‘চোখে দ্যাখোনি, আলাপও ছিল না আর অমনি অমনি সমীরণ মিত্তির গাড়ির ব্যবস্থা করে দিল? কেন? তার কীসের অত আঠা যে মা আর মেয়েকে দেখেই রসে চপচপে হয়ে পড়ল।
বকুল এসব কথার কী জবাব দেবে। সে চুপ করে রইল। রান্নাঘরে মালি রুটি সেঁকছে না বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনছে, সেটাই তাকে ভাবনায় ফেলল। স্বামী বহুদিন, বহুভাবে মেয়ের সামনে তাকে হেনস্থা করেছে, মারধোরও। কিন্তু মালি এখন উনিশ বছরের। এসব এখন বন্ধ করা উচিত। বয়স্ক বাবা—মার কুৎসিত কথাবার্তা আচরণের প্রভাব যতটুকু মালির উপর পড়েছে তাতেই ওর যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে গেছে। কিন্তু আর এটাকে বাড়তে দেওয়া যায় না।
কিন্তু কী করে সে বন্ধ করবে। তার অত ক্ষমতা কোথায়? সে তো স্বামীর হাততোলা! পালটা সেও যদি চিৎকার করে? তাতে তার স্বামী লজ্জা পাবে না, মুখও বন্ধ করবে না। বরং সারা বাড়ি তার বিরুদ্ধে যাবে। এই বাড়িতে সে বাইরের লোক। মারধোর করলে পালটা মার দেবে? তার অত গায়ের জোর কোথায়? বরং বাধা না দিয়ে মার খেলে অল্পক্ষণেই তার স্বামীর প্রহারের উৎসাহটা কমে যায়।
কোনো কোনো গভীর রাতে চেতনায় অপমান আর শরীরে যন্ত্রণা নিয়ে বেঘোরে ঘুমোনো স্বামীর পাশে শুয়ে বকুল তার ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে, ‘আমাকে বিধবা করে দাও। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আর কোনো উপায় আমার সামনে নেই।’ মনে মনে সে বহুবার তার স্বামীর মৃতদেহ দেখেছে। বাসের তলায়, জলে ডুবে, সাপের কামড়ে, চারতলার ছাদ থেকে পড়ে, ভেজাল চোলাই খেয়ে দিলীপরঞ্জন মারা যাচ্ছে, এমন ছবি তার চোখে ভেসে উঠেছে। দেখতে দেখতে উত্তেজিত মাথা একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়লে সে ভয়ে কাঁটা হয়ে তারপর ভেবেছে, আমার আর মালির তখন কী হবে? আমাদের খাওয়াবে পরাবে কে? দিন চলবে কী করে? ভাসুরদের দয়ায়? সংসারে ঝি হয়ে?
বেঁচে যাওয়ার একমাত্র উপায় হিসাবে অতঃপর সে দেখতে পায় নিজের মেয়েকে। যদি তার মেয়ে রোজগার করতে পারে সে ঠিক করে রাখল, তা হলে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে এই বাড়ি ছেড়ে। কখনো—না—কখনো তার দিন আসবেই, এই চিন্তাটাই তাকে আশা দিয়ে সব অত্যাচার সহ্য করিয়ে গেছে। কিন্তু কীভাবে যে লক্ষ্যপূরণ হবে সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। মালবিকার লেখাপড়ায় মাথা নেই কিন্তু সুন্দর একটা গানের গলা আছে। এই সংক্ষিপ্ত জানাটুকুর সঙ্গে তার বাস্তববোধ যুক্ত করে সে বুঝেছে, গান ছাড়া তার মেয়ের বড়ো হয়ে ওঠার মতো আর কোনো সংগতি নেই। অপ্রত্যাশিতভাবে সমীরণ মিত্রর সঙ্গে আলাপ হয়ে যাওয়াটাকে সে ভগবানের দান হিসাবে গণ্য করেছে। এই দান সে দু—হাতে আঁকড়ে ধরবে, সেজন্য যত অত্যাচার সহ্য করতে হয় সে করবে।
বকুল ও দিলীপরঞ্জনের মধ্যে কথাবার্তার মাঝে, কাহিনির প্রবাহ বন্ধ করে এত যে কথা ঢুকিয়ে দেওয়া হল, তার কারণটি খুবই প্রাঞ্জল। বকুল তার অসহায় অস্তিত্বের মধ্যে ডুবে রয়েছে এবং মেয়েকে কোথাও একটা শক্ত জমিতে দাঁড় করিয়ে নিজে ভেসে থাকতে চাইছে। এই দুই বিপরীত অবস্থার সংঘাত তার মধ্যে আলোড়ন তুলছে এবং তার ফলে তার আচরণে ও কথায় মরিয়া ভাব এসে যাওয়া যে স্বাভাবিকই, সেই কথাটাই বলে দেওয়া হল।
দিলীপরঞ্জন যখন তাকে বলল, ‘তার কীসের অত আঠা যে মা আর মেয়েকে দেখেই রসে চপচপে হয়ে পড়ল!’ তখন বকুলের দীন করুণ ভাবটা নিমেষে বদলে কঠিন হয়ে উঠল।
‘কেউ যদি আমাদের দেখে চপচপে হয়, তা হলে আমরা কী করতে পারি।’
‘কী করতে পারি মানে?’ ধমক দিয়ে উঠল দিলীপরঞ্জন। ‘তুমি কী জানো লোকটা কেমন? জানো না বোলো না, বহু লোক একসময় চরিয়েছ লোক চেনো না বোলো না। সমীরণ মিত্তির একের নম্বরের ক্যারেক্টারলেস, শুয়োরের বাচ্চচা, অনেক মেয়ের সর্বনাশ করেছে। ওর সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। বউ তো দু—বার ওকে ছেড়ে চলে গেছল। ওর এক ছাত্রী রেপিং চার্জ এনেছিল ওর নামে, পুলিশকে খাইয়ে শেষ পর্যন্ত কেস ভন্ডুল করে দেয়। লম্পট মাতাল কোথাকার।’ খাট থেকে উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে উঠল দিলীপরঞ্জন। ঘৃণায় তার মুখের পেশি বিকৃত।
‘তুমি অন্য লোককে মাতাল বলো কী করে? তোমার নামেও তো ঘুষ নেওয়ার চার্জ তোমার অফিস এনেছিল। তুমিও তো গাড়িটা বিক্রি করে টাকা খাইয়ে চাকরি বাঁচিয়েছ।’ বকুল জানে তার কথার প্রতিক্রিয়াটা মারাত্মকভাবে হবে। তাই হোক, তবু সে আজ কথা বলবে।
দিলীপরঞ্জন অদ্ভুত চোখে তার বউয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। দরজায় দাঁড়িয়ে মালবিকা বলল, ‘খাবার গরম করেছি, দিয়ে যাব?’
‘নিয়ায়।’ বকুল উঠে গেল একধারের দেয়াল ঘেঁষে রাখা টেবলটায়। শোবার ঘরের মধ্যেই তাদের খাওয়া সারতে হয়। একসময় যে ঘরে তারা খেত সেটা এখন মালবিকার ঘর।
‘সমীরণের হয়ে ওকালতি করছ যে, ব্যাপার কী?’
‘কোথায় আবার ওকালতি করলুম!’
‘আমি মদ খাই ঠিকই কিন্তু পরের বউ—মেয়ের দিকে হাত বাড়াই না। ও আর আমি এক জিনিস নই।’
দুটো বড়ো বাটিতে ডাল আর ডিমের ঝোল হাতে নিয়ে মালবিকা ঘরে ঢুকে টেবলে রেখে বেরিয়ে গেল। বেরোবার সময় একবার বাবার মুখের দিকে তাকাল।
‘হ্যাঁ, তুমি শুধু নিজের বউয়ের দিকেই হাত বাড়াও, তফাতটা শুধু এই।’
‘চুপ কর হারামজাদি, যত বড়ো মুখ নয় তত বড়ো কথা! জিভ টেনে ছিঁড়ে দেব।’
