ভারতী বলল, ‘দুপুরে ভাত খেয়ে শুয়েছেন। তখনও দেখেছি অন্যদিনের মতোই স্বাভাবিক, ঘণ্টাখানেক আগে চা দিতে এসে দেখি জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।’
‘বয়স কত এনার?’
পুলিন বলল, ‘অষ্টআশি।’
ডাক্তারের ভ্রূ কুঁচকে উঠল। চোখের পাতা টেনে তুলে দেখে বললেন, ‘মনে হচ্ছে ম্যালেরিয়া, ম্যালিগনান্ট হতে পারে। ওঁকে হসপিটালাইজ করুন, নয়তো কোনো নার্সিং হোমে নিয়ে যান। জ্বরের জন্য একটা ট্যাবলেট দিচ্ছি, তবে ওর রক্ত পরীক্ষা করা দরকার।’
বাড়িতে আসার জন্য ডাক্তারবাবু ডবল ফি নিলেন আশি টাকা। তিনি চলে যাবার পর পুলিন বিপন্ন মুখে বলল, ‘নার্সিং হোম কী হাসপাতাল যেখানেই যাই না কেন বাবাকে নিয়ে যাবটা কেমন করে?’
‘অ্যাম্বুলেন্স করে। নয়তো কীসে করে এমন অবস্থায় নিয়ে যাবে? একটু আগে অনিকে ফোন করেছি, ও আসছে, যা করার ওই করবে। তুমি আগে ওষুধটা আনো।’
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় উমার বাবার সঙ্গে দেখা হতে পুলিন তাকে জানিয়ে দিল বাবার ম্যালিগনান্ট ম্যালেরিয়া হয়েছে। একটু পরেই জয়ন্তী হাজির হল উদবিগ্ন মুখে।
ভারতীর কাছে সব শুনে তিনি চেয়ারে বসে পড়লেন। কারোরই এখন কিছু করার নেই কাশীনাথের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া। জয়ন্তী একবার শুধু অস্ফুটে বলল, ‘বয়সও তো হয়েছে, এখন ধাক্কাটা সামলানো শক্ত।’
অনীশ এসে পৌঁছল ট্যাক্সিতে। ভারতীর কাছে সব শুনে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে দিল পরিচর্যা নার্সিং হোমে। ওদের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স আছে।
পুলিনের আনা ট্যাবলেট প্রায় অজ্ঞান কাশীনাথকে খাওয়ানো বা গেলানো সম্ভব হল না। পুলিন নীচে নেমে গেটে দাঁড়িয়ে রইল। অ্যাম্বুলেন্সের গাড়ি দেখেই হাত নেড়ে থামিয়ে স্ট্রেচারসহ দু—জনকে ওপরে নিয়ে আসে।
কাশীনাথকে যখন অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছে তখন তার মুখ থেকে রক্ত বেরিয়ে এল। অনীশ তা লক্ষ করেছিল, সঙ্গে থাকা পুলিনকে কিছু বলল না।
নাতিকে নিয়ে ভারতী তিনতলার বারান্দা থেকে দেখল কাশীনাথের নার্সিং হোমে যাওয়া। কিছুক্ষণ পরেই বলাকা ফিরল।
‘বাবাকে অনি নার্সিং হোমে নিয়ে গেল একটু আগে।’
হতভম্ব বলাকা বলল, ‘কী হয়েছে? সকালে তো দেখলাম দিব্যি রয়েছেন।’
‘তোমার শ্বশুর একজন ডাক্তার ডেকে আনেন, তিনি বলে গেলেন ম্যালেরিয়া হতে পারে। কী যে হবে কে জানে।’ ভারতী শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কাশীনাথের খাটের দিকে। টেবিলের উপর পড়ে রয়েছে ঝালমুড়ির ঠোঙা। ভারতী বারান্দায় গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঘরে এসে খাটে বসে পড়ল। তখন মনে পড়ল বলাকাকে খেতে দিতে হবে। তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের জল চড়াল।
‘বউমা কী খাবে এখন, চিড়ে ভেজে দোব?’
‘থাক মা খিদে নেই। দাদুর কথা শুনে খাওয়ার ইচ্ছে চলে গেছে। বরং চা দিন।’
বলাকাকে চা দিয়ে ভারতী কাশীনাথের ঘরে এল। বিছানায় বেডকভারটা পেতে বালিশটা মাথার দিকে রাখতে গিয়ে মেঝেয় পড়ে গেল ক্যাশবাক্সের চাবিটা। এটা যক্ষের ধনের মতো কাশীনাথ সঙ্গে করে রাখে। চাবিটা সে ক্যাশবাক্সের উপর রেখে দিল। আবার সে খাটে বসে বাহুতে বাহু রেখে মাথা হেলিয়ে দিল। উৎকণ্ঠা তাকে গ্রাস করেছে। অবসন্ন হয়ে পড়ছে হৃদয়। বুড়ো মানুষটা তাকে বলেছিল ‘ধুতি—পাঞ্জাবি পরে একবার বড়ো রাস্তা পর্যন্ত হেঁটে যাব, তুমি থাকবে আমার সঙ্গে।’ সাইকেলের ধাক্কা খাওয়ার পর বুড়োমানুষটার হেঁটে যাওয়া আর হয়নি। অনি তসরের পাঞ্জাবি তৈরি করে দিয়েছিল আর কিনে এনেছিল ছয় ইঞ্চি পাড়ের ধুতি। সে দুটো এখনও আলমারিতে তোলা আছে।
ঘণ্টা দুয়েক পর ফোন বেজে উঠল পাশের ঘরে। ভারতী ছুটে গেল। রিসিভার কানে লাগিয়ে শুনে যাচ্ছে বলাকা। কাকে যেন বলল, ‘হ্যাঁ মাকে বলছি।’
ভারতী ব্যগ্র হয়ে বলল, ‘বউমা, অনির ফোন? বাবা কেমন আছে?’
‘দশ মিনিট আগে মারা গেছেন। আপনি কাউকে সঙ্গে নিয়ে এখুনি যান, নার্সিং হোমটা তো চেনেন, আমাকে দেখতে যেতেন। দাদুকে আর ওরা বাড়িতে আনবেন না। ওখান থেকেই শ্মশানে নিয়ে চলে যাবেন।’
একবার থরথর করে কেঁপে উঠেই বিহ্বলতা কাটিয়ে শত হয়ে গেল ভারতী।
‘ভাল কথা, কিছু টাকাও সঙ্গে করে নিয়ে যেতে বলল, ওর কাছে বেশি টাকা নেই।’
ভারতী আলমারি খুলে ঝোলাটা বার করল। নোটের বান্ডিলগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। বলাকাও তাকিয়ে রয়েছে চোখে বিস্ময় নিয়ে। ভারতী একটা বান্ডিল বার করে নিয়ে বলল, ‘এটা এখন তোমার কাছে রেখে দাও।’ তারপর সে কাপড়ের থাকের নীচের থেকে টেনে বার করল তসরের পাঞ্জাবি আর ময়ূরপুচ্ছ ধুতিটা।
‘বউমা সেদিন অনি যে ব্যাগটায় করে শার্ট কিনে আনল, সেটা আছে? থাকলে দাও। আর চিরুনিটাও দাও।’
বলাকা স্টিলের আলমারি থেকে শার্টটা বার করে নিয়ে খালি পলিথিনের ব্যাগটা দিল। টাকা, ধুতি, পাঞ্জাবি, চিরুনি তাতে ভরে নিয়ে ভারতী বলল, ‘দেখি উমার ভাই যদি যায় তো ওকে নিয়েই যাব।’
শাড়ি বদলিয়ে চটি পরে ভারতী বেরিয়ে পড়ল। দোতলায় উমাদের সকলেই ফ্ল্যাটে রয়েছে। ভারতী বলামাত্র জয়ন্তী বললেন, ‘নিশ্চয় যাবে। এতরাতে আপনি একা যাবেন কী! রমু যাবে সঙ্গে।
রমু আর ভারতী ট্যাক্সিতে পাঁচ মিনিটেই পৌঁছে গেল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অনীশ আর পুলিন। তারা ভারতীকে নিয়ে গেল দোতলায়। একটা ছোট্ট কেবিনে কাশীনাথ খাটে শুয়ে। চোখে চশমা। পরনে ফতুয়া—পাজামা। ব্যাগ থেকে ভারতী ধুতি আর পাঞ্জাবি বার করল। টাকার বান্ডিলটা ছেলের হাতে তুলে দিয়ে বলল,
