সমীরণ হাতঘড়ি দেখল। একটি লোককে, বোধহয় ড্রাইভারকে বলল, ‘গাড়িটা এনে গেটের কাছে রাখুন।’
‘তোমার কি তাড়া আছে, কোথাও যাবে?’ উমা বললেন।
‘হাওড়ায় যাব।’
‘সমীরণ তো এখন দিনে দু—তিনটে ফাংশান করে।’
সুধাংশু এতক্ষণ কথা বলার একটা উপলক্ষ খুঁজে বার করলেন।
‘না মেসোমশাই, বন্ধুর ছেলের অন্নপ্রাশনের নেমন্তন্নে যেতে হবে। আর দিনে দু—তিনটে ফাংশান কোনোকালেই আমি করিনি।’
‘কিন্তু আমি যেন শুনেছিলাম—’ অপ্রতিভ সুধাংশু থেমে গেলেন।
‘তোমার ছেলে কত বড়োটি হল? বউমা কেমন আছে, গানটান করে?’
‘ছেলে এখন ক্লাস সিক্সে পড়ছে, ক্যালকাটা বয়েজে। আর শিঞ্জিনী মাঝে মধ্যে তানপুরা নিয়ে বসে বটে তবে সে কিছু নয়। এখন গানের স্কুলটা দেখাশোনাতেই ব্যস্ত থাকে।’
‘দিদি—’
‘বলছি, বলছি। যাব যাব করেও আর যাওয়া হয়ে ওঠে না, সমীরণ এবার তোমার বাড়িতে একদিন যাব।’
‘গেলে তাড়াতাড়ি আসুন। পার্ক সার্কাসে একটা ফ্ল্যাট পাওয়ার কথা হচ্ছে। পেলে স্কুলটা মানিকতলায় রেখে পার্ক সার্কাসে আমরা গিয়ে থাকব। কালোয়ারপটিতে থাকতে আর ভালো লাগছে না।’
‘স্কুল না হয় রয়ে গেল কিন্তু তুমি যে স্পেশাল করে শেখাও তার কী হবে?’
সমীরণ একটু অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি জানেন দেখছি! তেমন বুঝলে স্পেশাল ক্লাস পার্ক সার্কাসেই তখন করব।’
‘তোমাকে এই মেয়েটিকে স্পেশালে শেখাতে হবে। খুব ভালো গায়। তোমার কাছে ছাড়া কারুর কাছে শিখবে না, মেয়ের একেবারে ধনুক ভাঙা পণ! তুমি কিন্তু না বলতে পারবে না। তোমাকে বলার জন্য ওর মা, এই যে ইনি আমার বোনের মতো, আমাকে খুব ধরেছে।’
উমা এইরকমই। কিছুক্ষণ আগে মাত্র আলাপ, একদমই জানেন না মেয়েটির গলায় গান না মেশিনগান কোনটা রয়েছে অথচ তদবির শুরু করলেন এমনভাবে যেন নিজের মেয়ের জন্য বলছেন।
সমীরণ মিটমিট চোখে মালবিকার দিকে তাকাল। কী যেন সে মুখটায় দেখল। ধীরে ধীরে মৃদু স্বরে বলল, ‘কিন্তু মাসিমা, আলাদা করে যাদের শেখাই আগে তাদের গান শুনি, নিষ্ঠা আছে কি না দেখি। আমি যে পরিশ্রম করব সেটা যে বেনাবনে মুক্তো ছড়ানো হবে না সেটা তো আগে আমায় বুঝে নিতে হবে। এরকম ঘটেছে, ভস্মে ঘি ঢেলেছি।… তোমার নাম কী?’
মালবিকার গলা দিয়ে স্বর বেরোতে চাইল না। ঢোঁক গিলে কোনোরকমে বলল, ‘মালবিকা দত্ত।’
‘বাহ, বেশ নাম। থাকো কোথায়?’
‘রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটে, গৌরীবাড়ির কাছে।’
‘তা হলে তো খুব কাছেই। কারুর কাছে গান শেখো?’
‘একজনের কাছে বাড়িতে কিছুদিন শিখেছিলুম। কয়েকটা ভজন আর রবীন্দ্রসংগীত।’ কুণ্ঠিত স্বরে মালবিকা বলল।
উমা মনের জোর পেয়ে গেছেন। এত জিজ্ঞেস করছে যখন তা হলে স্পেশালে মেয়েটাকে নেবেই। ‘কবে যাবে গান শোনাতে?’
সমীরণ যাকে গেটের কাছে গাড়ি আনতে বলেছিল, সেই ধুতিপরা প্রৌঢ় লোকটি এসে বলল, ‘গাড়ি এনেছি, গেটের সামনেই আছে।’
‘গাড়িতে থাকুন, আমি যাচ্ছি।’ সমীরণ এবার উমার দিকে ফিরে বলল, ‘আপনারা কি নাটকটা দেখবেন না বাড়ি যাবেন? যান তো তা হলে—’ সমীরণ একটু তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি যুবকের দিকে তাকাল। ‘তা হলে গাড়ির ব্যবস্থা হতে পারে।’
‘মালি কবে কখন যাবে?’ বকুল তার উৎকণ্ঠা চেপে রাখতে পারল না। ব্যাপারটা সে আধপাকা করে রাখার পক্ষে নয়।
‘ডাকনাম বুঝি মালি?… আসুন তিন—চারটে দিন বাদ দিয়ে। কাল জামশেদপুর যাব। সকাল দশটা—এগারোটা নাগাদ আসুন, আমার ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হয়।… মাসিমা?’
‘আর নাটক দেখে কী হবে বলো?’ উমা প্রশ্নটাকে সিদ্ধান্তের আদলে বকুলের দিকে পাঠাল।
‘ও আর দেখার কী আছে।’ বকুল সঙ্গে সঙ্গে সমর্থন জানিয়ে দিল।
‘মিহির।’ সমীরণ দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটিকে ডাকল। দ্রুতপায়ে প্রায় কৃতার্থের মতো সে সমীরণের কাছে এল।
‘আমার ছাত্র মিহির, মিহিরচাঁদ শীল। ওর গাড়ি আছে, ও আপনাদের পৌঁছে দেবে। মিহির, ইনি আমার মাসিমা। এঁদের সবাইকে বাড়ি পৌঁছে দাও।’ প্রায় হুকুমের সুরেই সমীরণ নির্দেশ দিল। মিহির অনুগৃহীতের মতো মাথা নেড়ে গেল।
‘তোমার কোনো অসুবিধে হবে না তো?’ নিছকই ভদ্রতাসূচক একটা অপ্রয়োজনীয় কথা বলল সমীরণ।
‘না না, একদমই না।’ মিহির শশব্যস্তে উত্তর দিল।
সমীরণ দরজার দিকে এগোল। ‘আপনারা একটু দাঁড়ান আমি আসছি।’ বলে মিহির পিছু নিল সমীরণের। ঘরে এখন নাটকের লোকদের ভিড়। পোশাক, মেকআপ ইত্যাদির ব্যস্ততার মধ্যে ওরা চারজন দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে।
‘তোমার নামটি তো এখনও জানলুম না।’ উমা জিজ্ঞাসা করলেন বকুলকে।
‘বকুল দত্ত।’
‘ছেলেমেয়ে ক—টি?’
‘এই মালিই, আর হয়নি।’
‘হয়নি না হওয়াওনি।’ উমা মুখ টিপে হেসে বললেন, ‘আমারও এক ছেলে, ইঞ্জিনিয়ার। এই তিন মাস হল বিয়ে হয়েছে। আগে থেকে ওদের ভাবসাব ছিল। উনি খবরের কাগজে চিফ সাব—এডিটার’—মিহিরকে দেখে তিনি থেমে গেলেন।
‘সমীরণদাকে তুলে দিয়ে এলুম। আসুন আপনারা।’
মাখন রঙের অ্যাম্বাসাডর গাড়ি। মিহিরের সঙ্গে তার এক বন্ধু রয়েছে। পিছনের সিটে মেয়েরা তিনজন, সামনের সিটে চালক মিহির ছাড়া তার বন্ধুটি ও সুধাংশু।
‘আমার বন্ধু বেলেঘাটা যাবে, ওকে যদি আগে নামিয়ে দি তা হলে কি আপনাদের অসুবিধে হবে?’ মার্জিত, নম্র বাকভঙ্গি, গলার স্বর সরু। ঘাড় ফিরিয়ে মিহির তাকাল পিছনে, আসলে তাকাল উমার দিকে।
