতামগুলো তৃতীয় ঘর পর্যন্ত আঁটা থাকায় দেখতে পায়নি। সে স্বস্তি পেয়েছিল।
‘বাবা, একটু বলে দাও তো তানপুরা দিয়ে ও কীভাবে গলা সাধবে?’ বকুল জানতে চায়।
‘আহহ মা! যার কাছে শিখব তিনিই বলে দেবেন। তুমি অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন বলো তো।’ মালবিকা বিরক্ত হল। বকুল অপ্রতিভ।
