দ্রুত চিন্তা করে নিয়ে বকুল বলে, ‘খুব নাম ওনার, খুব ভালো গান। আমার মেয়ের খুব ইচ্ছে ওঁর কাছে গান শেখার।’
‘শিখুক না।’ যেন একটা ছাড়পত্র দিলেন উমা এমন ভঙ্গিতে বলেন।
‘শুনেছি খুব খুঁতখুঁতে, যাকে মনে করবেন কিছু হবে শুধু তাকে ছাড়া আর নাকি কাউকে শেখাতে চান না।’
‘ওর স্কুলে অত ছেলেমেয়ে সবাই কি সন্ধ্যা মুখুজ্জে না লতা মঙ্গেশকর হবে?’
‘না না স্কুলে নয়, পার্সোনালি আলাদা করেও উনি শেখান।’
‘তাই নাকি!’
‘আপনি একটু ওঁকে বলবেন দিদি?’ ঝুঁকে উমার হাত চেপে ধরে বকুল।
‘আপনার মেয়ে কেমন গায় তা না জেনে কী করে বলব?’ উমা হঠাৎ সাবধানী হয়ে যান।
‘সে তো নিশ্চয়। তবে একবার পরীক্ষা করে যদি দেখেন…দিদি আপনি একটু ওঁকে বলুন না।’ বকুল মিনতি করে হাতটা উমার হাঁটুতে ছোঁয়ায়।
‘আচ্ছা বলব, তবে কথা রাখবে কি না জানি না। খুব বড়ো হয়ে গেছে তো!’
সমীরণের অষ্টম গানটি শেষ হতেই সুধাংশু ওদের নিয়ে আসেন গ্রিনরুমে। কিছু লোক ঘিরে রয়েছে তাকে। সমীরণ কাকে যেন বলছিল তার নিজস্ব সঙ্গতকারদের গাড়ির ব্যবস্থা করে দেবার জন্য। একজন জুঁই ফুলের গোড়ে তার হাতে তুলে দিয়ে প্রণাম করল। চার রকমের বৃহদাকার মিষ্টির প্লেট নিয়ে দাঁড়ানো লোকটি অনুনয় করল, ‘অন্তত একটা’, সমীরণ তাকে হাত দিয়ে সরিয়ে, ‘একটাও নয় ভাই। চল্লিশে পা দিয়েছি, মিষ্টি খাওয়া বনধ।’ এই বলেই সে উমা ও সুধাংশুকে দেখতে পেল।
‘আরে মাসিমা!…মেসোমশাই।’ সমীরণ এগিয়ে এসে প্রণাম করল। উমা গর্বে আপ্লুত হয়ে পিছনে দাঁড়ানো বকুলের দিকে মুখ ফেরালেন, মুখের ভাবখানা, দেখলে তো! বকুল বিশ্বাস করল, এই মহিলার অনুরোধ সমীরণ ফেলতে পারবে না।
‘তোমার গান শুনতে এসেছি।’ উমা বললেন।
‘তা হলে এই মিষ্টিগুলো আপনার। এতক্ষণ কান তেতো করেছেন এবার মুখটা মিষ্টি করে নিয়ে বলুন কেমন লাগল।’ সমীরণ লঘুস্বরে কথাগুলো বলে প্লেটটা লোকটির হাত থেকে নিয়ে উমার সামনে ধরল।
‘তোমার গানের সুখ্যাতির জন্য আমার জিভ মিষ্টি করার দরকার হয় না।’ উমা প্লেটটা নিয়ে বকুলের দিকে এগিয়ে ধরে বললেন, ‘নাও, তুলে নাও।’ নিজেও একটা তুলে নিলেন।
বকুল একটা সন্দেশ তুলে নিল বিনা বাক্যব্যয়ে। উমার খুশির সঙ্গে তাল রাখতে সে এখন বদ্ধপরিকর। উমা প্লেটটা ধরলেন মালবিকার সামনে। সে একটা রসে ভেজা চিত্রকূট তুলে নিল। সুধাংশুও বাদ পড়লেন না।
মালবিকা একদৃষ্টে সমীরণের মুখের দিকে তাকিয়ে। লোকটার মধ্যে কীরকম যেন এক সম্মোহন ক্ষমতা রয়েছে যে—জন্য তার উনিশ বছরের হৃৎপিণ্ডটার স্পন্দন হঠাৎই বেড়ে গেল! মাঝারি উচ্চচতা, মাঝারি গড়ন। ফুলহাতা গরদের পাঞ্জাবির আড়ালে একটা বলিষ্ঠ শরীরের আভাস। সমীরণের গায়ের রং মালবিকাকে তাদের বাড়ির পুরনো মেহগনি কাঠের টেবলটাকে মনে পড়াল। টেবলটার পালিশ উঠে গেছে কিন্তু এই লোকটার মুখের চামড়ায় যেন ঘাম তেল মাখানো।
এত কালোর উপর এত সুন্দর মুখ সে কখনো দেখেনি। কপালটা সামান্য চওড়া, মাথাটা ছোটো কিন্তু অবিন্যস্ত চুল দিয়ে সেটা মানানসই করে নেওয়া, তাতে জুলফি নেই। লম্বাটে ডিমের মতো মুখের আকৃতি, লম্বা কান, পাতলা ঈষৎ গোলাপি ঠোঁট, ঠোঁটের উপরে ডান নাকের নীচে একটা তিল, বাঁকা ভুরু দুটি যেন পেনসিল দিয়ে আঁকা। আর চোখ!
সমীরণের চোখ দুটোই মালবিকাকে সম্মোহিত করেছে।
মণি দুটো ঈষৎ পিঙ্গল এবং সাদা অংশের থেকে বেশি জায়গা নিয়েছে। বুলবুলির মতো মণি দুটো ছটফট করে যাচ্ছে সারাক্ষণ। কথা বলতে বলতেই ঘরের এদিক—ওদিক তাকাচ্ছে, চাহনিতে মজা পাওয়া বাচ্চচাদের মতো চঞ্চলতা। উমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সমীরণ দু—তিনবার মালবিকার দিকে তাকাল। চাহনিটা হালকা বাতাসের মতো কপাল থেকে নেমে বুকের উপর কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়েই ঝরে পড়ল। শিরশির করে উঠল মালবিকার সারা দেহ।
প্রতিবারই কেঁপে উঠল তার বুক। চুন্নিটা বুকের উপর থেকে সামান্য সরে রয়েছে সেটা বিছিয়ে দেবার জন্য সে কোনো চেষ্টা করল না।
‘এ কী তুমি খাচ্ছ না যে! আমার মতো মিষ্টি খাওয়া ছেড়েছ নাকি?’ সমীরণ কথাটা বলে হাসল। সরলভাবে মাড়িতে বসানো ঝকঝকে দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল আর গালের পেশি কুঞ্চিত হয়ে ভাঁজ ফেলল। চোখের মতো মুখটাও নড়াচড়া করে।
বকুল চাপা কঠিন স্বরে বলল, ‘খেয়ে নে।’
‘না।’ মায়ের নির্দেশ অমান্য করে মালবিকা জেদি গলায় বেপরোয়ার মতো বলল, ‘আমিও মিষ্টি ছেড়ে দিয়েছি।’
‘এত কম বয়সেই! কবে ছেড়েছ?’
‘এই মাত্র।’
সমীরণ কিছু একটা বলতে গিয়ে থমকে অবাক চোখে তাকাল। চিত্রকূটটা প্লেটে রেখে দিল মালবিকা।
‘তা হলে অভিনন্দন। এই নাও।’ জুঁই ফুলের গোড়েটা সে এগিয়ে দিল। গোড়েটা নেবার সময় সমীরণের আঙুল সে মুহূর্তের জন্য ইচ্ছে করেই স্পর্শ করল। ভ্রূ তুলে সমীরণ তাকাতেই মালবিকার গৌরবর্ণ মুখটা গরম হয়ে উঠল, চোখ আনত হয়ে এল। মালাটা আলতো করে বুকে চেপে ধরল।
বকুলের চোখে কিছুই এড়ায়নি। তার শুধু মনে হল, কথাটা পাড়ার জন্য এখনই মোক্ষম সময়।
‘দিদি, বলুন না কেন এসেছি।’
উমা এতক্ষণ মুখে হাসি ফুটিয়ে মালবিকা আর সমীরণের কথা শুনে যাচ্ছিলেন। প্লেটটা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা সুধাংশুর হাতে তিনি ধরিয়ে দিলেন, ‘এটা শেষ করো।’
