‘অনি, এ দুটো চিনতে পারিস?’
‘হ্যাঁ।’
‘দাদুকে পরিয়ে দে। আয় তুলে ধর।’
দু—জনে ধুতি পরাল পাজামার উপরেই। ফতুয়া খুলে পরাল পাঞ্জাবিটা। ভারতী চিরুনি দিয়ে কাশীনাথের যে ক—টা চুল রয়েছে পাতা কেটে আঁচড়ে দিল।
‘চন্দন পেলে ভালো হত। ফুল দিবি না?’
‘ওহ হ্যাঁ, নিশ্চয়। বাবা তুমি চট করে যাও শ্যামবাজার বাজারে। আর দু—প্যাকেট ধূপও আনবে।’
‘শোনো। রজনীগন্ধা আনবে।’
অনীশের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুলিন বাজারের দিকে রওনা হল, সঙ্গে রমু।
‘হ্যাঁরে অনি, কীভাবে নিয়ে যাবি?’
‘গুরুদুয়ারা শিখ প্রবন্ধকের গাড়িতে। নার্সিং হোম থেকেই ফোন করে দিয়েছে।’
‘চল বাইরে গিয়ে দাঁড়াই।’
দু—জনে নেমে এসে গেটের সামনে দাঁড়াল। ভারতী জিজ্ঞাসা কর,. ‘কী হয়েছিল দাদুর?’
‘বাড়িতে ডাক্তার যা আন্দাজ করেছিল তাই। কলকাতায় এখন খুব হচ্ছে এই টাইপের ম্যালেরিয়া। এখানে কিছু করার ছিল না।’
‘এবার থেকে মশারি টাঙিয়ে শুবি, কুচুনের জন্যই বিশেষ করে।’
‘রমুকে কী বাড়ি চলে যেতে বলব? দাহ শেষ হতে ভোর হয়ে যাবে।’
‘কীসে দাহ হবে? চিতা সাজিয়ে না ইলেকট্রিক চুল্লিতে? আমাদের বংশের সবাই কিন্তু চিতায় উঠেছে।’ ভারতীর মুখে পাতলা হাসি খেলে গেল।
‘দাদুকে দিয়েই ট্র্যাডিশনটা ভাঙব।’ অনীশও হাসল।
‘এখানকার বিল মিটিয়ে দিয়েছিস? ঠিক কত টাকা বান্ডিলটায় আছে জানি না, টাকাগুলো তোর দাদুর।’
অনীশ ভ্রূ তুলল সঙ্গে কাঁধও। তাই দেখে ভারতী বলল, ‘নিজের জন্য কাউকে একটা পয়সাও খরচ করতে দেননি। আমার বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি অন্তত দেখিনি।’
নার্সিং হোমের টাকা মিটিয়ে দিতে অনীশ ভিতরে গেল। এসে পড়ল রমু আর পুলিন। একজনের হাতে রজনীগন্ধা স্টিকের বোঝা, অন্যজনের হাতে পদ্মফুল।
‘রমু তুমি কি এখন বাড়ি যাবে?
‘না জেঠিমা, মা বলেছে শেষপর্যন্ত থাকতে।’
অনীশ বেরিয়ে এল। ‘ফোন করলাম, বলে কুড়ি মিনিট আগে গাড়ি বেরিয়ে গেছে। আরে ওই তো এসে গেছে।’
কাচের গাড়ি থেকে দুটি লোক স্ট্রেচার নামাল। দোতলায় গেল। স্ট্রেচার মেঝেয় পাততেই ভারতী রজনীগন্ধার কলি স্টিক থেকে ছিঁড়ে নিয়ে স্ট্রেচারে ছড়িয়ে দিল কয়েকমুঠো।
‘এবার শোয়ান ওকে।’
লোকদুটি কাশীনাথকে শোয়াবার পর ভারতী বাকি স্টিকগুলো দেহের দুপাশে সাজিয়ে রাখল। পদ্মর পাপড়ি ছড়িয়ে দিল দেহের উপর। চুলে আর একবার চিরুনি দিয়ে বলল, ‘দাড়িটা খোঁচা খোঁচা হয়ে রয়েছে। এখন তো কামিয়ে দেওয়া যাবে না।’
ড্রাইভারের পেছনে লম্বা টানা সিটে বসল চারজন। ফুলছড়ানো শয্যায় শুয়ে তসরের পাঞ্জাবি আর ধুতি পরে বউমাকে সঙ্গে নিয়ে কাশীনাথ চলল নিমতলা শ্মশানের উদ্দেশে।
.
দু—দিন পর দুপুরে ভারতী কাশীনাথের ক্যাশবাক্সটি খুলে পেল ব্যাঙ্কের পাসবই চেকবই, এক খণ্ড কাগজ আর একশো টাকা। পাসবই খুলে দেখল জমার ঘরে রয়েছে দু—লক্ষ চল্লিশ হাজার পঁয়ষট্টি টাকা। কাগজে তিন লাইনে পরিষ্কার অক্ষরে লেখা রয়েছে—’আমার মৃত্যুর পর ব্যাঙ্কে আমার যত টাকা আছে সবই আমার ছেলে আইনতই পাবে কিন্তু আমার শোয়ার খাটটি পাবে বউমা। ওর শুতে খুব কষ্ট হয়। আর হবে না । ইতি শ্রীকাশীনাথ রায়।’
মালবিকা
ঘটনাটার শুরু এই বাড়ি থেকেই, তাই গৃহস্বামী ও গৃহকর্ত্রীকে আগে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক।
সুধাংশুকুমার গাঙ্গুলি বাংলা খবরের কাগজে চিফ সাব—এডিটরের চাকরি করেন। পঁয়ত্রিশ বছরের সাংবাদিক জীবনে তিনটি কাগজে কাজ করেছেন। খুব ছোটোই তাঁর সংসার। স্ত্রী উমা, তিনমাস—বিয়ে—হওয়া একমাত্র ছেলে প্রভাংশু আর ছেলের বউ সুচিত্রা। অবশ্যই একটি চাকর আছে, কল্যাণ। ইতিহাসের এম এ সুধাংশু সাবধানী এবং হিসেবি কিন্তু কৃপণ নন। একটু রক্ষণশীল কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল রেখে উদারও। ঔদার্যের চরম সীমা এখন পর্যন্ত ছুঁয়েছেন ছেলের বিয়েতে। প্রভাংশু সুবর্ণবণিকের মেয়ে বিয়ে করতে চাইলে তিনি আপত্তি করেননি। সুচিত্রা রূপবতী, ধনী কন্যা এবং বাংলা অর্নাসসহ গ্র্যাজুয়েট। প্রায় পনেরো ভরি সোনার গহনা সে বাপের বাড়ি থেকে এনেছে। সুধাংশু এটা রোধ করতে না পারলেও রঙিন টিভি সেট ও রেফ্রিজারেটর কিছুতেই নিতে রাজি হননি। ওগুলো তাঁর আছে। কিন্তু থাকলেও অনেক ছেলের বাপ তো লোভ সামলাতে পারেন না কিন্তু তিনি পেরেছেন। নিজের সম্পর্কে সুসভ্য ও শিক্ষিত বলে তাঁর চাপা একটা গর্ব আছে।
চাকরি—জীবন শুরু করে বড়দার কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়ে সুধাংশু কলকাতার উপকণ্ঠে পাতিপুকুরে তিন কাঠা জমি কিনে ফেলেন। কলকাতা অদূর ভবিষ্যতে বাড়বে এবং পাতিপুকুর কলকাতার মধ্যে ঢুকে যাবে এটা তিনি পঁয়ত্রিশ বছর আগেই বাস্তব হালচাল থেকে বুঝে গেছলেন। দাদার ঋণ তিন বছরেই শোধ করে, তিনতলার ভিত গেঁথে প্রথমে একতলা একটি বাড়ি তৈরি করেন। এ—জন্য দু—বছর ধরে নানান জায়গা থেকে সস্তায় গৃহনির্মাণ সামগ্রী তাঁকে সংগ্রহ করতে হয়েছিল।
যতটা পরিশ্রম ও অধ্যবসায় নিয়ে সুধাংশু একতলা বাড়িটাকে দোতলায় পরিণত করেন ঠিক ততটা যত্ন ও নিষ্ঠা নিয়েই তিনি প্রতিদিন প্রভাংশুকে পড়াতে বসতেন। ছেলের শিক্ষার ভিতটা উচ্চচ মাধ্যমিক পর্যন্ত গেঁথে দেওয়ায় সে শিবপুর থেকে উচ্চচ প্রথম শ্রেণি পাওয়া ধাতুবিদ্যার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বিশাখাপত্তনমে ইস্পাত কারখানায় এখন মোটা বেতনের চাকুরে।
