‘ঠিকই বলেছেন দিদি, দাদা যদি কুঁড়ে হতেন তা হলে ছেলে কি ইঞ্জিনিয়ার হতে পারত?’
সুধাংশু এবং উমা উভয়েই প্রীত হলেন। এবং বকুলকে পালটা প্রীত করার জন্য উমা বললেন, ‘তুমিও বাপু কুঁড়ে নও। মেয়েকে গান শিখিয়ে বড়ো করার জন্য ঠিক ঠিক লোককে ধরার কাজে তো তুমি গাফিলতি করোনি। …এটা কিন্তু ভালোই। যাকে দিয়ে করিয়ে নিলে কাজ হবে, তুমি তাকে দিয়ে নিশ্চয় করিয়ে নেবে, চক্ষুলজ্জা করলে চলবে না।’
বকুল ঠিক করতে পারল না সে হাসবে না গম্ভীর হবে। তাকে কতটা ঠেস দেওয়া বা প্রশংসা করা হল এটা সে বুঝতে পারছে না। মাঝামাঝি পথ ধরে সে বলল, ‘আপনি ঠিক আমার শাশুড়ির মতোই কথা বলেন।’
‘বলবই তো! কত বয়সে উনি মারা যান?’
‘ছিয়াত্তর বছরে।’
‘আমার এখন পঞ্চান্ন। কত আর পার্থক্য, আমরা একই রকমের কথা তো বলবই!’
অবশেষে গাড়ি চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ থেকে বাঁ দিকে মহাত্মা গান্ধী রোডে মোড় নিল। খানিকটা স্বচ্ছন্দে গিয়ে আটকা পড়ল কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে।
‘উমা দ্যাখো, এই ডান দিকে ইউনিভার্সিটি, স্যানসক্রিট কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কফি হাউস, হিন্দু স্কুল, হেয়ার স্কুল, সব এই জায়গাটায়।’ সুধাংশু স্ত্রীকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহের দায়িত্বটা পালন করলেন। তাঁর ধারণা, কলকাতার কোথায় কী রয়েছে সেটা মেয়েদের জেনে রাখা দরকার। উমা ঝুঁকে জানলা দিয়ে তাকালেন ডান দিকে, আর পাঁচটা অপরিচ্ছন্ন, ভাঙাচোরা বড়ো রাস্তার মতো কলকাতার একটা ট্রাম রাস্তা দেখলেন মাত্র।
মিহির এখনও পর্যন্ত চুপচাপ, তার বন্ধুটিও। উমার মনে হল, যার গাড়িতে চেপে যাচ্ছি, ভদ্রতা বা কৃতজ্ঞতাবশতও তার সঙ্গে কিছু কথা বলা উচিত।
‘হ্যাঁ বাবা, তুমি কতদিন সমীরণের কাছে গান শিখছ?’
‘বছর চারেক।’ মিহির বলল।
আমহার্স্ট স্ট্রিটের মোড়ে পুলিশ হাত তুলে রয়েছে। শেয়ালদার দিকে যাবার রাস্তাটা খোলা। মোড়টা তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যাওয়া দরকার, তাই সে উমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘কতটা শিখেছ’—র উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারল না। রাস্তার দু—ধারের ফুটপাথে কাঁচা সবজি আনাজের বাজার বসেছে। উমার চোখ ইতিমধ্যে সেই দিকে নিবদ্ধ হল।
‘অল্প দিন শিখছি।’ সামনে দাঁড়ানো বাস—এর পিছনে গাড়ি থামিয়ে মিহির বলল। গোটা পনেরো ওল—এর একটা টিলার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকা উমার কানে বোধহয় কথাটা ঢোকেনি। বকুলেরও কিছু জানার কাছে তাই সে শুরু করল কথাবার্তা।
‘রোজ শিখতে যাও?’
‘হপ্তায় একদিন, রবিবার।’
‘কতক্ষণ শেখান?’
‘ঘণ্টাখানেক।’
‘কত করে দাও?’
‘মাসে দু—শো।’
বকুল চুপ করে রইল। মনে মনে দ্রুত একটা হিসাব করে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস চেপে সিটে হেলান দিল। মেয়েটার বোধহয় আর সমীরণ মিত্রর কাছে শেখা হল না। হঠাৎ তার মনে হল, উমা নামের তার পাশের এই প্রৌঢ়া যদি অনুরোধ করে তা হলে সমীরণ কি তা ফেলতে পারবে? অনেক ছাত্র—ছাত্রীর মধ্যে কেউ যদি অর্ধেক মাইনেতে শেখে তাতে সমীরণের মতো পয়সাওলার কিছু যাবে আসবে না।
কিন্তু সে পুরোপুরি হতাশও হচ্ছে না। সমীরণের চোখ দুটো যখন মালির মুখের দিকে তখন কি মুখটাই শুধু দেখছিল? আর ওর নজরের মধ্যে বার কয়েক যে—জিনিসটা ফুটে উঠছিল, মালির এই বয়সের বকুল বহু পুরুষের চোখে একদা তা দেখেছিল। বকুল সে—সব অগ্রাহ্য করেও শেষ পর্যন্ত দিলীপরঞ্জনের পুরোনো মরিস মাইনরের, বাকপটুতার আর গৌরকান্তির কাছে হার মেনেছিল।
গাড়ি শিয়ালদহ ফ্লাইওভারের দক্ষিণ দিকে এসে বাঁ দিকে ঘুরল। রেলব্রিজ পেরিয়ে এখন ঢুকেছে বেলেঘাটার ঘিঞ্জি রাস্তায়। গাড়িতে কথাবার্তা আর হচ্ছে না। বকুল বুঝতে পারছে না গাড়ির অন্যান্যরা মনে মনে এখন কী চিন্তা করছে? জুঁইয়ের মালা হাতে মেয়েটা ঠায় সামনের দিকে তাকিয়ে। কী ভাবছে সে জানে! সমীরণের চাহনির জবাবে ওর চোখ যে সংকেত পাঠাচ্ছিল বকুলের কাছে তার অর্থ খুবই স্বচ্ছ। আর সেইজন্যই সে অস্বস্তিতে পড়ে গেছে। তবে মালি বোকা মেয়ে নয়, শুধু এইটাই তার ভরসা।
মিহিরের বন্ধু নেমে গেল রাসমণির মোড়ে। সুধাংশু হাত—পা শিথিল করে বসার সুযোগ পেয়ে মিহিরের সঙ্গে আলাপ শুরু করলেন।
‘গাড়ি কতদিন চালাচ্ছেন?’
‘আপনি নয় তুমি বলুন।’
‘বেশ। কতদিন শিখেছ?’
‘বারো—তেরো বছর।’
‘খুবই অল্প বয়সেই। গাড়িটা তোমাদেরই।’
‘হ্যাঁ। বাবার।’
‘তোমার বাবা কী করেন?’ পিছন থেকে উমা বললেন।
‘আমাদের একটা প্রেস আছে। এন্টালিতে, বাড়ির কাছে। পঞ্চান্ন বছর আগে বাবাই শুরু করেন, খবু অল্প বয়সে, ছোট্ট একটা ঘরে। অসম্ভব পরিশ্রম করে প্রেসটাকে বড়ো করেন। সাতটা ভাষায় কম্পোজ আর ছাপার কাজ হত।’
‘এখন হয় না?’ আবার উমার প্রশ্ন।
‘হয় না কারণ সময় বদলেছে। একটু আগে আপনি বললেন, দিনকাল যেভাবে বদলেছে, টেকনোলজির ব্যাপারেও তাই। এত অবিশ্বাস্য উন্নতি ঘটে গেছে যে তার সঙ্গে তাল দিয়ে না চললে আপনি পিছিয়ে যাবেন। আমরাও পুরোনো মেশিনপত্র বিক্রি করে পিটিএস কিনেছি, চার কালারের অফসেট মেশিন কিনেছি।’
‘আমাদের অফিসেও পিটিএস—এ কম্পোজ হয়।’ সুধাংশু এই বলে পিছনে মাথা ঘুরিয়ে উমাকে তারপর জানালেন, ‘টাইপরাইটারের মতো ছোটো ছোটো মেশিন। আগে যেমন ময়লা কাপড়—চোপড় পরে লাইনো অপারেটররা কম্পোজ করত, পিটিএস—এ তা করতে হয় না। অনেক মেয়েও কাজ করে। একেবারে অফিসের টাইপিস্টের মতো কাজ। তবে ঘরটাকে ভীষণ ঠান্ডা রাখতে হয়, কম্পিউটার আছে তো।’
