‘তবু দ্যাখো না একবার। গুণী লোকের কাছে প্রথম থেকেই শেখা ভালো।’
বকুল তিনতলায় যাবার সিঁড়িতে যখন পা রেখেছে পিছন থেকে তখন অর্চনা বলল, ‘আচ্ছা তুমি কার গাড়িতে এলে গো?’
‘তোমায় কে বলল?’ বকুল প্রশ্নটা পেয়ে খুশি হল।
‘শুনলুম ভটু বড়দিকে বলছিল ছোটোকাকি মোটরে করে বাড়ি এল।’
‘এই দ্যাখো, সামান্য একটা ব্যাপার সেটাও বাড়িতে খবর হয়ে গেল। আচ্ছা সব লোক বাবা! সমীরণ তো, ইয়ে সমীরণবাবু তো তাঁর নিজের খাবারের প্লেটটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সবই আপনার। শেষ করতেই হবে।’ এই অ্যাত্তো বড়ো বড়ো তিন টাকা চার টাকা দামের গোটা ছয়েক মিষ্টি।’ হাত দিয়ে মিষ্টির আকার দেখাবার সময় সে আড়চোখে একবার মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিল। মালবিকার মুখের বিরক্তি সে গ্রাহ্য করল না।
‘তা দু—জনে মিলে তো শেষ করলুম। লোকটা কী ভদ্র আর বিনয়ী দ্যাখো সেজদি। এই তো সবে প্রথম আলাপ, তারপর বলল…বললেন, ‘আপনাদের বাড়ি পৌঁছে দেবে আমার এক ছাত্র।’ ছেলেটির নাম মিহির, দুশো টাকা দিয়ে গান শেখে। বিরাট প্রেসের মালিক। কলকাতায় সাত—আটটা বাড়ি, গাড়িই দু—খানা, এক বোন আমেরিকায় ডাক্তারি করছে। খুবই শিক্ষিত, গান শিখছে শখ করে। দিদিকে পাতিপুকুরে পৌঁছে দিয়ে সে আমাদের নামিয়ে দিল।’
‘তোমার দিদি আছে জানতাম না তো!’
‘বলিনি, পিসতুতো দিদি। আমার কে কোথায় আছে সে খবর তো এ বাড়ির কেউ জানতে চায় না, তাই আর বলিও না।’ বকুলের চোখেমুখে সামান্য অভিমান ফুটে উঠল। ‘দিদি একবার ফোন নম্বর চেয়েছিল আমি বলেছিলুম আমাদের বাড়িতে ফোনটোন নেই।’
‘সে কী, নেই বললে কেন?’ অর্চনা বিব্রত হল, বাড়িতে টেলিফোন নেই, এমন এক লজ্জাজনক মিথ্যা খবর ছোটোজারের পিসতুতো দিদির কাছে পৌঁছে গেছে, এতে সে ক্ষুব্ধ হল। ‘এক্ষুনি ওনাকে ফোন করে আমার নম্বরটা বলে দাও।’
ফাঁপরে পড়ল বকুল। উমার বাড়িতে ফোন আছে কি না সেটা তার জেনে নেওয়া হয়নি। মায়ের মুখ দেখেই মালবিকা বুঝে নিল বাড়াবাড়িটা রাশছাড়া হয়ে গেছে।
‘মাসির বাড়িতে ফোন করবে কী, আজ এগারো দিন হল ডেড হয়ে রয়েছে না? তুমি তা হলে তখন শুনলে কী?’ মালবিকা মাকে ছোট্ট ধমক দিল। ‘এখন চলো, বাবা এসে পড়বে।’
‘হ্যাঁ চল। সেজদি, আমি অবুর কথা বলব।’
তালা খুলে ঘরে পা দিয়েই বকুল সিল্কের শাড়ি খুলতে খুলতে বলল, ‘মালি, চট করে রুটিগুলো বেলে দে। দেরি হয়ে গেছে বড্ড।’
শাড়িটা খাটের উপর ছুড়ে দিয়েই সে আলনা থেকে আধময়লা তাঁতের শাড়ি তুলে নিল। ঘরের উত্তরের দেয়ালে মালবিকার ছোট্ট ঘরটার দরজা। দরজায় এসে উঁকি দিল বকুল। মালবিকা জুঁইয়ের গোড়েটা তার বালিশের উপর বিছিয়ে রাখছে। ভ্রূ কুঁচকে বিরক্ত স্বরে বকুল বলল, ‘আদিখ্যেতা এখন রাখ। আটা মাখাই আছে, বেলে দে, আমি তাড়াতাড়ি রুটি করে ফেলছি। ইসস বড্ড দেরি হয়ে গেল।’
দু—বেলার রান্না সকালেই সেরে রাখে। রাতে শুধু রুটি করা, আর রান্নাগুলো গরম করে নেওয়া। ঘরের বাইরের বারান্দা দিয়ে যেতে হয় রান্নাঘরে ও কলঘরে। মা ও মেয়ে দুজনেই যখন রান্নাঘরে তখন শোবার ঘর থেকে দিলীপরঞ্জনের ডাক শোনা গেল।
‘শুনে আয় তো কেন ডাকছে।’
‘তুমি যাও, আমি এগুলো করে ফেলছি। আর মাইনের কথাটা বোলো। দুশো টাকা শুনেই যেন না লাফিয়ে ওঠে।’
বকুল শোবার ঘরে ঢোকামাত্র খাটে পা ঝুলিয়ে পাজামা পরা, খালি গায়ে দিলীপরঞ্জনের চোখ কুঁচকে গেল। চাপা গলায় সে বলল, ‘গাড়িটা কার?’
‘কার মানে!’ বকুল বুঝে উঠতে পারল না প্রশ্নের আড়ালে কী জমা রয়েছে।
‘কার মানে কার। এর থেকে সোজা বাংলা আর কী হতে পারে। কার গাড়িতে চেপে এলে?’
‘তোমাকে তো বলেই ছিলুম, মায়া আর তার বর অফিসের ফাংশান দেখতে যাবে না বলে কার্ড দুটো আমাদের—’
বকুলকে থামিয়ে দিয়ে দিলীপরঞ্জন বলল, ‘কার্ডের কথা নয় গাড়ির কথা জানতে চেয়েছি।’ কিছুক্ষণ বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সে আবার বলল, ‘ছোকরা কে, যার গাড়ি চড়ে এলে?’
‘তুমি দেখেছ?’
‘দেখেছি। মোড়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলুম। দেখলুম গাড়িটা ঢুকল গলিতে। দূর থেকে দেখলুম খুব গল্প হচ্ছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। ব্যাপারটা কী?’
বকুলের মনে হল তার স্বামী অল্পই খেয়ে এসেছে। এখন আর টাকা খরচ করার সামর্থ্য নেই, দেশি চোলাই দিয়েই নেশাকে সন্তুষ্ট রাখে। খুব বেশি খেয়ে দিলীপরঞ্জন তিনতলা পর্যন্ত টলমল অবস্থায় পৌঁছে গেলে বকুলের উদবেগ ও শারীরিক যাতনাটা কিছু কমে। নিয়ন্ত্রণ হারানো দেহটাকে টেনে হিঁচড়ে, ঠেলেঠুলে খাটের উপর ফেলে দিতে পারলেই কাজ চুকে যায়। এতে মালিও তাকে সাহায্য করে।
কিন্তু অল্প খেয়ে সামান্য নেশা নিয়ে বদমেজাজ তৈরি করে ফিরলে বকুল প্রমাদ গোনে। আজও সে প্রমাদ গুনল।
‘নিজে মোটরে চড়ছ চড়ো, আমার এখন তো আর মোটর নেই, অন্যের মোটরে তো চড়বেই। তাই বলে মেয়েটাকে চড়তে শেখাচ্ছ কেন?’ দিলীপরঞ্জনের ধীরে ধীরে শান্ত কঠিন গলায় বলা কথাগুলো বকুলের রক্ত হিম করে দিল। নিশ্চয় পুরোনো কথা তুলে চিৎকার করবে ‘ফাংশানে সমীরণ মিত্রের সঙ্গে একজন আলাপ করিয়ে দিল, তিনিই তাঁর এক ছাত্রকে গাড়ি করে আমাদের পৌঁছে দিতে বললেন, এঁদের কাউকেই কখনো আগে দেখিনি, আলাপও ছিল না। বিশ্বাস করো।’ বকুল ক্ষমাপ্রার্থীর মতো স্বরে বলল।
