সুধাংশুর মনে হল, এখন এর বেশি স্ত্রীকে আর কিছু তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। টেকনোলজির গূঢ় কাজকর্মের ব্যাপারগুলো মোটরগাড়ির থেকে বাড়িতে বসে জানিয়ে দেওয়াই ভালো। অবশ্য তার আগে পিটিএস সুপারভাইজারের কাছ থেকে অনেক কিছু জেনে নিতে হবে।
‘আপনাদের প্রেসে কী কী ছাপা হয়?’ প্রশ্নটা এল মালবিকার কাছ থেকে। এতক্ষণ চুপ করে থাকার পর হঠাৎ তার এই কৌতূহলে একমাত্র অবাক হল বকুল।
গাড়ি তখন ফুলবাগান, কাঁকুড়গাছি ছাড়িয়ে উল্টোডাঙা মোড়ের কাছাকাছি। গাড়ি মন্থর করে, ট্র্যাফিক সামলাতে ব্যস্ত মিহির থেমে থেমে বলল, ‘অনেক কিছুই হয়। টেক্সট বই, গল্প, উপন্যাস, তার মলাট, ম্যাগাজিন, অফিসের ফর্ম, চালান, বিল, স্যুভেনির। আমাদের একটা বাইন্ডিং সেকশানও আছে।’
‘কে দেখাশুনো করেন?’ বকুলের প্রশ্ন।
‘আমিই মেইনলি তবে বাবাই সব দেখেন। পঁচাত্তর বয়স কিন্তু রোজ দু—ঘণ্টা এসে বসেন।’
‘ভাইবোন ক—টি?’ উমা জানতে চাইলেন।
‘দুই দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। ভাই নেই। ছোটোবোন আমেরিকায় পেনসিলভানিয়ায় ডক্টরেট করছে।’
‘আমেরিকা’ শব্দটা শুনেই গাড়িটা সমীহতায় তটস্থ হয়ে গেল। গাড়ি লেকটাউনে ঢুকল। মিহির বলল, ‘এখানকার রাস্তা কিন্তু আমি একদম চিনি না, পাতিপুকুর পর্যন্ত গাইড করতে হবে।’
‘নিশ্চয় নিশ্চয়, এই আর একটু এগিয়েই বাঁ দিকের রাস্তাটা।’ সুধাংশু নড়েচড়ে সোজা হলেন।
দু—তিনটি বাঁক ঘুরে সুধাংশুর নির্দেশমতো মিহির গাড়ি থামাল। গাড়ি থেকে নেমে সে পিছনের দরজা খুলে ধরে রইল। উমা নামলেন এবং তার পিছনে বকুলও।
‘এই আমাদের বাড়ি। ভেতরে এসো, এক কাপ চা অন্তত খেয়ে যাও।’ মিহিরকে বলে উমা বকুলের দিকেও তাকালেন।
‘না মাসিমা আজ থাক।’ মিহির নম্রভাবে জানাল। ‘বাড়িতে দিদি জামাইবাবুর আসার কথা, আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। আর একদিন এসে বরং চা খেয়ে যাব, বাড়ি তো চিনে গেলুম।’
‘মিহির ওই যে বাড়িটা দেখছ,’ সুধাংশু তার বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া প্রায়ান্ধকার সরু গলিটা লক্ষ করে আঙুল তুললেন। ‘ওই যে পর্দা দেওয়া জানলাটা, ওটাই সমীরণদের। ওখানেই ও থাকত, এখন থাকে ওর ভাইয়েরা, বাবা—মা তো অনেকদিনই গত হয়েছেন।’
সবাই গলিটার ভিতরে কিছুক্ষণ চোখ রাখল। এরপর উমা বললেন, ‘মিহিরের দেরি হয়ে যাবে, নয়তো বকুল আর মালবিকাকে বলতুম চা খেয়ে যেতে।’
বকুল সংকটে পড়ল। দ্রুত ভেবে নিল উমার সঙ্গে আলাপটাকে ঘনিষ্ঠ করে তোলা দরকার এবং চা খেতে খেতে সেই কাজটা মসৃণভাবে করা যায়। মালিকে সামনের দিকে ঠেলে নাম করিয়ে দেওয়ার জন্য উমা যদি অনুরোধ বা আবদার জানায় তা হলে সমীরণ কতটা তা রক্ষা করবে, সেটা সম্পর্কে কোনো দৃঢ় ধারণায় আপাতত সে আসতে পারেনি। তবে সমীরণের মাসিমার স্নেহের বোন হওয়ার জন্য অবশ্যই তাকে চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু সেই চেষ্টা এখন করতে গেলে গাড়িতে চড়ে বাড়ি ফেরার এই সুযোগটা তাকে তা হলে হারাতে হবে।
সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সে নিমেষেই সিদ্ধান্ত দিল, মেয়ের ভবিষ্যৎ অনেক গুরুত্বপূর্ণ গাড়ি চড়ার থেকে।
‘দিদির বাড়িতে প্রথমবার এসে বোন চা খাবে না তাই কি হয়?’ বকুল চেষ্টা করল গদগদ স্বর গলায় আনার।
‘মা।’ মোটরের ভিতর থেকে মালবিকার তীব্র স্বর বেরিয়ে এল। ‘বাবা ন—টায় ফিরবে। এখন সাড়ে আটটা।’
‘ওহহ দেখছ, একদমই ভুলে গিয়েছি। মালির বাবাকে ঘড়ি ধরে ন—টার সময় খেতে দিতে হয়। ডাক্তারের কড়া হুকুম, তারপর খাওয়াতে হয় ক্যাপসুল। না দিদি আজ থাক, আর একদিন এসে চা খেয়ে যাব।’
‘অসুখবিসুখ?’ উমা উদবেগ জানালেন, হঠাৎ পাওয়া বোনটিকে তাঁর মন্দ লাগেনি। মুখটি ভারি মিষ্টি, কথাবার্তাও তেমনি। কেমন যেন সরল আর ঘরোয়া ভাব পাচ্ছেন বুকলের মধ্যে।
‘মাথায় বহুদিন ধরেই একটা যন্ত্রণা হয়। মাঝে মাঝে সেটা বাড়ে। ডাক্তার অনেক দেখানো হয়েছে কিন্তু কেউই ঠিক করতে পারছে না।’ করুণ স্বরে বকুল বলল।
‘এক্স রে করানো হয়েছে?’ সুধাংশু জানতে চাইলেন।
‘হয়েছে, কিছু পাওয়া যায়নি।’
‘মা।’ এবার মালবিকার স্বরে চাপা বিরক্তি।
মিহির চুপ করে শুধু দেখে ও শুনে যাচ্ছিল। এবার কুণ্ঠিত স্বরে সে বলল, ‘আমার কিন্তু দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
‘ওহহ তাই তো! দেখেছ ভুলেই গেছি।’ বকুল ব্যস্ত হয়ে গাড়িতে উঠল। মিহির দরজা বন্ধ করে গাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে এল। আর তারই মধ্যে মালবিকা চাপাস্বরে তার মাকে বলল, ‘কী আজেবাজে কথা বলে গেলে? দরকার কী এসব বলার?’
মিহির গাড়িতে উঠেছে। বকুল মেয়েকে উত্তর না দিয়ে জানলা দিয়ে হাত বার করে নাড়ল।
‘এই রাস্তা দিয়ে গিয়ে বাঁ দিকের প্রথম রাস্তাটা ধরবে, তারপর সোজা গিয়ে যশোর রোড।’ সুধাংশু জানিয়ে দিলেন মিহিরকে। সে মাথা কাত করে গাড়িকে প্রথম গিয়ারে দিল।
পঞ্চাশ—ষাট মিটার যাবার পরই মিহির শুনতে পেল মা ক্ষুব্ধ স্বরে মেয়েকে বলছে, ‘দরকার আছে কি না তা তুই বুঝবি না।’
‘না বোঝার কী আছে?’
‘আছে, আগে তুই মা হ তারপর বুঝবি মায়ের কী জ্বালা আর অশান্তি।’
‘ডায়ালগ এখন থামাও তো। আমাকে নিয়ে তোমার কীসের অশান্তি হল শুনি? এখন চুপ করে থাকো।’
‘তোর বাবার মতো যদি—’, বকুলের কথা অর্ধ সমাপ্ত হয়ে গেল।
‘আচ্ছা মিহিরবাবু, আপনি কি ফাংশানে গান করেন?’
