ছেলের সম্পর্কে সুধাংশু যতটা নিশ্চিন্ত, উমা সম্পর্কে ঠিক ততটা নন। গ্রামের স্কুল থেকে কোনোক্রমে মাধ্যমিক পাশ করা, সাদাসিধা সরল উমা, একজন চিফ সাব—এর বউয়ের পক্ষে যতটা চৌকশ হওয়া উচিত, সুধাংশুর ধারণায় ততটা নয়। উমা বাইরে একা চলাফেরা করেন, দোকানে বাজারে যান, দর করে দামও কমাতে পারেন, কম তেল মশলায় সুস্বাদু করে রাঁধতে পারেন, সর্বোপরি একত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে একবারও গলা চড়িয়ে স্বামীর সঙ্গে কথা বলেননি। ঠান্ডা, নরম, ভালোমানুষ বিশেষণগুলো যেন গহনার মতো উমার অঙ্গে শোভা পায়।
কিন্তু সুধাংশুর চাপা একটা খেদ রয়ে গেছে। বাইরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে গেলে, সাংসারিক বিষয়ের বাইরে কথাবার্তা হড়কে গেলেই উমা হাবুডুবু খায়। পৃথিবীতে কত কী ঘটছে, ভারতেও কত কী ওলটপালট হচ্ছে তার কোনো খবরই উমা রাখে না। মণ্ডল কমিশন, রামজন্মভূমি, বোফর্স, গ্লাসনস্ত, পেরোস্ত্রৈকা, খোলা বাজার, রুশদি, তেন্ডুলকর, ম্যান্ডেলা এইসব বেশি তলিয়ে বোঝার হয়তো দরকার নেই কিন্তু ব্যাপারটা কী বা লোকগুলো কেন বিখ্যাত সেই সম্পর্কে তো ওপর ওপর কিছু জেনে রাখা দরকার। ইংরেজি বাংলা দুটো খবরের কাগজ বাড়িতে আসে। বাংলা কাগজের হেডিংগুলো পড়লেও তো কিছু জানা যায়। কিন্তু উমার প্রবল আলস্য কোনো কিছু পড়ায়। গল্প—উপন্যাসও পড়ে না।
তাই সুধাংশু প্রায়শই সকালের বাজার এনে রান্নাঘরের দরজার কাছে চেয়ারে বসে, উমার জানা দরকার এমন সব হেডিং কাগজ থেকে পড়ে শোনান। ইংরেজি কাগজ হলে ইংরেজির সঙ্গে বাংলা তর্জমাও করে দেন। কুটনো কোটা আর দুনিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়ার কাজ উমা একসঙ্গেই চালান।
আজ রবিবার। সকাল প্রায় দশটা। একটু আগে বউকে নিয়ে প্রভাংশু চন্দননগরে শ্বশুরবাড়ি গেল। সেখানে রাত্রিবাস করে কাল বিকেলে ফিরবে, পরশু সে বউকে নিয়ে বিশাখাপত্তনমে চলে যাবে। উমা আজ দুপুরে বকুল আর তার মেয়ে মালবিকাকে নিমন্ত্রণ করেছেন। মালবিকার বিয়ে আর আট দিন পরেই, উমা তাকে আইবুড়ো ভাত খাওয়াবেন। ঠিক করেছেন, কাঁচালঙ্কা সর্ষেবাটা দিয়ে চিংড়ি মাছের ভাপা রাঁধবেন, এটা তাঁর খুবই পছন্দের। ইঞ্চিচারেক সাইজের চিংড়ি রোজ পাওয়া যায় না, আজ ভোরে বাজারে গিয়ে সুধাংশু পেয়ে গেলেন। দিনটা তা হলে ভালো যাবে, এমন এক আনন্দের বশবর্তী হয়ে চল্লিশ টাকা দিয়ে আধ কেজি চিংড়ি কিনে ফেললেন।
সুধাংশু তিন সপ্তাহ আগে ডান হাতের তর্জনী ও মধ্যমা ভেঙেছিলেন বাস থেকে নামার সময় পড়ে গিয়ে। আঙুলের প্লাস্টার কাটা হয়েছে বটে কিন্তু কলম ধরে লিখতে পারছেন না। আশা করছেন এক মাসের ছুটিটা ফুরোবার আগেই বোধহয় পারবেন। আঙুলের জোর পরখ করার জন্যই চিংড়ি ও রুই মাছ ভরা আটশো গ্রামের থলিটি তিনি ডান হাতে ধরে বাড়ি ফিরলেন, পিছনে আর একটি থলি হাতে কল্যাণ।
ঘটনাটির কেন্দ্রে রয়েছে মালবিকা, অতএব তার এবং তার মা বকুলের কথা এবার বলা যাক।
পিতৃমাতৃহীন বকুল লালিত হয়েছে মামার বাড়িতে। মামারা ছাপোষা গেরস্ত। ভাগ্নিকে তাঁরা গলগ্রহ মনে করতেন। কোনোক্রমে ক্লাস নাইন পর্যন্ত বকুলকে পড়িয়ে আর তাঁরা পড়াননি। লাস্যে ভরা, চপল প্রকৃতির বকুল এজন্য মোটেই দুঃখ পায়নি। ভাঙাচোরা, স্যাঁতসেঁতে, অপরিচ্ছন্ন বাড়িতে স্থানাভাব তাই সুযোগ পেলেই সে পাড়ার এবাড়ি—সেবাড়ি করে বেড়াত। তাই করতে করতে সে একসময় পাড়ার বাইরেও পা বাড়াল। সিনেমায়, রেস্টুরেন্টে, ট্যাক্সিতে তাকে দেখা গেল পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে। অচিরেই বকুলের গতিবিধি সম্পর্কে নানান মুখরোচক খবর মামিদের মারফত মামাদের কানে পৌঁছল। তাঁরা বকুলের বিয়ের ব্যবস্থায় উদ্যোগী হলেন।
মামাদের নিষ্কৃতি দিয়ে হঠাৎই এক সন্ধ্যায় সিঁথিতে চওড়া করে সিঁদুর দেওয়া বকুল বাড়ি ফিরল। বাড়ির লোকেরা প্রথমে ঠিক করতে পারেননি, কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তাঁরা প্রকাশ করবেন। একটা বড়ো খরচ বেঁচে গেল, এই স্বস্তিটা চেপে গিয়ে কেউ রাগ দেখালেন, কেউ বললেন বেশ করেছে। বকুল মিনিট দশেকের বেশি বাড়িতে থাকেনি।
দেড়শো বছরের পুরোনো বিশাল এক বাড়ির, বহু শরিকের অন্যতম দিলীপরঞ্জন দত্তকে বকুল রেজেস্ট্রি বিয়ে করে। সুশ্রী, গৌরবর্ণ, দীর্ঘদেহী এবং বাকচতুর দিলীপরঞ্জন বাড়ির একটিমাত্র ঘরের অধিকারী, ইস্টার্ন রেলওয়ের কেরানি এবং পেশাদার মঞ্চে অনিয়মিত ক্ষুদ্র এক অভিনেতা। তার সঙ্গে দিলীপরঞ্জনের বয়সের তফাত পনেরো বছরের হলেও বকুল মনে করেছিল সে লটারির প্রথম পুরস্কার জিতেছে। পরে সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে লটারির টিকিটটি ছিল জাল। আভিজাত্যপূর্ণ চালচলন, কথাবার্তা ও চেহারাটাই শুধু সে দেখেছিল কিন্তু এইসবের আড়ালে দিলীপরঞ্জনের বৈষয়িক অবস্থা বা তার চরিত্রের দৈন্যদশা সে লক্ষ করেনি। বিয়ের চার মাস পরই তার স্বামী সাসপেন্ড হয় ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে। যেভাবেই হোক দিলীপরঞ্জন সেটা সামাল দেয়। মেয়ে মালবিকা জন্মায় বিয়ের পর অষ্টম মাসে। তাই নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ও মামার বাড়িতে যেসব অশ্লীল মন্তব্য ও হাসাহাসি হয় তার অধিকাংশই বকুলের কানে আসে এবং সে নীরবে তা হজম করে, কেননা ঘটনাটা সত্য। দিলীপরঞ্জনকে বিবাহে বাধ্য করার জন্য তাকে দিয়ে কৌমার্য ভঙ্গের কাজটি সে করিয়ে নিয়েছিল, এই তথ্যটি মালবিকা বারো বছর বয়সে একদিন বাবা—মায়ের তিক্ত ঝগড়ার মধ্য দিয়ে জেনে গিয়েছিল।
