দিলীপরঞ্জন দু—পা এগিয়ে গেল। বকুল একপা পিছিয়ে চেয়ারের পিঠ আঁকড়ে ধরল। সে খুন দেখতে পাচ্ছে স্বামীর চোখে। বোকার মতো কথাটা সে বলে ফেলেছে তো বটেই। মালির গান শেখার জন্য টাকা এই লোকটার কাছ থেকেই পেতে হবে।
‘আমাকে গালাগাল দিয়ে, মারধোর করে তুমি যেন কী একটা জ্বালা জুড়োও, কীসের জ্বালা?’
একটা ডেকচিতে রুটি নিয়ে মালবিকা আবার ঘরে এল। টেবলের উপর সেটা রেখে বলল, ‘আমার ঘুম পাচ্ছে, আমি ঘুমোতে যাচ্ছি।’
‘এই হচ্ছে আমার আর—একটা জ্বালা।’ দিলীপরঞ্জন দাঁত চেপে আঙুল তুলে মালবিকার ঘরের দরজাটা দেখাল। ‘মায়ের থেকেও এককাঠি ওপরে যাবে।’
‘যাক না। মায়ের মতো ভুল যদি না করে—’
‘কীসের ভুল? ভুল তো আমি করেছি।’ দিলীপরঞ্জন দু—হাতে বকুলের কাঁধ আঁকড়ে ধরে ঝাঁকানি দিয়ে শাড়ির আঁচলটাকে টেনে মেঝের উপর ফেলে দিল।
বকুল স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। স্বামীকে বাধা দেবার কোনো চেষ্টা তার মধ্যে নেই। আঁচলটাও কাঁধের উপর তুলল না। দিলীপরঞ্জন কর্কশ দৃষ্টিতে বকুলের বুকের উপর চোখ রেখে বলল, ‘সমীরণকে পটাবার জন্য দেখছি খুব তুলে দিয়েছ, বুঝি না কিছু ভেবেছ?’
এইসব কথা বকুলের কাছে নতুন নয়। দিলীপরঞ্জন একদিন একটু মত্ত হয়ে দু—হাতে ব্লাউজের গলা ধরে হ্যাঁচকা টানে হুকগুলো ছিঁড়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর হেসে উঠে হাঁ করে একটা স্তন মুখে পুরে জোরে কামড়ে ধরে। বকুল চিৎকার করে উঠতে গিয়েও করেনি, পাশের ঘর থেকে মেয়ে তা হলে বেরিয়ে আসবে। এখন তার মনে হচ্ছে দিলীপরঞ্জন ওইরকম কিছু একটা করতে চাইলে এতক্ষণে তা করে ফেলত। করেনি যখন তার মানে নেশার ঘোরটা কেটে গেছে।
‘আমি তো বলেইছি, সমীরণের সঙ্গে আলাপ হবে তা আমি জানতুমই না। হঠাৎ—ই হয়ে গেল।’
‘আর অমনি মুখখানি দেখেই গাড়িতে তুলে বাড়ি পাঠিয়ে দিল!’
‘ওঁর এক ছাত্রর এদিকেই বাড়ি। তাকে বললেন আমাদের বাড়ি পৌঁছে দিতে। আমি ঠিক করেছি মালিকে ওঁর কাছে গান শেখাব।’ কথা বলতে বলতে বকুল আঁচলটা তুলে নিল। টেবলে গিয়ে থালা পেতে ডেকচি থেকে ঢাকনা তুলে বলল, ‘ক—টা রুটি দোব?’
‘ওই দুশ্চরিত্রের কাছে মেয়েকে গান শিখতে পাঠাবে?’
‘আমার তো মনে হল উনি ভদ্রলোক।’
‘ভদ্দরলোকের তুমি কী জানো? ক—টা ভদ্দরলোক তুমি আজ পর্যন্ত দেখেছ?’
‘একজনকেও নয়।’ বকুল চারখানা রুটি থালায় রাখল। দিলীপরঞ্জন এক ঝটকায় থালাটা মেঝেয় ফেলে দিল।
‘আমাকে অপমান করার সাহস কোথায় পেলে?’
মেঝে থেকে থালা আর রুটি টেবলে রেখে বকুল বলল, ‘খাওয়ার ইচ্ছে আছে না নেই?’
‘আগে আমার কথার জবাব দাও।’
‘মালিকে আমি সমীরণ মিত্রের কাছে গান শেখাব। ওকে বড়ো করব, পাঁচজনের একজন হবে, ভালো বিয়ে দেব। আমার মতো দুর্ভাগ্য যাতে ওর না হয় সেজন্য আমি সব করব, সবকরব,’ দাঁত চেপে, দু—হাতের মুঠো ঝাঁকিয়ে বকুল জানিয়ে দিল সে বদ্ধপরিকর।
দিলীপরঞ্জন বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল তার বউয়ের দিকে। বকুলের এমন মূর্তি কখনো সে দেখেনি। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নীচু গলায় বলল, ‘খেতে দাও।’
টেবলে দু—হাত রেখে দিলীপরঞ্জন গোঁজ হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে বলল, ‘টাকা আমি দোব না।’
‘লোকের বাড়ি বাসন মেজে আমি টাকা তুলব।’
‘তাই কোরো।’
পরদিন সকালে মালবিকা তার মাকে জানাল, ‘বাবার টাকার দরকার নেই, তোমাকেও বাসন মাজতে হবে না। গান আমি শিখব না।’
.
কিন্তু বকুল ও মালবিকা শনিবার সকাল দশটায় সমীরণ মিত্রর বাড়িতে পৌঁছল। একতলায় স্কুল, দোতলায় সে স্ত্রী ও ছেলে নিয়ে থাকে। সকালে স্কুল বসে না। একতলার দুটো ঘরে তালা দেওয়া। ওরা দোতলায় উঠে এল।
সিঁড়ি থেকেই সামনে একটা ঘর। বড়ো বড়ো গোলাপ ফুলের প্রিন্ট করা ভারী পর্দা দরজায়। ডান দিকে দালান চলে গেছে। সেখানেও পরপর দুটো খোলা দরজায় একই প্রিন্টের হলুদ আর আসমানি রঙের পর্দা ঝুলছে। বকুল সামনের ঘরের পর্দা সরিয়ে উঁকি দিল। ঘরে একমাত্র লম্বা সোফাটায় জড়োসড়ো হয়ে দুটি লোক বসে। বকুলকে দেখেই তারা দাঁড়িয়ে উঠে নমস্কার করল। বকুল হতভম্ব।
চট করে ঘরের চারপাশটা সে দেখে নিল। আর কেউ নেই। বেশ বড়োই ঘর। তিনটে ফোম রাবার আসনের বেতের চেয়ার, বেতের সেন্টার টেবল। দেয়ালে সোনালি পাড় দেওয়া গোল একটি ঘড়ি, যার কাঁটা দুটি রুপালি। ঘরের আধখানা জুড়ে শতরঞ্জির উপর সাদা চাদর, তাতে দুটি গেরুয়া ওয়াড় দেওয়া মোটা তাকিয়া। হারমোনিয়াম, বাঁয়া—তবলা, তানপুরা, অ্যাশট্রে। নিরাভরণ, অগোছালো, অযত্নে রাখা। দেয়ালে দু—তিন জায়গায় পলেস্তারা ফাটা। মেঝে থেকে এক মানুষ সমান লম্বা জানলা, যার তলার অর্ধেকটার খড়খড়ি দেওয়ালে আঁটা, খোলা যায় না। উপরের ভাগের পাল্লা হেলে পড়েছে কবজা থেকে, বহুকাল জানলায় রং করা হয়নি। এমন এক বিমর্ষকর ঘরে খুবই বেমানান লাগে এক ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ীর বিরাট ক্যালেন্ডারটা। উজ্জ্বল হাসিভরা দুটি শিশু লোমশ একটা কুকুরছানা নিয়ে বাগানে খেলছে, অবশ্যই একটা ট্রানজিস্টর ঘাসের উপর রাখা। নতুন সিলিং ফ্যানটাও কড়িকাঠের সঙ্গে খাপ খায় না।
লোক দুটিকে কী বলবে বকুল ভেবে পেল না। মালবিকাই এই অপ্রীতিকর অবস্থা থেকে তাকে উদ্ধার করল।
‘আমরাও কিন্তু সমীরণবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’ মালবিকা ঠেলে বকুলকে ঘরের ভিতরে পাঠাল।
