লোক দুটি লজ্জায় পড়ল। ওদের মধ্যে কমবয়সিটি আবার সোফায় বসে পড়ে বলল, ‘আমরা গোবরডাঙা থেকে আসছি। আমরা ভেবেছিলুম আপনি বোধহয় সমীরণ মিত্রের স্ত্রী। লোকটা আমাদের বসিয়ে বলল, ‘মাকে ডেকে দিচ্ছি’, তারপরই আপনি উঁকি দিলেন। তাই আমরা ভাবলুম—।’
‘না, না, আমি ওনার স্ত্রী নই, আমরাও একটা দরকারে ওঁর কাছে এসেছি।’
বকুল একটা বেতের চেয়ারে বসল, তার পাশেরটায় মালবিকা। পর্দা সরিয়ে একটি লোক তাদের দেখে নিয়ে চলে গেল। এতবড়ো একজন নামী গাইয়ে পুরোনো বাড়িতে আর এমন একটা বসার ঘর নিয়ে বাস করে, এটা দেখে বকুল একটু দমে গেল। সিনেমায় বা টিভি—তে বড়ো বড়ো লোকেদের বসার ঘরের সঙ্গে একফোঁটা মিলও সে খুঁজে পাচ্ছে না।
মালবিকা মুখটা বকুলের কানের পাশে এনে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘মা কে?’
‘বোধহয় ওর বউ।’
বয়স্কজনটি কথাটা শুনতে পেয়ে বলল, ‘কমার্শিয়াল ব্যাপারটা ওঁর স্ত্রী শিঞ্জিনী দেবীই তো দেখেন। যা কিছু কথাবার্তা উনিই বলেন, উনিই টাকাপয়সা ঠিক করে দেন।’
লোকটির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পর্দা সরিয়ে একজন ঘরে ঢুকল, যাকে দেখামাত্র ওরা বুঝে নিল, এই হচ্ছে শিঞ্জিনী। মাথা ঘুরিয়ে চারজনের দিকে ওর তাকানোর ভঙ্গিতে কর্তৃত্ব প্রয়োগের একটা ঔদ্ধত্য রয়েছে। শিঞ্জিনী ভ্রূ কুঁচকে বকুল—মালবিকাকে দেখে নিয়ে গোবরডাঙার দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কে বিকাশ মুখোপাধ্যায়?’
‘আ—আমি।’ কমবয়সি উঠে দাঁড়াল।
‘আপনি মল্লিকার চিঠি নিয়ে এসেছেন?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার বউ।’
‘কিন্তু ভাই টাকা তো আমি কমাতে পারব না ওঁর যা রেট—’
‘না, না, না, টাকা কমাবার কোনো প্রশ্নই নেই। উনি যা নেন তাই নেবেন। আমার অনুরোধ প্রোগ্রামটা শনিবারের বদলে রবিবার হচ্ছে, উনি যদি রবিবারে আসেন তা হলে আমরা ধন্য হব।’ বিকাশ করজোড়ে তাকিয়ে রইল শিঞ্জিনীর দিকে।
দুই ভুরুর মাঝখানটা চুলকিয়ে একটু বিব্রত গলায় শিঞ্জিনী বলল, ‘রবিবার তো একটা ঘরোয়া আসরে ওঁর গাইবার কথা। সাহিত্যিক, ফিল্ম ডিরেক্টর, আইএএস, আইপিএস—দের বউয়েরা, দু—একজন জার্নালিস্টও আসরে থাকবেন। সমীরণের তো এখানে কথাও দেওয়া হয়ে গেছে।’
‘কথা কি পাকাপাকি দেওয়া হয়ে গেছে? ডেটটা চেঞ্জ করা যায় না?’
‘প্রায় একরকম পাকাপাকিই বলা যায়।’
‘একটু ওঁদের বলে দেখুন না যদি অন্য দিনে হয়। আমরা তা হলে দশ হাজার দেব যদি উনি রবিবারে আসেন।’
‘দেখুন ওঁর শরীরটা খুব খারাপ। কাল রাতে জামসেদপুর থেকে ফিরলেন কী যে শরীর নিয়ে! এতটা লং জার্নি মোটরে করাই উচিত হয়নি।’
‘আমরা ওঁকে ট্রেনে গোবরডাঙা নিয়ে যাব। বিটি রোড, যশোর রোডে ওঁর গাড়ির চাকাই পড়বে না। ম্যাডাম, আপনি কিছু ভাববেন না, ট্রেনে কলকাতার রাস্তার মতো গর্তটর্ত, ঝাঁকুনি নেই।’
শিঞ্জিনী তৃতীয় বেতের চেয়ারটায় বসে ভ্রূ কুঁচকে কপালে আঙুলের কয়েকটা টোকা দিল। লোক দুটি জলে পড়েছে, কী করে তাদের উদ্ধার করা যায়, এমন একটা সমস্যা তার মুখে ফুটে উঠল। ‘দশ নয় ওটা বারো করুন। তা হলে রবিবারের ওই আসরটা থেকে সমীরণকে তুলে আনা যেতে পারে। টাকাটা কিন্তু আগাম পুরোই চাই, ক্যাশে।’
‘তা হলে আপনি দায়িত্ব নিন ওঁকে নিয়ে যাবার। বারোতেই আমরা রাজি। কাল কী পরশু এসে কনট্রাক্ট করিয়ে টাকা দিয়ে যাব।’
‘আমি আর ওঁকে নিয়ে যাব না, উনি নিজেই যাবেন । দুটো গাড়ি ঠিক সময়ে পাঠাবেন আর এগারোটার মধ্যে পৌঁছে দেবেন। কিন্তু খেতেটেতে চাইলে দেবেন না। ঠিক দু—ঘণ্টা গাইবেন।’ শিঞ্জিনী ফর্দ পড়ার মতো বলে গেল।
ওরা দুজন উঠে দাঁড়াল। মুখে বিগলিত হাসি। নমস্কার করে তারা চলে যাবার পর শিঞ্জিনী বকুল ও মালবিকার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
‘আমাদের সমীরণবাবু আসতে বলেছেন। এই আমার মেয়ে মালবিকা, ওর গান শেখার ব্যাপারেই আসা।’
মালবিকা প্রণাম করল শিঞ্জিনীকে। বকুল একবার ভাবল সে—ও করবে কি না, কিন্তু প্রায় সমবয়সি বা ছোটোই হবে বিবেচনায় শুধু স্মিত মুখে সে তাকিয়ে রইল।
‘তা হলে তিনটের পর আসুন তখন স্কুল খুলবে।’ শিঞ্জিনী তীক্ষ্নচোখে মালবিকার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
‘ওকে স্পেশালে শেখাবেন বলেছেন, তার আগে গান শুনবেন। সেজন্য আসা।’ বকুল নম্রস্বরে বলল।
‘কার কাছে গান শেখে?’
‘কারুর কাছে নয়। বহু আগে একজনের কাছে শিখেছে, সে না—শেখারই মতো।’
‘হারমোনিয়াম বাজাতে পারে তো?’
‘তা পারে।’
দু—জনের মুখের উপর চোখ বুলিয়ে, কোনো কথা না বলে শিঞ্জিনী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার ভঙ্গিতে প্রকট ছিল অবহেলা, মালবিকার সেটা ভালো লাগল না।
‘বেশ সুন্দরীই।’ বকুল মাথা হেলিয়ে চাপা গলায় বলল।
‘এককালে ছিল।’ মালবিকা কথাটা বলেই যোগ করল, ‘মেক—আপ করেছে বলে অমন দেখাচ্ছে।’
‘তা কেন, মুখখানি বেশ সুন্দরই তো। শরীরের গড়নও ভালো। রং ফরসা, কোমর—টোমর সরু রেখেছে। শুধু চোখদুটোই যা ছোটো ছোটো।’
‘তুমি একে ভালো ফিগার বলো কী করে? কেমন একটা কাঠ—কাঠ ভাব, গায়ের চামড়াটাও খসখসে। গালে ব্রণর দাগগুলো লক্ষ করেছ?’
‘আস্তে বল।’
কিছুক্ষণ ওরা চুপচাপ বসে থাকার পর উসখুস শুরু করল। সেন্টারটেবলের নীচের তাকে কয়েকটা ম্যাগাজিন দেখে মালবিকা একটা তুলে নিল। বাচ্চচাদের ম্যাগাজিন, বোধহয় সমীরণের ছেলের। কয়েক পাতা উলটে সে রেখে দিল।
