‘তুই এখন কী কচ্ছিস, থাকিস কোথায়?’
‘একটা ফার্মে আছি, রাত্তিরে পড়ি।’
‘বি এ—টা পাশ করেছিস?’
‘হ্যাঁ। তুমি কি এখনও বই বাঁধানোর কাছে আছ?’
‘না অনেকদিন ছেড়ে দিয়েছি। এই কাজটা…।’
অনন্ত থেমে গেল। ওকে বলা যাবে না। অমর জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে।
‘…বছর চারেক করছি। একটা এস্টেটে, এখন আর জমিদারি নেই, ওদের কলকাতার বাড়িগুলোর দেখাশোনা ভাড়া আদায় এই সব করি।’
‘অনু—অলুর কোন ক্লাস হল, পড়ছে ওরা?’
‘অনু ছেড়ে দিয়েছে পড়া, অলুর এবার প্রি—ইউ।’
‘ছাড়ল কেন, পড়া কি ছাড়তে আছে! এবার তা হলে বিয়ে দিয়ে দাও।’
নিজের বোন নয়, যেন দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিচ্ছে এমন ভঙ্গিতে অমর বলল। অনন্তের ভিতরটা ক্রমশই বসে যাচ্ছিল। ফিকে হেসে ওমলেটের শেষ টুকরোটা চামচেয় তোলার চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘তাই ভাবছি। টাকাপয়সা তো নেই হাতে…।’
অনন্তের আশা জাগল, অমর এবার বলবে সে সাহায্য করবে। কিন্তু তার বদলে সে ওমলেটের টুকরোটাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘ওভাবে উঠবে না, হাত দিয়ে তুলে নাও।’
অপ্রতিভ হয়ে অনন্ত তাই করল। অমর টাকা দিয়ে সাহায্য করবে না এটা সে বুঝে গেছে। কিংবা হয়তো চাইছে হাতজোড় করে দাদা তার কাছে টাকা চাক।
কিন্তু সে চাইবে না। ক—টা বছর একাই সংসার চালিয়ে গেল, একাই সে বোনেদের বিয়ে দেবে। যেমন ভাগ্য করে এসেছে তেমন পাত্রই পাবে।
‘উঠব এবার।’
অমর ইশারায় ছেলেটাকে ডেকে বুকপকেট থেকে পাঁচ টাকার নোট বার করে দিল।
‘তুই তা হলে আর আসবি না।’
‘না।’
‘খোঁজখবরও করবি না?’
‘এই তো খোঁজ নিলুম, এইভাবেই নেব…দূরে থাকাই তো ভালো।’
‘তুই কি আমার ওপর রেগে আছিস এখনও?’
অমর হাসল। স্বচ্ছ উদার। তাতে একছিটেও মালিন্য নেই।
‘একদমই না। হ্যাঁ, তখন রেগে ছিলুম তো বটেই। এখন বুঝতে পারছি ভালোই করেছি। সবাই মিলে ওভাবে একসঙ্গে, কোনোক্রমে আধপেটা খেয়ে বেঁচেবর্তে শুধু দিন কাটিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই হত না। জড়াজড়ি করে এখন আর কিছু করা যায় না। বড়োজোর ভেসে থাকা যায় কিন্তু সাঁতার কাটা যায় না।’
‘সবাইকে দেখা, ভরণপোষণ…দায়িত্ব আছে সেটা তো পালন করা উচিত বিশেষ করে যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। নয়তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষে করতে হবে। …মা দাসেদের বাড়ি রাঁধুনির কাজ নেবে বলেছিল আমি নিতে দিইনি…না খেয়ে থাকব সে—ও ভালো তবু মানসম্মান খোয়াব না।’
অনন্ত জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে রইল। অমরের মুখে বিরক্তিটা প্রকট হয়ে উঠেছে। খুচরো পয়সাগুলো পকেটে রেখে বাঁ হাতের তালুতে মৌরি তুলে নিল।
‘মানসম্মান বাঁচিয়ে রেখে কী পেয়েছ? চার বছর আগে যা ছিলে এখনও তো তাই আছ…ভবিষ্যতেও তাই থাকবে…লোকে বলবে তোমরা মানী, সৎ, ভালো…তাই দিয়ে কি অনুর বিয়ে দেওয়া যাবে?’
‘সেটা আলাদা কথা, যা চলে আসছে, যা নিয়ম সেইভাবেই বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। সম্মান একটা আলাদা ব্যাপার।’
‘কীসে আলাদা?’
অনন্ত এই মুহূর্তে কোনো জবাব খুঁজে পেল না। সে উঠে দাঁড়াল।
‘তুই তা হলে আমাদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখবি না?’
‘রাখারাখির কী আছে! তোমাদের কি কোনো অসুবিধা হয়েছে আমি না থাকায়?
‘না।’
অস্বাভাবিক জোর দিয়ে সে ‘না’ বলল। অমরের যে আদৌ কোনো গুরুত্ব নেই তাদের সংসারে এটাই সে বোঝাতে চাইল।
‘তাহলে? কী দরকার সম্পর্কের ডালপালা ছড়িয়ে?’
‘তাতে সাঁতার কাটায় সুবিধা হয়।’
‘ঠিক।’
অমরের সঙ্গে এরপরও কয়েকবার দেখা হয়েছে রাস্তায়, এই চায়ের দোকানের সামনে। ‘ভালো আছিস?’ ‘বাড়ির সবাই ভালো?’ ‘মা তোর কথা বলছিল, দেখতে চায়।’ ‘যাব একদিন।’ এইভাবেই হাঁটা থামিয়ে তারা কথা বলেছে। অমর কোথায় থাকে, কোথায় কাজ করে কিছুই বলেনি, অনন্তও জানাতে চায়নি। প্রথমদিন দেখা হওয়ার কথাটা সে মা—কে বলেছিল, তারপর আর বলেনি। মা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অমর সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছিল তার কাছে।
অনুর বিয়ের জন্য অর্থ ও পাত্র জোগাড় করার ভাবনা মাঝে মাঝেই তাকে বিব্রত করত। মাঝে মাঝে মনে হত অমর ঠিকই বলেছে, জড়াজড়ি করে সাঁতার কাটা যায় না। কীভাবে সাঁতার কাটতে হয় সেটাও শেখেনি। অমর বেরিয়ে গিয়ে শিখেছে। হয়তো পাড়ে উঠতে পারবে।
বিজ্ঞাপন দেখে নিয়মিত চিঠি দিয়ে যাচ্ছিল অনন্ত। কটক থেকে একটি জবাব তাকে আশান্বিত করল। মাকে চিঠি দেখাল। ছোটো চিঠি, পাত্রপক্ষ একপয়সাও নগদ নেবে না, একরতি সোনাও চায় না। মেয়ে পছন্দ হলে তারাই বিয়ের খরচ দিয়ে মেয়ে নিয়ে যাবে।
শীলা অবাক হয়ে বলল, ‘শুনেছি এরকম অনেক বিয়ে হয়েছে, বরপক্ষই খরচ দিয়ে মেয়ে নিয়ে গেছে। সে—সব পরমাসুন্দরী মেয়ে…অনু তো দেখতে পাঁচপাঁচি!’
‘বলি না মেয়ে দেখে যেতে।’
‘অতদূরে, খোঁজখবর নেওয়া তো সোজা নয়। কেমন ঘর, কেমন লোক, ঠগ কি না কিছুই তো জানি না। ঠাকুরপোকে বল না একবার। ওর তো চেনাশোনা কেউ কটকে থাকতে পারে, খোঁজখবর নিয়ে জানাবে।’
অবিনাশের চেনালোক ছিল ভুবনেশ্বরে। সে প্রায় রোজই কটকে যায় ব্যবসা সূত্রে। তাকে দিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তিনপুরুষ তারা কটকের বাসিন্দা, সম্পন্ন একান্নবর্তী বিরাট পরিবার। দুটি দোকান আছে গহনার। পাত্রের বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ, বিয়ে হয়েছিল, বউ মারা গেছে একটি এক বছরের ছেলে আছে। পাত্র ক্লাস সেভেন—এইট পর্যন্ত পড়েছে।
