‘ঝোলাটা বার করো, গুনে দেখা যাক।’
ভারতী চাবি দেওয়া আলমারি খুলে রঙিন ঝোলাটা বার করে হাতে তুলে ধরে ওজন পরখ করে বলল, ‘এক কিলো তো হবেই।’
‘দরজা দুটো বন্ধ করো, পাখাটাও। নয়তো হাওয়ায় নোট উড়বে।’
ভারতী ঝোলা উপুড় করে মেঝেয় নোটগুলো ঢেলে বলল, ‘বাব্বা, এত নোট, একটুও তো বুঝতে পারিনি। টাকা পেতুম আর চোখ বুজে ঝোলায় ঢুকিয়ে দিতুম। আচ্ছা তুমি একসঙ্গে এত নোট কখনো দেখেছ?’
পুলিন স্তূপ করা নোট মুঠোয় তুলে ধরে মেঝেয় ফেলে দিতে দিতে বলল, ‘দেখিনি। বউমা নিশ্চয় রোজ দেখে। এবার এক কাজ করো, নোটগুলো আলাদা আলাদা করো। পাঁচ, দশ, পঞ্চাশ, একশো করে ভাগা দিয়ে রাখো।’
দু—জনে দ্রুত হাতে চারভাগা করার পরও এক টাকা ও দু—টাকার প্রচুর নোট থেকে গেল।
পুলিন বলল, ‘ওগুলো পরে গুনব, আগে এই বড়োগুলো গুনে ফেলা যাক। তাড়াতাড়ি করো।’
ভারতী বলল, ‘গুনে গুনে তো যোগ দিতে হবে, দাঁড়াও কাগজ আর পেনটা আনি।’
টেলিফোনের পাশে রাখা ডটপেন আর প্যাঠ, ভারতী নিয়ে এল। দু—জনে নোটগুলো গুনে কাগজে টুকে রেখে যোগ দিল। পুলিন যোগফল দেখে বিশ্বাস করতে না পেরে আবার যোগ করল। তারপর ভারতীকে বলল, ‘তুমি একবার যোগ দাও তো।’ ভারতী যোগ করে বলল, ‘ঠিকই তো আছে, একান্ন হাজার সাতশো বাইশ। খুচরো এক—দুটাকাগুলো তাও গোনা হয়নি। গুনলে আরও দু—তিনশো হবে।’
‘তার মানে বাহান্ন হাজার টাকা!’ পুলিনের মুখ দিয়ে আর কথা সরল না।
‘হবে না? সাড়ে চার বছরের জমানো টাকা।’
‘বাবা এখনও পর্যন্ত জানেন তার টাকাতেই বাজার ছাড়া আর সব খরচ চলছে। আর তার দেওয়া টাকাগুলো যে—।’ পুলিন আঙুল দিয়ে মেঝেয় থোক করে রাখা নোটগুলো দেখাল।
ভারতী শুনে মুচকি হাসল। ‘ব্যাঙ্কে বাবার কত টাকা জমেছে এতদিনে আমরা জানি না। মাসে মাসে পেনশন যা পান সেটা তো কম নয়।’
‘চার বছর আগে পেনশন বেড়ে হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা! এটা আমি জানি।’
রান্নাঘরে জমিয়ে রাখা আছে রাবার ব্যান্ড। ভারতী তার গোটা দশেক এনে নোটগুলো বান্ডিল করে ঝোলায় ভরে রাখল। ঝোলার পেটমোটা ভাবটা কমে গেল।
‘একটা কথা ভেবে দেখো, অনিকে টাকাগুলো দিতে গেলেই জিজ্ঞেস করবে পেলে কোত্থেকে, তখন কী বলবে? বাবার কাছ থেকে নিয়েছি, তোর কাছ থেকেও নিয়েছি, এই কথা বলবে?’ পুলিন জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইল।
ভারতীর কপালে ভাঁজ পড়ল, বলল, ‘ যা সত্যি তাই বলব, এ টাকা তোর ঠাকুরদা মাসে মাসে দিয়েছে, আমি তুলে রেখেছিলুম।’
‘আর অমনি হাত পেতে অনি নিয়ে নেবে? ঠাকুরদার টাকা নেওয়া বন্ধ করার জন্যই তো ও টাকা দিয়ে যাচ্ছে। তুমি গাছেরও খেয়েছ তলারও কুড়িয়েছ।’
‘আমিই শুধু খেয়েছি আর কুড়িয়েছি! তুমিই তো রাস্তা দেখলে। বিমানবাবুকে দাঁড় করিয়ে বাবার কাছে না গিয়ে আমার কাছে এসে টাকা চাইলে, মনে পড়ে? এখন তুমি তুমি বলে আমাকে দেখাচ্ছ।’ ক্রুদ্ধ ভারতী ঝোলাটা আলামারিতে রেখে চাবি দিয়ে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
বিকেলে চা খেতে খেতে ভারতীকে পুলিন বলল, ‘এখন অনিকে কিছু বলার দরকার নেই। সাড়ে চার বছর যখন কেটেই গেল আর দু—তিনটে বছর যাক। কুচুনকে জামাজুতো পরিয়ে দাও পার্কে নিয়ে যাব।’ তারপর যোগ করল, ‘বাবাকে কোনোভাবে চটিয়ো না, যা খেতে চাইবে দেবে। দেখি ঝালমুড়িওলাটাকে পাই কি না।’
কুচুনকে নিয়ে পুলিন বেরিয়ে যাবার পর ভারতী শ্বশুরকে চা দিতে গিয়ে দেখল কাশীনাথ বেডকভার মুড়ি দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে।
‘বাবা চা এনেছি।’
কাশীনাথ সাড়া দিল না। ভারতী আবার ডাকল। সাড়া মিলল না। এবার সে শ্বশুরের কাঁধ ধরে নাড়া দিয়ে বলল, ‘উঠুন, ‘পাশ ফিরল কাশীনাথ, ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে রইল, মুখ দেখে ছ্যাঁৎ করে উঠল ভারতীর বুক। শ্বশুরের কপালে হাত রেখে বলল, ‘এ কি গা পুড়ে যাচ্ছে!’
ভারতী জলপটি নিয়ে কাশীনাথের পাশে বসল। দ্বিতীয় কেউ এখন ফ্ল্যাটে নেই। সে অসহায় বোধ করল। থার্মোমিটার বাড়িতে নেই। ভারতী ছুটল চারতলায়। প্রণববাবুর বউয়ের কাছে থেকে থার্মোমিটার এনে কাশীনাথের জ্বর দেখল, একশো চার ডিগ্রি!
এবার সে কাশীনাথকে ঘুরিয়ে মাথার নীচে কুচুনের রাবারক্লথ রেখে মাথায় জল ঢালতে শুরু করল। একটু পরেই পুলিন ফিরল কুচুনকে নিয়ে, হাতে বাবার জন্য ঝালমুড়ির ঠোঙা।
‘কী হয়েছে বাবার?’
‘ভীষণ জ্বর, ডাক্তারবাবুকে একবার ডাকতে হবে।’
তিনটে বাড়ির পরেই থাকেন ডাক্তার চক্রবর্তী। পুলিন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘উনি তো এখন বেরিয়ে গেছেন বড়োবাজারের চেম্বারে বসার জন্য।’
‘তাহলে কাছাকাছি কোনো ডাক্তারখানায় দেখো কাউকে পাও কিনা, পপুলার মেডিক্যালে তো একজন বিকেলে বসে শুনেছি। যত টাকা ফি চাইবে দোব।’ ভারতী ব্যাকুল স্বরে বলল।
পুলিন ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। মাথায় জল ঢালা ছাড়া আর কী করবে ভারতী ভেবে পাচ্ছে না। চোখ বন্ধ করে কাশীনাথ আচ্ছন্নের মতো শুয়ে। শ্বাস গভীরভাবে নিচ্ছে, মুখ থেকে ক্ষীণ ঘরঘর শব্দের সঙ্গে সে মাথাটা এপাশ ওপাশ করল। ভারতী পাশের ঘরে গিয়ে ফোন করল অনীশকে।
দাদুর হঠাৎ ভীষণ জ্বর, আমার ভালো ঠেকছে না। তোর বাবা ডাক্তার ডাকতে গেছে। পারলে তুই এখুনি চলে আয়।’
পুলিনের সঙ্গে এল অল্পবয়সি এক ডাক্তার। নাড়ি দেখলেন, রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে। প্রশ্ন করলেন, ‘কখন থেকে জ্বর হয়েছে?’
