‘আমিও তো গ্রামে দাইয়ের হাতে জন্মেছি, কই মা তো মরেনি!’
‘সেটা তাঁর ভাগ্য।’
এগুলো কি আমায় খেতে হবে?’ প্লেটে চারটে সন্দেশের দিকে কাশীনাথ বলল আঙুল দেখিয়ে।
‘খাবার জন্যই তো দিয়েছি!’ ভারতী বিভ্রান্তের মতো তাকাল।
‘নিয়ে যাও, নষ্ট কোরো না।’
প্রথম ঠাকুমা হওয়ার আনন্দ দপ করে উবে গেল ভারতীর অন্তর থেকে তিক্ত স্বরে বলল, ‘ঠিক আছে আপনাকে খেতে হবে না, নীচের দারোয়ানকে দিয়ে দোব,’ প্লেটটা তুলে নিয়ে সে চলে যায়।
নার্সিং হোম থেকে বলাকা তার বাচ্চচা নিয়ে সোজা বাপের বাড়ি চলে গিয়ে ফিরে আসে গুহ ভবনে একমাস পর। উমা যখন বেরোচ্ছিল সেই সময় ট্যাক্সিটা এসে গেটের সামনে থামে। প্রথমে নামল অনীশ, হাত বাড়িয়ে তোয়ালে জড়ানো শিশুকে সে দু—হাতে নিল, বলাকা ট্যাক্সি থেকে নামছে, উমা ছুটে গিয়ে অনীশের হাত থেকে বাচ্চচাকে দু—হাতে প্রায় কেড়ে নিয়ে বলল, ‘আমাকে দাও অনিদা।’
উমা অনির ছেলেকে নিয়ে তিনতলায় এল। ওর হাত থেকে নাতিকে নিয়ে ভারতী হাতে নাচিয়ে পুলিনের হাতে দিল। পুলিন ঘরে গিয়ে কাশীনাথের সামনে ধরে বলল, ‘বাবা অনেক ভাগ্য করলে লোকে পুতির মুখ দেখে।’
মিটমিট করে তাকিয়ে কাশীনাথ ক্যাশবাক্সের চাবিটা ফতুয়ার পকেট থেকে বার করে ছেলের দিকে বাড়িয়ে বলল, ‘বাক্সটা খোল, ডানদিকের নীচের খোপে দুটো রুপোর টাকা আছে, একটা নিয়ে ওর হাতে দে। হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, চাবিটা নে।’
ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলাকা, অনীশ, উমা আর ভারতী। এক হাতে তোয়ালে জড়ানো ঘুমিয়ে কাদা হয়ে থাকা নাতি, অন্য হাতে চাবি নিয়ে পুলিন ক্যাশবাক্স খুলে ডানদিকের নীচের খোপ থেকে পঞ্চম জর্জের মুখের ছাপ দেওয়া একটা রুপোর টাকা বার করল।’
‘এবার এটা ওর হাতে দে।’
পুলিন ঘুমন্ত বাচ্চচার মুঠোয় টাকাটা গুঁজে দেবার চেষ্টা করছে তখনই বলাকা শ্বশুরের হাত থেকে ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়ে, টাকাটা ছুড়ে দিল। সেটা লাগল কাশীনাথের বাহুতে।
‘দরকার নেই অমন টাকায়।’ এই বলে বলাকা প্রকাশ্যে দাদাশ্বশুরের বিরুদ্ধে ঘোষণা করে দিল তার যুদ্ধ, যেটা আগেই ঘোষণা করেছিল তার স্বামী। ভারতী আর উমা হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে।
কেউ কথা না বলে ফিরে এল দালানে। ছেলেকে নিয়ে বলাকা তার ঘরে ঢুকল। একটা বিশ্রী পরিস্থিতির কবলে পড়েছে সবাই। উমা বাইরের লোক, সব থেকে অপ্রতিভ সে। ‘আমি যাই’ বলে সে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে হাঁফ ছাড়ল।
‘কী যে করব ভেবে পাচ্ছি না।’ চুলে আঙুল ডুবিয়ে অনীশ বলল, ‘ছোটোবেলা থেকেই দেখে আসছি দাদুর এই ধরনের ব্যবহার। কিছু করার নেই, কোথাও যে ফ্ল্যাট দেখে উঠে যাব তাও সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের অফিসটা আবার দুদিকে এতদূর যে, মেট্রো থেকে দূর হয়ে গেল বলাকার অসুবিধা হবে। এই বাড়িটা সব থেকে সুবিধাজনক বলেই অন্য কোথাও থাকার চেষ্টা করিনি। এবার দেখছি করতে হবে।’
অনীশ নিজের ঘরে চলে যাবার পর ভারতী বলল, ‘নতুন অতিথি এল আর কী অভ্যর্থনা পেল!’
পুলিন গলা চেপে বলল, ‘বাবার বয়স হয়েছে, আর ক—দিনই বা থাকবেন। একটু ধৈর্য ধরে থাকো।’
ক—দিন নয়, কাশীনাথ দিব্যি বহাল তবিয়তে পাঁচটা বছর কাটিয়ে অষ্টআশিতে পড়ল এবং পাঁচটা বছরে নিজের পুত্র আর পুত্রবধূ ছাড়া আর কাউকে তার বিষাক্ত গঞ্জনার শিকার করেনি। অনীশের অন্য কোথাও থাকার চেষ্টাটা ধীরে ধীরে থিতিয়ে এসেছে। অন্যত্র ফ্ল্যাট নিয়ে থাকতে হলে মাসে মাসে যে টাকা ভাড়া দিতে হবে সেটা বাঁচিয়ে জমাচ্ছে স্বামী—স্ত্রী। জমানো টাকার সঙ্গে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে ফ্ল্যাট কিনতে বদ্ধপরিকর হয়েছে বলাকা। অনীশও লোন পাবে তার অফিস থেকে আর দু—বছর পর পাবলিক রিলেশনস ম্যানেজারের পদে অধিষ্ঠিত হলে। বলাকার মেজোমামা অনীশকে ধৈর্য ধরতে বলেছেন।
কম কথাবলা বলাকা কথা বলা আরও কমিয়ে দিয়েছে। যতটুকু বলে তা শুধু শাশুড়ির সঙ্গেই। সে অফিসে চলে যাবার পর বাচ্চচা কুচুন তার ঠাকুমার সবটুকু সময় দখল করে নেয়। বলাকার দেওয়া ব্যাগে টাকা রাখতে রাখতে আর জায়গায় কুলোচ্ছিল না। পুলিনকে দিয়ে সে একটা সুদৃশ্য ঝোলা কিনে আনিয়েছে। তার মধ্যে রেখেছে মুঠো মুঠো নোট।
একদিন দুপুরে অনীশের ঘরে টিভি দেখতে দেখতে পুলিন বলল, ‘কত জমল গুণে দেখেছ কী? মাসে মাসে বাবা দিয়েছে প্রায় আট—নশো টাকা। কুচুনের জন্মানোর সময় থেকে দিচ্ছেন। একদিন গুনে দেখতে হবে।’
কুচুনকে অনীশ এন্টালির এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভরতি করে দিয়েছে। স্কুলের বাস আসে সকাল সাড়ে ছ—টায় সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যুর মোড়ে দাঁড়ায়। পুলিন তাকে বাসে তুলে দিয়ে আসে। স্কুল ছুটি হয় সওয়া এগারোটায়। বাস কুচুনকে নামিয়ে দিয়ে যায় বারোটায়। ভোরে ঘুম থেকে ওঠা কুচুন ক্লান্ত হয়ে ফেরে। স্নান করে ভাত খেয়েই সে ঘুমিয়ে পড়ে।
দুপুরে ঘুমন্ত কুচুনের পাশে খাটে শুয়ে ভারতী বলল, ‘অনেক টাকা, ঝোলাটার পেট ফুলে উঠেছে। অত টাকা নিয়ে আমরা কী করব বলো তো? কী ঠিক করেছি জানো, টাকাগুলো অনিকে দিয়ে দোব।’
পুলিন চমকে উঠল। ‘তার মানে?’
‘ফ্ল্যাট কিনতে ওদের সময় লাগছে টাকার জন্য। পাঁচ—সাত লাখ টাকা জমানো কী সোজা কথা! এই টাকাটা পেলে ওদের সুবিধে হবে।’
