‘আমরা যে এসেছি সেটা বোধহয় ওকে জানানো হয়নি।’ মালবিকা বলল।
‘নিশ্চয় জানিয়েছে। দেরিতে ওঠেন তো বলেই দিয়েছিলেন। মিহির আসবে বলেছিল, কই এখনও তো এল না।’
‘রেখে দাও ওসব আসা—টাসার কথা। বলার জন্যই বলা।’
‘ছেলেটি কিন্তু বেশ।’
‘তোমার সব কিছুতেই ‘বেশ’। এটা বলা থামাও তো।’
দুজনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ক্রমশ ব্যাজার হতে হতে বকুল কথা শুরু করল।
‘বারো হাজার টাকা নেন মাত্র দু—ঘণ্টা গাইতেই।’
‘বারো হাজার না আরও কিছু। ওরা তো ডেট বদলাতে চেয়ে দশ হাজার অফার করল। তার মানে আগে আরও কমে কথা হয়েছিল। এখন ইনি গরজ বুঝে মোচড় দিয়ে ওটাকে বারোয় তুলল। রবিবারে কোথায় যেন গাইবার কথা আছে বলল না? সব ফলস। খুব জাঁহাবাজ মেয়েমানুষ।’
‘তোর দেখছি ওকে একদমই ভালো লাগেনি।’
‘না। ভাবভঙ্গিটা দেখলে না? প্রণাম করলুম, একটা কিছু তো লোকে বলে। অথচ যেন দেখতেই পায়নি এমন একটা ভাব করল। নিজে অত সেজেছে আর ঘরটা কী করে রেখেছে?’
‘গাইয়ে বাজিয়েদের ঘর এইরকমই হয়।’
‘মোটেই তা নয়। আসলে দরকার ইচ্ছে, সেটা থাকলে ঘরটা পরিচ্ছন্ন করে রাখা যায়। পর্দাগুলো এত দামি আর দেয়ালটা দ্যাখো!’
বকুল চারদিকের দেয়ালে চোখ বোলাল। সেই সময় রাস্তা থেকে কয়েকবার মোটরের হর্ন বাজল। পাশের ঘরের জানলা থেকে শিঞ্জিনীর গলা শোনা গেল, ‘যাচ্ছি, এক মিনিট।’
মালবিকা উঠে গিয়ে জানলা থেকে দেখল বাড়ির সামনে একটা সবুজ রঙের মারুতি দাঁড়িয়ে। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি নিশ্চয় ড্রাইভার।
ঘরের সামনে ব্যস্ত চটির শব্দ হল। পর্দা সরিয়ে শিঞ্জিনী বলল, ‘আপনারা বসুন, আসছেন।’ পর্দা পড়ল। চটির শব্দ একতলায় নেমে গেল। মালবিকা জানলা থেকে শিঞ্জিনীর গাড়িতে ওঠা দেখল।
‘মারুতি গাড়ি।’ মালবিকা চেয়ারে ফিরে এসে বসল। ‘বউই চড়ে বেড়ায়।’
‘কত দাম?’
‘লাখ দুয়েক—দেড়েক হবে।’
‘অ্যাতো! তুই পারবি অমন একটা গাড়ি কিনতে?’ গলায় ক্ষীণভাবে আবদারের মতো সুর ফুটে উঠল।
মালবিকা মুখ ফিরিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। হালকা একটা বিষণ্ণ হাসি তার চোখে ভেসে এল। ‘মাইনের টাকাটা কত বলে সেটা আগে জেনে নাও। আকাশকুসুম দেখতে শুরু কোরো না।’
দরজার পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকল সমীরণ মিত্র। আদ্দির পাঞ্জাবি আর ঢোলা পাজামা, সাদা রাবারের চটি। চুলে চিরুনি পড়েনি। ফুলো ফুলো দুই চোখ। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি কিন্তু খুব দেরি করিনি, আপনারাই আগে এসে পড়েছেন। আসলে হয়েছে কী, কথা ছিল ট্রেনে ফেরার। সঙ্গে ছিল তিনজন, তবলা আর খোল বাজাবার দুজন আর তানপুরো ছাড়ার মেয়েটি, আমারই ছাত্রী প্রতিভা। টাটার এক অফিসার কলকাতায় আসছিলেন গাড়ি করে। আমি দেখলুম ভোররাতে উঠে স্টিল এক্সপ্রেস ধরা আমার দ্বারা হবে না। তার থেকে বরং—’, সমীরণ সোফায় বসে গা এলিয়ে দিল।
তখনই মালবিকা তাকে প্রণাম করতে এগিয়ে গেল। হাঁটু গেড়ে বসে সমীরণের দুই পায়ের পাতা দু—হাতে ধরে সে নুয়ে পড়ল। কপাল ঠেকল পাতায়।
‘আরে আরে।’ সমীরণ সোজা হয়ে বসে মালবিকার দুই কাঁধ ধরে ‘থাক থাক’ বলে তাকে তোলার চেষ্টা করল। মালবিকা তখন অনুভব করল, আঙুলগুলো তার ঘাড়টাকে বার দুই যেন হালকাভাবে কচলাল। সহজাত বোধ তাকে জানিয়ে দিল, এই কচলানিটা কিছু একটা ইঙ্গিত দেবার জন্য। সে চোখ তুলে সমীরণের চোখে বিহ্বল দৃষ্টি রেখে ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল।
‘বোসো বোসো।’ সমীরণ হাত ধরে মালবিকাকে তার পাশে বসাবার সময় সামান্য একটা টান নিল। মালবিকা তার গা ঘেঁষে বসল। বকুল এত নামি গায়কের এমন সারল্য দেখে পুলক বোধ করল। তার মনে আশা জাগল, বোধহয় মেয়েটার একটা হিল্লে হবে। এখন মাইনের ব্যাপারটায় যদি একটু বিবেচনা করেন!
‘মালির গান শুনে বলুন, ওর কিছু হবে কি না।’ বকুল নড়েচড়ে বসল।
সমীরণ তার ঝকঝকে চটুল চাহনি মালবিকার চোখের উপর রেখে বলল, ‘হবে না কেন? যদি পরিশ্রম করে, খাটে, আমার কথামতো যদি রেগুলার সাধনা করে তা হলে নিশ্চয় হবে। কী বলো, হবে না?’ কথাটা বলে সমীরণ মালবিকার ডান হাতের মুঠি বাঁ হাতে চেপে ধরল।
মালবিকা মাথা নামিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘আপনি যদি আমাকে গাইড করেন।’
সমীরণ কয়েক সেকেন্ড কী যেন ভেবে নিয়ে বলল, ‘আচ্ছা তোমার গলাটা একটু শুনি। যে—কোনো একটা গান গাও, খালি গলায় কিন্তু।’
গান গাইবার জন্যই আসা সুতরাং কয়েকটা গান সে স্থির করেই এসেছে। মালবিকা কয়েক সেকেন্ড চোখ বুজে থেকে গান শুরু করল। ‘সখী, বহে গেল বেলা, শুধু হাসি খেলা এ কি আর ভালো লাগে।’
রেকর্ড থেকে হুবহু তোলা, শুধু গলাটাই যা মিহি এবং তীক্ষ্ন। কয়েকবার স্বর কেঁপে গেল, শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ায় ভুল করল, সুরচ্যুতি ঘটল এবং অবাক চোখে সমীরণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। গান শেষ হবার পর ঘর নীরব রইল কিছুক্ষণ। মালবিকা উৎকণ্ঠিত চোখে তাকিয়ে রইল সমীরণের বন্ধ চোখের দিকে।
‘তুমি যে এইরকম একটা গান শোনাবার জন্য বেছে নেবে, সেটা আমি ভাবতে পারিনি। গলায় এখনও সুর বসেনি তবে মোটামুটি তুমি উতরে গেছ তোমার ভগবান—দত্ত মিষ্টি গলাটার জন্য। আমি রবীন্দ্রসংগীত জানি না, গাইও না, কিন্তু তোমারও এটা লাইন নয়। তুমি অন্য ধরনের গান শেখো।’
