মালবিকার ভালো লাগল না এটা অর্থাৎ তাদের দু—জনকে অগ্রাহ্য করে উমার দিকে অনুমতি চাওয়ার মতো করে তাকানোটা। এর আগেও সমীরণ যখন বলল, ‘মিহির, ইনি আমার মাসিমা?’ তখনও তারা দুজন উপেক্ষিত হয়। তখন সে রাগেনি, দুঃখও পায়নি। শুধু একটা অকারণ অভিমান বুকের মধ্যে ফেঁপে উঠেছিল। বাড়িতেও বাইরের কেউ এলে বলা হয়, ‘আমার সেজোজায়ের মেয়ে’। ব্যস, নামটুকু পর্যন্ত নয়।
মালবিকা আন্দাজ করতে পারে কেন তারা যথেষ্ট মনোযোগ লোকেদের কাছ থেকে পায় না। সব জায়গাতেই তাদের ভূমিকাটা থাকে অনুগ্রহপ্রার্থীর। মায়ের বাপের বাড়ির তরফে বংশগৌরব নেই, পরিচয় দেবার মতো মান্যগণ্য, ধনী কোনো আত্মীয় নেই। মা বা সে নিজে লেখাপড়া করেনি।
তার বাবা দিলীপরঞ্জন রেলের কেরানি এবং সবাই তাকে দুশ্চরিত্র বলেই জানে।
একটা মিষ্টি সুশ্রী মুখ আর ধারালো দেহ ছাড়া সে জানে তার আর কোনো সম্পদ নেই। সে আরও জানে, এই সম্পদ ভাঙিয়েই তাকে জীবন গুছিয়ে নিতে হবে। তার গলায় সুর আছে কী নেই, বড়ো গাইয়ে হবে কী হবে না, সে—সব পরের কথা, এখন তাকে সমীরণ মিত্রর গানের স্পেশাল ক্লাসে জায়গা করে নিতেই হবে। গান এবং সমীরণের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই বন্ধ গলি থেকে রাজপথে যাওয়ার।
মিহির তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে উমা ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘কোনো অসুবিধে হবে না বাবা, আমাদের এখন কোনো তাড়া নেই। কী গো বকুল, তোমার কী তাড়া আছে?’
‘না দিদি। যখন হোক পৌঁছলেই হল।’ বকুল শুধু খুশিই নয় তৃপ্তও।
কতদিন পর যে সে মোটরগাড়িতে চড়ল। বাড়িতে বড়োভাসুরের মোটর আছে, মেজোভাসুরের ছেলের স্কুটার আছে। আজ কুড়ি বছর প্রায় বিয়ে হয়েছে কিন্তু বড়োভাসুরের গাড়িতে দু—তিনবার ছাড়া তার চড়া হয়নি। মোটরে চড়ার দুর্নিবার আকর্ষণটা বকুলের ছোটোবেলা থেকেই। দিলীপরঞ্জনের একটা মরিস মাইনর ছিল। চার হাত ফেরতা ছোট্ট গাড়ি। রংচটা, জানলার কাচ ওঠে না, সিটের স্প্রিং বসে যাওয়া গাড়িটাতেই বকুল বিয়ের আগে দিলীপরঞ্জনের সঙ্গে ঘুরেছে। যতই পুরোনো ঝরঝরে হোক মোটরগাড়ি তো বটে! চড়লেই নিজেকে রাস্তার লোকেদের থেকে যথেষ্ট আলাদা বোধ হয়। কিন্তু বিয়ের মাস কয়েক পরই গাড়িটা আর রইল না। ঘুষ নিতে গিয়ে দিলীপরঞ্জন ধরা পড়ল, গাড়িটা সে তখনই বিক্রি করে দেয়।
‘শ্বশুরবাড়িতে কে কে আছেন?’ উমা তাঁর কৌতূহল মেটাবার কাজ শুরু করলেন।
‘শ্বশুর—শাশুড়ি নেই, তা ছাড়া সবাই আছেন। খুবই বনেদি, বড়ো পরিবার।’ বকুলের উত্তরের মধ্যে ঝোঁকটা পড়ল ‘বড়ো পরিবার’ শব্দ দুটোয়।
‘আলাদা হাঁড়ি?’
‘হ্যাঁ। শাশুড়িই আলাদা করে দিয়ে গেছেন।’
‘ভায়ে ভায়ে সদভাব নেই বুঝি?’
‘না না, ঠিক তা নয়। খুব বুদ্ধিমতী ছিলেন তো! বলতেন, যতদিন আমি আছি ততদিন সদ্ভাব থাকবে, এক হেঁসেলে চলবে কিন্তু আমার মরার পর কে কীরকম হয়ে যাবে তা তো জানি না, দিনকাল তো আর একরকম থাকে না।’
‘ভালোই বলেছেন। দিনকাল যে কীভাবে বদলেছে, কত রকমের কাণ্ড যে চারদিকে ঘটছে। চোর ডাকাত খুনিতে দেশটা ভরে যাচ্ছে। হুট হুট করে কত বড়োলোক এখন গজাচ্ছে আর গরিবরা আরও গরিব হচ্ছে।’
উমার কথাটা শুনে সামনের সিটে সুধাংশু হর্ষ এবং আশ্বস্ত বোধ করলেন। একটু—আধটু রাজনীতির হালচাল মেয়েদের জানা থাকা ভালো। খবরের কাগজের হেডলাইন পড়ে শোনানোটা যে বৃথা যায়নি সেটা বুঝতে পারছেন।
মেট্রো রেলের জন্য মহাজাতি সদনের সামনের চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের মাঝখানটা খোঁড়া রয়েছে প্রায় দশ বছর। দু—পাশের সরু পথ ধরে বাস ট্রাক মোটর চলাচল করে। সেই পথের দুর্দশা বর্ণনার অযোগ্য। এর উপর রয়েছে ট্র্যাফিক জ্যাম। মিহিরের মোটর এখন জ্যামে পড়েছে। একহাত—দু—হাত করে গাড়ি এগোচ্ছে মহাত্মা গান্ধী রোড মোড়ের দিকে।
‘এই যে দু—পাশের বাড়ি দেখছ,’ সুধাংশু তাঁর স্ত্রীর কথারই জের টেনে বললেন, ‘এগুলো সব মারোয়াড়িরা কিনে নিয়েছে। একটাও আর বাঙালির নেই, বিক্রি করে দিয়ে কলকাতার আশেপাশে চলে গেছে।’
‘একটাও নেই বোলো না, তোমার জটুদারা তো থাকে বিডন স্ট্রিটের মোড়ে।’
‘ওই দু—তিনটে বাড়ি পাবে। ব্ল্যাকমানির জোরে এমন লোভ দেখায় যে পড়তি অবস্থার বাঙালিরা আর লোভ সামলাতে পারে না। আসলে বাপ—ঠাকুর্দার জমানো টাকা পায়ের উপর পা তুলে খেয়ে খেয়ে এমন একটা কুঁড়েমির অভ্যাসে—’
‘এটা কিন্তু ঠিক কথা নয় মেসোমশাই।’
বকুল ঝাঁকুনি খেয়ে সোজা হয়ে মেয়ের ঊরুতে একটি রামচিমটি কাটল। সেটা অগ্রাহ্য করে মালবিকা বলল, ‘সব বাঙালিই কুঁড়ে নয়। ব্যবসা করে সবাই বড়োলোক হতে চাইলে গানটা তা হলে গাইবে কে? সমীরণ মিত্র নিশ্চয়ই কুঁড়ে নন। খেটেছেন বলেই আজ এমন উঁচু জায়গায় পৌঁছেছেন। কলকাতার ক—টা মারোয়াড়ির অটোগ্রাফ নিতে মানুষ ভিড় করে?’
মিহির সন্তর্পণে মুখ ফিরিয়ে মালবিকার মুখটা একবার দেখার চেষ্টা করল আর উমা দ্বিগুণ উৎসাহে বলে উঠলেন, ‘বাঙালি যদি কুঁড়েই হত, তোমার কথাই ধরো না, অত খেটে কি বাড়িটা করতে পারতে? ছেলেকে নিয়ে যে রোজ পড়াতে বসতে, কুঁড়ে হলে কি বসতে? মালবিকা ঠিকই বলেছে।’
সুধাংশু নীরব রইলেন এবং এই নীরবতা অনুধাবন করে বকুল বুঝে নিল ভদ্রলোককে নয় তার স্ত্রীকেই পাত্তা দিতে হবে। সমীরণ মিত্র একে প্রণাম করে, মাসিমা বলে!
