শীলা দালানে রুটি সেঁকছিল। অনন্ত খালিগায়ে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে। তার পাশে থালায় গরম রুটি আর বেগুনভাজা।
‘সেদিন ওপরে গেছলুম, বড়োগিন্নি এ—কথা সে—কথার পর বলল, এবার কিছু বাড়াও, অনেকদিন ধরেই সত্তর রয়েছে…গোটা একতলা, এখন এর ভাড়া কম করে আড়াইশো, সেলামিও হাজার চারেক হবে। অনন্ত তো রোজগার করছে…’
‘ভাড়া বাড়াও বললেই যেন বাড়াতে হবে। আমাদের আহিরিটোলার বাড়িতে তিনখানা ঘর, ছাদ, আলাদা কল—পায়খানা নিয়ে রয়েছে, ভাড়া দেয় কত জানো? উনচল্লিশ টাকা বারোআনা। রেন্ট কন্ট্রোলে এই মাসেই সাধনবাবু ভাড়া বাড়ানোর জন্য মামলা তুলবেন। এন্টালির বাড়িতে এক—একটা ফ্ল্যাট, কেউ দেয় পঁয়তাল্লিশ, কেউ দেয় পঞ্চান্ন, সব পঞ্চাশ—ষাট বছরের ভাড়াটে।…উঠে যাক, এখুনি ছ—শো টাকার ভাড়া হয়ে যাবে। এদের বলে দিয়ো একআধলাও বাড়াব না।’
অনন্ত ক্রমশই হিসেবি হয়েছে, সেই সঙ্গে প্রখর হয়েছে বাস্তববুদ্ধি। সে এখন থেকেই ভাবতে শুরু করেছে অনুর বিয়ের কথা। অনু বড়ো হয়েছে। ওর শরীরের দিকে আগের মতো আর অসংকোচে তাকানো যায় না।
কয়েকদিন ধরেই তার চোখে পড়ছে উঠতি বয়সি কিছু ছেলে, তাদের জানলার উলটোদিকে উৎপলদের রকে বসে একটু বেশি জোরে কথা বলছে, নিজেদের পরাক্রম সম্পর্কে জোরালো দাবি রাখছে, ঘনঘন তাদের জানলার দিকে তাকায়। ওদের বেশিরভাগই তার থেকে মাত্র তিন—চার বছরের ছোটো কিন্তু তাকে দেখলেই গলা নামিয়ে কথা বলে। এটা তাকে অদ্ভুতভাবে তৃপ্ত করে। সে অভিভাবক, সংসারের কর্তা এবং মানী। বাবা বেঁচে থাকলে এমনভাবেই লোকে তাঁর সঙ্গে ব্যবহার করত! অথচ তখন তার বয়স পঁচিশও নয়।
খবরের কাগজে পাত্র—পাত্রীর বিজ্ঞাপন থেকে সে অনুর জন্য সম্বন্ধ খুঁজতে শুরু করে। তিন—চার জায়গায় চিঠিও দেয়। উত্তরও আসে।
‘সবাই টাকা চায়।’
‘এই তো আঠারোয় পড়ল আর দুটো বছর থাক না।’
‘না না, ছোটোতেই বিয়ে দেওয়া ভালো। তুমি বোঝো না, অল্পবয়সি কাঁচা মন সহজে অ্যাডজাস্ট করে নিতে পারে তাতে সুখীই হয়। আগেকার দিনে সাত—আট বছরেই বিয়ে দেওয়া হত, খুব ভালো নিয়ম ছিল।’
‘যা ভালো বুঝিস কর। গয়নাগুলো থাকলে ভাবনা ছিল না…দু—চার ভরি তো দিতেই হবে, একেবারে খালি গলা—হাতে কি মেয়ে দেওয়া যায়!’
‘ব্যাঙ্কে তো হাজার ছয়েক রয়েছে এখনও, তাই থেকে…’
‘অলুর জন্য লাগবে না?’
‘অর্ধেক টাকা ওর জন্য থাকবে।’
‘বিয়ের খরচ তো আছে…কিছু কেনাকাটা, লোক খাওয়ানো, নমস্কারি, ফুলশয্যার তত্ত্ব, দানের বাসন নমোনমো করে দিলেও তো হাজার দু—তিন, তার ওপর গয়না, অর্ধেক টাকায় এত সব হবে?’
অনন্ত চুপ করে থাকে। একটা প্রবল বিরক্তির মধ্যে তাকে হাত—পা বেঁধে যেন জোর করে শুইয়ে দেওয়া হচ্ছে। হাত—পা ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলেই বাঁধনগুলোয় টনটন করে ওঠে। এসব দায় বাবার।
কিন্তু এখন সে বাবার জায়গায়, সে বড়োছেলে। অনেক টাকার দায় তার ঘাড়ে, অনেক বছর এটা থাকবে। তাকে টাকা রোজগার করে যেতে হবে শুধু এদের জন্য। অমর থাকলে সাহায্য করত কি?
এন্টালি থেকে মৌলালির দিকে হেঁটে যাবার সময় দু—তিনদিন সে একটা চায়ের দোকানে সকালে অমরকে দেখেছিল খবরের কাগজ পড়ছে। সামনের প্লেটে টোস্ট। পরনে লুঙ্গি আর হলুদ পাঞ্জাবি। কাছাকাছিই কোথাও থাকে। দেখা করে কথা বলতে ইচ্ছে করলেও সে জড়তা কাটাতে পারেনি। কী ব্যবহার করবে?
অবশেষে দোকানটার সামনেই একদিন সকালে তারা মুখোমুখি হয়ে গেছল। ন—টার মধ্যে সেদিন এক ভাড়াটের সঙ্গে দেখা করার কথা। অনন্ত ব্যস্ত হয়ে হাঁটছিল, অমরকে সে দেখতে পায়নি।
‘এদিকে কোথায় যাও?’
অনন্ত চমকে উঠেছিল। অমরের দিকে প্রথমে সে অবিশ্বাসীর মতো তাকিয়ে হঠাৎ ডান হাতটা ওর কাঁধে রেখে বলেছিল, ‘তুই তো বেশ মোটা হয়েছিস।’
অমরের ভ্রূটা কুঁচকে উঠল। কথাটায় আমল না দিয়ে বলল, ‘বাড়ির সবাই ভালো আছে?’
‘হ্যাঁ, মা তোর কথা বলে।’
‘অ।’
ওদের দু—পাশ দিয়ে মানুষ চলাচল করছে। ফুটপাথের মাঝখানে পথজুড়ে থাকার জন্য কেউ কেউ বিরক্তিভরে তাকিয়ে গেল।
‘চা খাবে…এসো তা হলে।’
অনুরোধ নয়, প্রশ্ন নয় যেন নির্দেশ। উত্তরের জন্য পরোয়া না করে অমর চায়ের দোকানের দিকে এগোল। ওর সঙ্গে অনন্তও ঢুকল। মুখোমুখি বসল। জীবনে এই দ্বিতীয়বার সে রেস্টুরেন্টে বসল। প্রথমবার গৌরীর সঙ্গে। ছোটো দোকান, চারটে মাত্র টেবল। দরজাবিহীন রান্নাঘর থেকে ডিম আর সেঁকারুটির গন্ধ আসছে।
‘ওমলেট খাবে?…অ্যাই এদিকে আয়।’
যতক্ষণ না ওমলেট এবং মাখন লাগানো টোস্ট এল, অমর খবরের কাগজের পাতা উলটে দ্রুত উপর—নীচের হেডিংগুলোয় চোখ বোলাল। দু—তিনবার ঝুঁকে পড়ল।
ততক্ষণ অনন্ত ওকে দেখছিল। মসৃণভাবে কামানো গালদুটো ভরন্ত। গায়ের রং একটু তামাটে হয়েছে। পাঞ্জাবির বোতাম খোলা, বুকের লোম ঘন, দু—হাতেও রোম, বাঁ—হাতে কালো ডায়ালের ঘড়ি। চুল এলোমেলো, কিছুটা যেন লম্বাও হয়েছে। গলার স্বর আগের থেকে ভারী। অমর একটা পুরুষমানুষ হয়ে উঠেছে। ওকে দেখে অনন্তের ভালো লাগল।
কাগজ নামিয়ে অমর চায়ে চুমুক দিয়ে একটা টোস্ট তুলে নিল।
‘সবাই তা হলে ভালো আছে।’
‘মা তোর কথা প্রায়ই বলে, গিয়ে দেখা করলেই তো পারিস।’
অমর কাগজ পড়ায় মন দিল। টোস্টে কামড় দিয়ে চিবোতেই মড়মড় শব্দে অপ্রতিভ হয়ে অনন্ত চিবোনো বন্ধ রেখে টুকরোটা মুখের মধ্যে রেখে দিল ভেজাবার জন্য। অমর তার অস্তিত্বকে অগ্রাহ্য করে যাচ্ছে। কিছুই ভোলেনি তা হলে।
