‘বেশ তো আপনিই ঠিক করে দিন কোন লাইনে ও যাবে।’ বকুল ব্যগ্র স্বরে বলল।
‘সা রে গা মা থেকে ওকে শিখতে হবে। এখন যা শুনলেন সেটা অশিক্ষিত পটুত্ব, বেশিদূর যাওয়া যাবে না। রোজ তিন—চার ঘণ্টা চর্চা করতে হবে।… কী গো মালি ভয় পাচ্ছ নাকি?’
মুখ নামিয়ে মালবিকা শুনছিল। মাথাটা ঝাঁ ঝাঁ করছে। গান শেখাবে কী শেখাবে না, সেটা স্পষ্ট করে ওর কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে না। কিছু উপদেশ দিয়ে হয়তো বলবে, যাও বাড়িতে বসে গলা সাধো। ‘ভয় পাচ্ছ নাকি’, বলে সমীরণ তার পিঠে ছোটো একটা চড় বসিয়ে হাতটা আর তোলেনি। তার এই একটিই ব্লাউজ এবং এটি এমনই, পরিধান করলে পিঠটা অর্ধেক প্রায় খোলা থাকে আর কাঁধ থেকে স্তনের উপরিভাগ পর্যন্ত অনাবৃত রয়ে যায়। বাড়িতে ব্লাউজটা সে কখনোই পরে না। বাইরে বেরোবার সময় পাড়ার মোড় পর্যন্ত আঁচল দিয়ে ঊর্ধ্বাঙ্গ জড়িয়ে রাখে। আজ সে ইচ্ছে করেই পরে এসেছে।
সমীরণের আঙুলের ডগা পিঠের ছয় ইঞ্চি জায়গা জুড়ে আলতো ঘোরাফেরা করছে। শিরশির করছে পিঠ এবং সারা শরীরে সেটা ছড়িয়ে যাচ্ছে। মালবিকা চট করে একবার বকুলের দিকে তাকাল। বকুলের দ্রুত চোখ সরিয়ে নেওয়া দেখে তার মনে হল, সম্ভবত মা ব্যাপারটা লক্ষ করেছে। কিছু কি ভেবে নিচ্ছে?
‘প্রতিভা আমার স্কুলে গান শেখায়। গান শেখেও আমার কাছে। ওর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে এই সামনের মাসেই। বলেছে গান ছাড়বে না তবে আমার সঙ্গে এখানে ওখানে যাওয়াটাও আর সম্ভব হবে না, স্কুলেও শেখাতে পারবে না। কনজারভেটিভ শ্বশুরবাড়ি, আপত্তি করবে বলেছে। গান নিয়ে যদি কেউ সারাক্ষণ পড়ে না থাকে তার কিছু হবে না। আমার ছাত্রীদের মধ্যে ওই ছিল সেরা।’ সমীরণের স্বর আফশোস আর দুঃখেই বোধহয় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ল। মালবিকার পিঠে আলতো বোলানো আঙুল এখন আঁচড় কাটছে নখ দিয়ে।
‘তানপুরো ছাড়ার জন্য আমার একজন কাউকে এখন চাই।’ সমীরণ তাকাল মালবিকার দিকে, মালবিকা মায়ের দিকে। বকুল মনে মনে বলল ভগবান, উনি যেন মালির হাতেই তানপুরাটা তুলে দেন।
‘আমার তো মনে হয়, শিখিয়ে নিলে মালির কাছে এটা শক্ত ব্যাপার হবে না। আসরে আমার পাশে বসেই অনেক কিছু শিখতে পারবে। অবশ্য মা—বাবার যদি আপত্তি না থাকে—।’ সমীরণ জিজ্ঞাসু চোখে বকুলের দিকে তাকাল। ‘এখানে ওখানে যেতে হবে, রাতেও হয়তো থেকে যেতে হতে পারে।’
ভগবান তা হলে শুনেছেন! চেয়ার থেকে হুমড়ি খেয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল বকুল। ‘প্রণাম কর, প্রণাম কর। এত ভাগ্যি তোর! আপত্তি করব কী!’
মালবিকা কৃতজ্ঞ চোখে তাকাল। তার পিঠের উপর সমীরণের পাঁচ আঙুল মাংস খাবলাবার চেষ্টা করছে। চর্বি না থাকায় জুত করতে পারছে না। সোফা থেকে নেমে মালবিকা আবার পায়ের দুটো পাতা দুই মুঠোয় ধরল এবং কী একটা ভেবে নিয়ে পাতাদুটোর ওপর আলতো চিমটি কাটল।
‘বারবার প্রণাম কেন, বসো বসো।’ সমীরণ দুই বাহু ধরে মালবিকাকে পাশে বসাল। মুখ টিপে হেসে বোঝাবার চেষ্টা করল, চিমটি কাটা সে উপভোগ করেছে।
এই সময়ই ঘরে ঢুকল মিহির। তাকে দেখে সমীরণ মালবিকার বাহুধরা হাতটা সরিয়ে নিল।
‘আয় আয় মিহির, বোস। প্রতিভার তো বিয়ে, তাই ঠিক করলুম মালিই এবার থেকে তানপুরো নিয়ে আমার সঙ্গে বসবে। পারবে না?’
‘পারতে চাইলেই পারবে।’ মিহির একটা চেয়ারে বসল। পাশে বসা বকুলকে নীচু গলায় বলল, ‘বলেছিলুম আসব, এসেছি।’
‘জানো বাবা, মালির গান শুনে উনি বললেন, খাটলে হবে, গলাটা খুব মিষ্টি।’
‘সমীরণের মুখে প্রশংসা! সহজে তো উনি এটা করেন না। কোকিল ডাকলে উনি বলেন কাক ডাকছে। তাও আবার ‘খুউব’ মিষ্টি বলেছেন? আমি কিন্তু মাসিমা, গান না শুনে আগেই বলেছি।’
মিহির মুখ টিপে মালবিকার দিকে তাকাল।
‘ঠাট্টা নয় মিহির, গলাটা সত্যিই মিষ্টি।’
কয়েক মিনিটের মধ্যে দুটি পুরুষমানুষ মুখ টিপে তার দিকে তাকিয়ে হেসেছে। মালবিকার মাথার মধ্যে কেমন যেন একটা ঘোর লাগছে। তার মনে হচ্ছে, এরা তার কাছে কিছু যেন চায়। কিন্তু তার আছে কী দেবার মতো? সে নিজেই তো সকলের অনুগ্রহ চায়!
‘সমীরণদা বউদি কোথায়?’
‘পার্ক সার্কাস গেছে, ইলেকট্রিক ফিটিংসের কাজ দেখতে।’
.
মিহিরের গাড়িতে সেদিন ওরা দুজন বাড়ি ফিরেছিল। ফেরার পথে মিহির বলে, ‘তানপুরা নিয়ে গান গাওয়ার অভ্যাসটা আপনার দরকার, হারমোনিয়াম দিয়ে ওটা হবে না।’ মুখ ফিরিয়ে সে পিছনে বসা মালবিকার মুখটা দেখে নিল।
‘মালিকে আবার ‘আপনি’ বলছ কেন বাবা, ও তোমার থেকে অনেক ছোটো।’
‘আপনি আমার বয়স জানেন?’ মিহির মজা করেই বলল। ফাঁপরে পড়ল বকুল, সে মেয়ের দিকে তাকাল। মালবিকা মিহিরকে শুনিয়ে চাপা গলায় বলল, ‘বলো একশো।’
‘উঁহু, হল না। বয়স ষোলো।’ মিহির স্বাভাবিক গলায় বলল।
‘অ্যাতো বয়স?’ মালবিকা গলা অবাক করে ভ্রূ তুলল। ‘আমার থেকে তো অনেক বড়ো, আমি তো সবে আটে পড়েছি।’ সে মিহিরের মুখ দেখার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখল গাড়ির সামনের কাচের উপর দিকে চালে আঁটা পিছন দেখার আয়নাটা দিয়ে মিহির তাকে দেখছে। ঠোঁট মুচড়ে হেসে মালবিকা একটু সরে বসল। মিহির বাঁ হাত তুলে আয়নাটা সামান্য ঘোরাল। আবার ওর মুখ মালবিকা দেখতে পাচ্ছে। সে এবার সরে এল বকুলকে ঘেঁষে। মিহির আয়নাটা আবার ঠিক করে নিল।
