রাত্রে পুলিন আর ভারতী মেঝেয় শুয়ে। চারটি পায়ার নীচে আটটা ইট দিয়ে তোলা খাটে কাশীনাথ শুয়ে। দু—জনের শরীরের নিম্নাংশ খাটের নীচে।
‘হ্যাঁরে পুলিন, আজ যে ভাড়া নিতে এল না!’
পুলিন জবাব দেবার আগেই ভারতী বলল, ‘এসেছিল বাবা, আপনি তখন কলঘরে ছিলেন, বললুম একটু পরে আসতে তাইতে বিমানবাবু বললেন কাল আসবেন।’
ভারতী ফিসফিস করে পুলিনকে বলল, এত রাতে কিছু বোলো না। কী শুরু করে দেবেন কে জানে।’
‘বউমা দশরথের মায়ের টাকাটা কাল চেয়ে নিয়ো।’
‘নোব, এখন আপনি ঘুমোন।’
পরদিন দুপুরে ভাত খেতে বসে কাশীনাথ আবার বলল, ‘কই বিমানবাবু তো এল না যে?’
শ্বশুর কী তাণ্ডব শুরু করে দেবেন ভাড়া দিয়ে দেওয়া হয়েছে শুনলে, সেই আতঙ্কে ভারতীর মাথায় কী দুর্বুদ্ধি চাপল কে জানে, কিছু না ভেবেই সে বলে দিল, ‘এসেছিলেন, বললেন ভাড়ার টাকা ওদের সেরেস্তায় গিয়ে দিয়ে আসতে। নতুন নিয়ম করেছে এখন যে মালিক হয়েছে, পয়লায় না দিলে ওদের ওখানে গিয়ে দিতে হবে। আপনি টাকাটা দিন উনি বিকেলে দিয়ে আসবেন।’
‘এরকম নিয়ম করেছে, কই আগে তো জানায়নি! জানানো উচিত ছিল। এবার থেকে টাকা রাতেই তোমাকে দিয়ে রাখব, দশরথের মায়েরটাও।’
কাশীনাথ তার ক্যাশবাক্সের তালা খুলে দুশো টাকা বার করে ভারতীর হাতে দিয়ে বলল, ‘বিলটা আমাকে দিয়ো। আর শোনো, টেলিফোনের টাকা কিন্তু আমি দোব না। আমাকে না জানিয়ে তোমরা এটা নিয়েছ, আমার কোনো দায়দায়িত্ব নেই।’
সন্ধ্যায় ভারতী ভাড়ার বিলটা কাশীনাথকে দিয়ে বলল, ‘বাবা এই যে বিল। এবার থেকে ভাড়ার টাকা আগের রাতেই দিয়ে রাখবেন।’
কাশীনাথের দেওয়া দুশো টাকা ভারতী কোথায় রাখবে ঠিক করতে সাত—পাঁচ ভেবে অবশেষে বলাকাকে বলল, ‘বউমা তোমার কাছে ছেঁড়া ফাটা কোনো ব্যাগ আছে আমি টাকা রাখব।’
‘কত বড়ো।’
‘এই যেটা নিয়ে তুমি অফিস যাও অতবড়ো হলেই হবে।’
‘ওটা তো বেশ বড়ো, কত টাকা রাখবেন?’
বলাকার অবাক হওয়া দেখে ভারতী তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ‘অল্প টাকা মাসে মাসে রাখব।’
‘আপনি ব্যাক সেভিংসে রাখুন না। এই তো এখানেই আমাদের একটা ব্রাঞ্চ রয়েছে। আমি টেলিফোনে শ্যামনগর থেকে বলে দেব।’
ব্যাঙ্ক, চেকবই, পাসবই, সইকরা এগুলো নিয়ে সে শ্বশুরকে ব্যস্ত থাকতে দেখেছে। অত হিসেবনিকেশ আর সই করতে হবে ভেবে ভারতী অস্বস্তি বোধ করে বলল, ‘সামান্য টাকার জন্য আবার ব্যাঙ্ক কেন, হুটপাট দরকারের জন্য হাতের কাছে ক—টা টাকা রাখব।’
বলাকা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘তাহলে আমার এই ব্যাগটাই নিন না। আমি তো ছুটি নিচ্ছিই, ব্যাঙ্কে যাব না। পরে একটা কিনে নেব।’
সেই থেকে শুরু হল ভারতীর গোপনে টাকা জমানো। কাশীনাথের মাসে মাসে দেওয়া যাবতীয় টাকা সে বলাকার দেওয়া হাত ব্যাগটায় ভরে দেয়। শ্বশুরকে না জানিয়ে তার দেওয়া খরচের টাকা সরিয়ে রেখে, ছেলের দেওয়া টাকা আর দোকান ভাড়ার দু—হাজার টাকা দিয়ে তার সংসারের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের ব্যাপারটি আর জানে শুধু পুলিন।
ছেলের আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে সে যে শ্বশুরের সঙ্গে চাতুরি করছে এটাই তার মনের মধ্যে গুমোট তৈরি করে এক এক সময় দমবন্ধ করে দেয়। মাঝে মাঝে তার আপশোস হয়, মুখ ফসকে বলা মিথ্যেটা সে বলেছিল শ্বশুরের তাণ্ডব শুরুর ভয়ে। সংসারের একচ্ছত্র অধিপতির সিংহাসনে বসে একটা লোক প্রায় ষাট বছর রাজত্ব করে আসছে প্রবল প্রতাপে। হঠাৎ তার হাত থেকে শাসন ও পালনের দায়িত্বটা আচমকা কেড়ে নিলে এই তিরাশি বছর বয়স্ক মানুষটি যে কীভাবে খেপে উঠবেন সেটা মনে হতেই ভয়ে কিছু না ভেবেই হঠাৎ এমন একটা মিথ্যা কথা বলার জের তাকে টেনে চলতে হবে, সেটা কল্পনাতেও আনতে পারে না।
পুলিন বলেছিল, ‘বলেছ ঠিক আছে, কাউকে জানিয়ো না, বাবাকে নয় অনিকেও নয়। বাবা টাকা দিলেই নিয়ে নিয়ো, না নিলে কিন্তু ধরা পড়ে যাবে।’ একটা অপরাধ ঢাকতে আর একটা অপরাধ করার মতো ভারতী প্রতি মাসে টাকা নিয়েছে। আর ব্যাগে রেখে দিয়েছে। কাশীনাথ জানে সংসারের প্রধান খরচগুলো মেটাচ্ছে সে। তার বিরক্তি, রাগ, হুকুম, গালমন্দ সে অব্যাহত রেখেছে।
বলাকার ছেলে হল নার্সিং হোমে সিজারিয়ান করে। সুস্থ সবল শিশু সাত পাউন্ড ওজন। ভারতী পাঁচটা ফ্ল্যাটে সন্দেশ দিয়ে এসেছিল নিজে।
‘এবার তো ঠাকুমা হলেন’ কথাটা সব জায়গাতেই শুনতে হয়েছে। শুনে তার বুক ভরে গেছল খুশিতে। টালিগঞ্জ থেকে সবাই এসেছিল নার্সিং হোমে এবং শ্যামবাজার থেকেই মেট্রোয় চড়ে তারা ফিরে যায়। ভারতীর অনুরোধেও তারা গুহ ভবনে আসেনি, তার মনে হয়েছিল কাশীনাথের জন্যই তারা এল না। হয়তো বলাকা টেলিফোনে ওদের বলেছে কাশীনাথের কথা।
তার নাতি হওয়ার কথা সন্দেশ হাতে নিয়ে কাশীনাথকে জানাতেই প্রথম প্রশ্ন।
‘দেখতে কেমন হয়েছে? মায়ের মতো নয়তো? রং কেমন?’
‘সদ্য জন্মাল। এখন তো সব বাচ্চচাকেই একই রকম লাগবে। ক—টা মাস যাক মুখ চোখ তৈরি হোক তবে কেমন দেখতে হয়েছে বলা যাবে। আর গায়ের রং বাপের মতোই হয়েছে।’
‘পেট কেটে বাচ্চচা হয়েছে বললে। এই আজকালকার একটা ফ্যাশান।’
‘ফ্যাশান নয় বাবা এটার দরকার ছিল। আপনার পিসি আর বোন হয়তো মরতেন না যদি সিজারিয়ান করে বাচ্চচা হত। তখন গ্রামে এসব ব্যবস্থা ছিল না।’
