মালবিকার প্রশ্নটা এল তার মায়ের কথা শেষ না হতেই।
‘না।’
‘চার বছর ধরে তা হলে কী শিখলেন?’
‘বলতে পারেন কিছুই শিখিনি।’
‘অ্যা!’ এবার স্তম্ভিত বকুলের কণ্ঠস্বর, ‘চার বছরেও কিছু শিখতে পারলে না। তা হলে নাম করবে কবে?’
‘নামটাম করার ইচ্ছা নিয়ে শিখছি না। প্রাচীন বাংলা গানের কথা আমার ভালো লাগে, বিশেষ করে নিধুবাবুর গান। সমীরণদার কাছে গানের প্রচুর স্টক রয়েছে আমি তার থেকে কিছু কিছু তুলে নিচ্ছি।’
‘তুলে নিয়ে কী করবেন?’ মালবিকার জিজ্ঞাসা।
‘গাইব, তবে পাঁচজনের সামনে নয়। নিজের মনেই গাইব।’
‘অদ্ভুত তো!’
‘অদ্ভুত কেন হবে?’ বকুল মেয়ের কথার মৃদু প্রতিবাদ করল। ‘অনেকেই তো আপন মনে গায়। যার টাকার দরকার সে ফাংশান করে, ক্যাসেট করে—’
‘থামো তো। সবাই শুধু টাকার জন্যই গায় না।’ ছোট্ট ধমকটা দিয়ে মালবিকা জুঁইয়ের গোড়েটা মায়ের নাকের কাছে ধরে বলল, ‘শুঁকে দ্যাখো, গন্ধটা কিন্তু ভারি মিষ্টি।’
‘সমীরণ মিত্তিরের টাকার অভাব নেই। গাড়ি করেছেন, পার্ক সার্কাসে ফ্ল্যাট কিনছেন, গানের স্কুল থেকেও যথেষ্ট আয়। উনি এখন কি শুধু টাকার জন্যই গান?’ মিহির আরজিকর হাসপাতাল পেরিয়ে খালের ব্রিজের উপর দিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল, ‘একটা জায়গায় উঠে গেলে আর তখন নামা যায় না। বলতে পারেন নেশার মতো তখন গান গাওয়াটা পেয়ে বসে।’
‘ঠিক বলেছেন।’ মালবিকা তারিফ না জানিয়ে পারল না।
বকুলের মনে হল, তাই যদি হয় তা হলে মালিকে তো ফ্রি—তেই স্পেশ্যালে ভরতি করে নিতে পারে!
‘সমীরণের ওখানে মাইনেটা বড়ো বেশি।’ কথাটা বলামাত্রই পাঁজরে একটা কনুইয়ের ধাক্কা পেল বেশ জোরেই।
‘সমীরণবাবু বলো।’ ফিসফিসিয়ে মালবিকা বলল।
‘হ্যাঁ একটু বেশি, এটা ভিড় এড়াবার জন্য। আলাদা করে না শিখলে পঞ্চাশ টাকা।’ গাড়িটাকে বাঁ দিকে রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটে ঢুকিয়ে মিহির চট করে একবার পিছনের সিটের দিকে তাকিয়ে নিয়ে যোগ করল, ‘আপনাদের কাছে দুশো চাইবেন না।’
‘কেন’, মালবিকা উত্তর দাবি করল। মিহির উত্তর দিল না, শুধু তার মুখে এক চিলতে হাসি খেলে গেল।
‘এ—কথা বললেন কেন?’ মালবিকার স্বর এবার কৌতূহলে নরম।
‘সমীরণদা ভালো গলা পেলে আর যদি সুন্দরী হয় তা হলে কমেতেও শেখান।’
‘এখানে এখানে, এই বাঁ দিকের রাস্তাটায়।’
বকুলের ব্যস্ত গলা মিহিরকে ব্রেক কষাল। দেশবন্ধু পার্কটা তারা ছাড়িয়ে এসেছে। পাশাপাশি দুটো মোটর যাবার মতো একটা রাস্তা বাঁ দিকে।
‘আপনি ভালোই কথা বলতে পারেন।’
মিহির পুরো মুখ ফিরিয়ে মালবিকার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ব্যবসা করে খাই তো।’
‘আপনার বাড়িতে সত্যিসত্যিই কি দিদি জামাইবাবুর আসার কথা?’
‘দিদি কাল এসেছে। জামাইবাবুর আসার কথা নেই।’
‘তা হলে মিথ্যে কথা?’
‘বলেইছি তো ব্যবসা করে খাই। আমার তখন চা খাবার ইচ্ছে ছিল না। সে—কথা না বলে এই কথাটা বললুম, একই ব্যাপার।’
‘এই যে, এই যে।’
বকুলের কথায় মিহির গাড়ি দাঁড় করাল একটা লোহার ফটকের সামনে। ফটকের ধারেই রাস্তার ইলেকট্রিক ল্যাম্প পোস্ট। জায়গাটায় যথেষ্ট আলো। ফটক থেকে সোজা একটা পথ ভিতরে গেছে। তার শেষে একটা কাঠের পাল্লা দেওয়া মোটর গ্যারেজ। বাড়িটা পথের ডান দিকে। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল মিহির। ওরা দুজনও নেমেছে।
‘কী দেখছেন? খুব পুরনো বাড়ি, দেড়শো বছর বয়স। একতলার দেয়ালগুলো আমার হাতের দু—হাত চওড়া।’ মালবিকা তার দু—হাতের আঙুলের ডগা বেঁকিয়ে হাতটা সমান্তরাল করে দেখাল।
‘আমাদের বাড়ির দেয়াল আড়াই হাত চওড়া। দিদিদের শ্বশুরবাড়ির দেয়ালও তাই।’
বকুল বাড়ির দোতলার বারান্দা আর খড়খড়ি দেওয়া জানলাগুলোর দিকে দু—তিনবার তাকাল। ট্যাক্সিতে নয় একটা প্রাইভেট গাড়িতে চড়ে এসেছে অথচ বাড়ির কেউ সেটা দেখল না তা তো হতে পারে না।
‘আচ্ছা, সমীরণবাবু মালিকে কী টেস্ট করবে বলতে পারো?’ বকুল রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা করল, গাড়িটাকে কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য। খড়খড়ি তুলে কেউ—না—কেউ নিশ্চয়ই দেখবে আর সারা বাড়িতে চাউর করবে, এটাই সে এখন চায়।
‘একটা দুটো গান গাওয়াবেন, তাল টাল নিয়ে দু—চারটে প্রশ্ন করবেন—’
‘তাল! মালি তুই জানিস তো?’ বকুল উদবিগ্ন হয়ে পড়ল। ‘তবলার সঙ্গে তো ও গান শেখেনি।’
‘আমাদের বাড়িতে তবলা নেই। তবলার আওয়াজ আমার জ্যাঠারা পছন্দ করেন না।’ মালবিকার স্বরে কিঞ্চিৎ শ্লেষ।
‘অনেকটা আমার বাবার মতোই। উনি গানবাজনাটাই পছন্দ করেন না, অথচ মা করেন।’
‘তা হলে আপনি যে শিখছেন?’
‘বাবা জানে না। বাড়ির সামনেই আমাদের পুরনো প্রেসবাড়িটা। ওর তিনতলায় পিছন দিকে একটা ঘরে সময় পেলে বসি। আচ্ছা মাসিমা এবার আমি যাব।’
হেলমেট পরা একজন স্কুটারে বসে ফটক দিয়ে ঢোকার সময় তাদের তিনজনের দিকে তাকিয়ে গেল। বকুল হাঁফ ছাড়ল। তার মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে। ভটু নিশ্চয়ই কাউকে— না—কাউকে বলবে, দেখলুম ছোটোকাকিমা আর মালি মোটরে কোথা থেকে যেন ফিরল।
‘তুমি তো বাবা চা খাও না, নইলে বলতুম একটু বসে গিয়ে এককাপ চা খাওয়ার জন্য।’
‘আর একদিন এসে খেয়ে যাব মাসিমা।’
‘এটা কি ব্যবসাদারের কথা?’ মালবিকা ঠোঁট ছড়িয়ে দিল। তার মনে হয়েছে, অতি সাধারণ দর্শন এই যুবকটি রসিকতা যখন করতে পারে তখন নিতেও পারে।
