‘এতে একটুও ব্যবসা নেই। আবার তো দেখা হচ্ছে সমীরণদার ওখানে, তখন নয় চা খাওয়ার দিন ঠিক করে নোব।’
‘তুমি কী বাবা টেস্টের সময় থাকবে?’ বকুল আর একবার উদবিগ্ন হল।
‘বলেন যদি থাকব, তবে সমীরণদা ওকে নিয়ে নেবেন।’
‘তুমি থেকো বাবা। আর মাইনের ব্যাপারটা, কমসম করবে কি?’
‘বলে দেখুন না। আপনারা শনিবার দশটা—সাড়ে দশটা নাগাদ যাবেন।’
মিহির গাড়িতে উঠল। বকুল মালবিকা ফটকের দিকে এগোল। গাড়িতে স্টার্ট সবে দিয়ে মিহির দেখল, মালবিকা দ্রুত তার দিকে আসছে।
‘কী ব্যাপার!’
জানলায় মাথা ঝুঁকিয়ে চাপা স্বরে মালবিকা বলল, ‘আচ্ছা তখন একটা কথা বললেন, সমীরণদা ভালো গলা আর সুন্দরী হলে কমেতে শেখান, এ—কথা কেন বললেন?’
‘কেন মিথ্যে বলেছি নাকি? আপনি সুন্দরী নন?’
মালবিকাকে এই প্রথম, প্রায় অপরিচিত একজন, আচমকা সুন্দরী বলল। রমণীয়ভাবে সে অপ্রতিভ বোধ করল।
‘বেশ তাই নয় হলুম কিন্তু আমার গলা ভালো এটা জানলেন কী করে? আমি তো কখনো আপনার সামনে গাইনি।’
‘এটা নিছকই অনুমান করে বললুম। গলা আপনার হেঁড়ে নয় আর আপনি গান শেখায় আগ্রহী, ব্যস। ভালো গাইয়ে হওয়ার জন্য এটাই তো যথেষ্ট।’
রিভার্স গিয়ার দিয়ে মিহির ক্লাচ ছেড়ে দিল। গাড়ি পিছু হটে গলি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। মালবিকা তাকিয়ে রইল।
‘ছেলেটার পয়সাকড়ি আছে, বড়োলোক, মনটাও ভালো।’
মালবিকা প্রায় চমকে উঠে পিছনে তাকাল। বকুল কখন যেন তার পিঠের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
‘তাতে কী হল, অত্যন্ত বেঁটে।’
‘তাতেই বা কী হল! টাকার উপর দাঁড়ালেই লম্বা হয়ে যায়।’
‘কিছুই হয় না, চলো ভেতরে যাই। ওর ঘাড়ে, গেঞ্জির গলার কাছে বোতামের সাইজের একটা সাদা স্পট দেখলুম, বোধহয় শ্বেতি।’
.
যে ঘটনাটার কথা বলা হবে তাতে মিহিরেরও একটা বড়ো অংশ আছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবকটি লোকেরই যৎকিঞ্চিৎ পরিচয় দেবার চেষ্টা এতক্ষণ করলাম। ঘটনাটি ঘটবে কিন্তু বিরানব্বই সালের ছয় ডিসেম্বর। দিনটা ছিল রবিবার। সুধাংশু গাঙ্গুলি সেদিনই বাজারে গিয়ে চার ইঞ্চি সাইজের হাফ কেজি চিংড়ি কিনে ফেলবেন।
কিন্তু এখন মা ও মেয়ে প্রসন্ন ও কিঞ্চিৎ উত্তেজিত মনে বাড়িতে ঢুকল। দোতলায় উঠেই সিঁড়ির মুখে দেখা হল বকুলের বড়োজা পার্বতীর সঙ্গে। বয়স ষাটের কাছাকাছি। স্থূলকায়া, রাশভারী চালচলন, কথাবার্তায় বুঝিয়ে দেন হাঁড়ি আলাদা হলেও এই পরিবারের তিনিই প্রধানা।
‘কীসের মালা রে?’
‘দিদি, ওকে সমীরণ মিত্র নিজের হাতে দিয়েছে।’ বকুলের চোখমুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
‘কে সমীরণ মিত্র?’ পার্বতী স্থির ঠান্ডা চোখে ও গলায় বুঝিয়ে দিলেন নামটা এই প্রথম শুনলেন। বকুল বাকরহিত হয়ে রইল।
‘গান করেন। খুব নাম এখন।’ মালবিকা জানিয়ে দিল।
‘অ। তোকে মালা দিল কেন, চেনে?’
‘আজই প্রথম আলাপ হল। মহাজাতি সদনে একটা ফাংশান ছিল, আমি আর মালি শুনতে গেছলুম। সেখানে আমার এক দিদি গান হয়ে যাবার পর আমাদের গ্রিনরুমে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতেই কী ভেবে জানি না মালিকে উনি মালাটা উপহার দিলেন!’ এক নিশ্বাসে বকুল কথাগুলো বলল। ‘আমি তো অবাক। পরিচয় হতে—না—হতেই…আর বললেন, আমার গানের স্কুলে এসো, স্পেশাল ক্লাসে গান শেখাব।’
‘ভালো।’ পার্বতী পাশ কাটিয়ে নেমে গেলেন।
বকুলের শেষের কথাটা সেজোজা অর্চনা শুনতে পায় ঘর থেকে। বেরিয়ে এসে সে ডাকল বকুলকে।
‘মালি গান শিখবে বুঝি সমীরণ মিত্তিরের কাছে?’
‘হ্যাঁ। স্পেশালে শেখাবে…শেখাবেন।’
‘কত করে নেবে?’
‘ওইটেই তো সেজদি মুশকিলে ফেলেছে…দুউউশো! তোমার দেওরকে তো জানোই, মাসে মাসে এতগুলো টাকা বাড়তি খরচ!’
‘নামি লোকের কাছে গান শেখাতে গেলে খরচ তো করতেই হবে। অবুকে ভাবছি ভালো কারুর কাছে শিখতে দেব, তুমি একটু দ্যাখো না?’
অর্চনার অনুরোধটা অনুনয়ের ধার ঘেঁষে গেল। ঘর থেকে অবু অর্থাৎ অবন্তি এইসময় বেরিয়ে এসে মায়ের পাশে দাঁড়াল। বিয়ের এগারো বছর পর বহু ডাক্তার—বদ্যি দেখিয়ে ঠাকুর দেবতার দোর ধরে মানত করে অর্চনার অবশেষে কন্যালাভ হয়। অবু মায়ের মতোই কৃশ, লম্বা, বছর বারো বয়স। মুখটি খুবই মিষ্টি। এরই গানের শিক্ষিকার কাছে মালবিকা কিছুকাল গান শিখেছে।
বকুল দ্রুত চিন্তা করে নিল, সেজদির ঘরে ফোন আছে। যদিও আজ পর্যন্ত তাকে ফোন করতে বা ধরতে ওই ঘরে যেতে হয়নি কিন্তু এবার যদি কেউ তাকে করে? উমা বা মিহির কিংবা কোনো কারণে সমীরণ মিত্র যদি তাকে বা মালিকে ফোনে ডাকে? কাউকে ডেকে ফোন দেওয়ার ব্যাপারে তার এই সেজোজা—টি খুবই বিরক্ত হয়। বহু সময় বলে দেয় ‘বাড়ি নেই’। এজন্য তো বটেই তা ছাড়া এই বাড়িতে পুরুষ—মেয়ে মিলিয়ে সবার মধ্যে অর্চনাই একমাত্র এম.এ, দর্শন শাস্ত্রে। তাকে সবার অপছন্দের অন্যতম কারণ, এই তথ্যটি সুযোগ পেলেই সে জানিয়ে দেয়। বড়োজা পার্বতীও তাকে এড়িয়ে চলেন। সেজোভাসুর কেমিক্যালসের ব্যবসায়ী, রোজগার ভালো।
সেজোজা—কে হাতে রাখা দরকার, বকুলের দ্রুত চিন্তার সেটাই শেষ কথা। ‘নিশ্চয় বলব সেজদি। এখনও তো অবুর গলা তেমন তৈরি হয়নি, ওকে স্পেশালে দেবার দরকার কী? পঞ্চাশ টাকার ক্লাসে ভরতি করিয়ে দাও না। ওখানেও খুব মন দিয়ে শেখায়। তবে এত ভিড় যে নতুন ভরতি করছে কি না জানতে হবে।’
