মালবিকা বড়ো হয়ে ওঠে এমনই পরিবেশে যেখানে বাবা মাঝেমধ্যে রাতে বাড়ি ফেরে না, মাঝেমধ্যে মাতাল হয়ে ফেরে, বাবার হাতে মা মার খায়। বাড়ির অন্যান্য অংশে বসবাসকারী জ্যাঠা, কাকা, তাদের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা তাকে এবং তার মাকে ঠারেঠোরে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, হেয়জ্ঞান করে এটা সে বাল্য থেকেই দেখে এসেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে ভর করে জীবন সম্পর্কে একটা অনিশ্চিত বোধ, আশ্রয়চ্যুত হবার ভয়, নিরাপদ স্থিতি পাওয়ার ব্যাকুলতা এবং নিছকই জৈব অস্তিত্ব রক্ষার জন্য দরদভরা অবলম্বন খোঁজার চেষ্টা আর এইগুলো থেকেই তার মধ্যে গড়ে উঠেছে ফলাফলের পরোয়া না করা, বাস্তববোধ বর্জিত, অন্ধ আবেগে ভরা এমন এক মানসিকতা যার সঙ্গে তার মা বকুলের বহু জায়গায় মিল রয়েছে। যেমন মিল আছে দু—জনের প্রায় একই ধরনের পারিবারিক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে বড়ো হয়ে ওঠার। মায়ের থেকে স্কুলে দুই ক্লাস বেশি পড়ে মেয়ে পড়া ছেড়েছে।
মালবিকা তার মাকে পছন্দ করে না এবং অবহেলাও করে না, একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া নিয়ে সে ভালোবাসে বকুলকে। তবে বাবাকে সে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এমনকী বাবার মতো গৌরবর্ণ, লম্বা চেহারার পুরুষদের দেখলে তার ভিতরটা কুঁকড়ে শক্ত হয়ে যায়। সে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে থাকে যতক্ষণ না লোকটি চোখের সামনে থেকে সরে যায়।
হয়তো এই প্রতিক্রিয়া থেকেই সে আকৃষ্ট হয় সমীরণ মিত্রের প্রতি।
বকুল বুঝে গেছল লেখাপড়া মালবিকার দ্বারা হবে না। কিন্তু সে লক্ষ করেছে মালবিকার গানের গলাটি খুব সুন্দর। সুরেলা এবং মধুর। লতা মঙ্গেশকর বা আশা ভোঁসলের গাওয়া ফিল্মের গানগুলো হুবহু অবলীলায় গেয়ে দেয়। সে স্থির করে মেয়ে যেন তার মতো একটা অকেজো, রান্না—খাওয়া—ঘুমসর্বস্ব গৃহপালিত জন্তু না হয়ে ওঠে। জীবনে তার যা—সব আকাঙ্ক্ষা ছিল—একটা মোটরগাড়ি, খরচ করার জন্য হাতে প্রচুর টাকা, নিজস্ব একটা বাড়ি, তাতে সাজানো ঘর, রোমান্টিক অনুগত স্বামী এবং স্বাধীনতা, এসব তার কাছে স্বপ্নই রয়ে গেল। কিন্তু মেয়ের ভাগ্যে যেন স্বপ্নটা সম্ভব হয়, যেন বিরাট গায়িকা হয়ে প্রচুর বিত্ত অর্জন করতে পারে এই আশা সে মনে লালন করতে থাকে। সে জানে, শুয়ে বসে শুধুই আকাশকুসুম দেখলে, যেটা সে নিজে করেছে, কোনোদিনই সেই কুসুম পৃথিবীর মাটিতে ফুটিয়ে তোলা যাবে না।
মেয়েকে গান শেখাবার জন্য উদ্যোগী হল বকুল। সেজোজায়ের মেয়েকে গান শেখাতে আসত এক মহিলা, বকুল তাকেই মালবিকার শিক্ষিকা রাখল। মাস দুয়েক পর সে বুঝল এই মহিলা বারো বছরের মেয়েকে গান শেখাতে পারবেন, উনিশ বছরের মেয়েকে নয়। এই সময়ই একদিন বকুলের আলাপ হল উমা ও সুধাংশুর সঙ্গে।
কাগজের সিনেমা—নাটক বিভাগের সম্পাদকের সঙ্গে সুধাংশুর হৃদ্যতা আছে। ম্যাজিক, নাচ, যাত্রা, অফিসের নাটক, জলসা ইত্যাদির কার্ড প্রায়শই সে চেয়ে নেয়, অনুষ্ঠান দেখে দু—চার প্যারাগ্রাফ লিখে দেবার বিনিময়ে। মহাজাতি সদনে একটা ব্যাঙ্ক রিক্রিয়েশন ক্লাবের নাচ—গান ও নাটক অনুষ্ঠানের দু—খানা কার্ড সুধাংশু চেয়ে নিয়েছিলেন একটি কারণেই, সমীরণ মিত্র গান গাইবে।
বৈঠকি চালে টপ্পা, খেয়াল ঢঙের পুরাতনী আর থিয়েটারের গান গেয়ে সমীরণ আসরের পর আসর মাত করে এখন জনপ্রিয়তম গায়কদের একজন। ইতিমধ্যেই তার বারোখানা গানের ক্যাসেট বাজারে বিকোচ্ছে। শুধু কলকাতায়ই নয় গৌহাটি, পাটনা, কটক তো বটেই দিল্লি বোম্বাই বাঙ্গালোর থেকে বাঙালি সমাজের ডাক তার কাছে আসে। আমেরিকার নিউ জার্সির বাঙালিদের আমন্ত্রণও এসেছিল কিন্তু সেই সময় জন্ডিস হওয়ায় যেতে পারেনি। কিন্তু সমীরণ মিত্রর সংগীত—ভক্ত হিসাবে সুধাংশু বা উমা এই অনুষ্ঠানে আসেননি। সমীরণ তাঁদের পাড়ার ছেলে।
তাঁদের তিনখানা বাড়ির পরই থাকত সমীরণরা। ভাড়া দু—খানা ঘরে আটজন লোক। ওর বাবা ছিল আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে কম্পাউন্ডার। সমীরণকে তার কৈশোর থেকেই তাঁরা চিনতেন। একটু বাউন্ডুলে স্বভাবের, লেখাপড়ায় কলেজ পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিল বাবার জুতোপেটার জোরে, ছোটো বয়সেই ভালো তবলা বাজাত আর জোড়াসাঁকোয় তখনই কোনো এক ওস্তাদের কাছে তালিম নিতে শুরু করেছিল। তাঁদের বাড়িতেও সে আসত, উমাকে ডাকত মাসিমা বলে। ক্রমশ নামডাকের সঙ্গে এল প্রচুর অর্থ এবং ব্যস্ততা। সমীরণ বিয়ে করল তারই ছাত্রী শিঞ্জিনীকে এবং মানিকতলার কাছে বাড়িভাড়া নিয়ে পাতিপুকুর ছেড়ে চলে যাবার পর যোগাযোগটা এখন ক্ষীণ হয়ে গেছে।
সমীরণ সেদিন গাইল আটখানা গান, প্রতি গান পাঁচ মিনিটের। তৃতীয় গানটি যখন গাইছে উমা তখন চাপা গলায় স্বামীকে বলেন, ‘যে ক্যাসেটটা আমাদের দিয়েছিল তাতে এই গানটা আছে।’ সুধাংশু তখন বলেন, ‘ওর আগমনী গানের একটা ক্যাসেট আছে, সুন্দর নাকি গেয়েছে, ভাবছি টেলিফোন করে একটা চাইব।’
ওঁদের এই কথোপকথন উমার পাশের আসনে বসা বকুল শুনেছিল। তার পাশে ছিল মালবিকা। সমীরণের তৃতীয় গানটি শেষ হতেই সে উমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বিনীত স্বরে বলে, ‘ওঁকে কী আপনি চেনেন?’
‘কাকে, সমীরণকে? ওকে তো ছোটোবেলা থেকেই চিনি। আমাদের প্রতিবেশী ছিল।’ উমা চাপা গর্বে কিঞ্চিৎ ফেঁপে উঠে অতঃপর বলেন, ‘আমাকে মাসিমা বলে।’
