যতক্ষণ ধরে সে বলে গেল বলাকা স্থির চোখে তার মুখের দিকে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইল। ভারতী বুঝে গেল বলাকা ও ঘরে চেঁচিয়ে বলা কাশীনাথের কথাগুলো শুনেছে।
‘আপনি রোজ যা দেন তাই দেবেন।’ বলেই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চল আঁচড়াতে শুরু করল।
এরপর আর ঘরে থাকা যায় না। ভারতী রান্নাঘরে ফিরে এল রুটি করার জন্য। পুলিন গেছে নবজীবন সংঘের বার্ষিক মিটিঙে, সেখানে সে পাঁচজন সহ—সভাপতির একজন। কিছুক্ষণ পর অফিস থেকে ফিরল অনীশ। দালানে পা দিয়েই ভারতীকে উদ্দেশ করে বলল, ‘কাল টেলিফোনের লোক আসবে কানেকশান দিতে। দুপুরে তৈরি থেকো।’ বলেই সে ঘরে ঢুকে গেল।
আধঘণ্টা পর অনীশ দালানে চেয়ার টেনে বসে বলল, ‘মা খেতে দাও।’
টেবলে খাবার থালা রেখে ভারতী বলল, ‘কই বউমা এল না?’
অনীশ আর বলাকা রাতের খাওয়া একসঙ্গে খায়। দু—জনকেই সকালে সাড়ে আটটার মধ্যে বেরোতে হয়। অন্যদের থেকে ওরা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে।
অনীশ মুখ নামিয়ে বলল, ‘খাবে না, মাথা ধরেছে।’
ভারতীর অসুবিধা হল না বুঝতে কেন খাবে না। সে এই নিয়ে কোনো কথা না বলে অন্য প্রসঙ্গে গেল। ‘তোর বাবা অনেকদিন আগে বলেছিল একটা ফোন এবার থাকা দরকার, বাড়িতে দুটো চাকরে লোক, কত রকমের দরকার পড়তে পারে। আগে চাকরে বলতে ছিল তোর দাদু, সে তো আজ চব্বিশ বছর আগের কথা। তোর ফোনটোন যা আসত ওপরে, ওরা ডেকে দিত।’
খাওয়া থামিয়ে অনীশ বলল, ‘বলাকার ডেলিভারি এখানেই নার্সিং হোমে হবে। বংশের কার কোথায় হয়েছে ওসব নিয়ে চুরাশি বছরের একটা লোক কী বলল না বলল তাই নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। দাদুকে চুপ করে থাকতে বোলো। যা শুনলুম তাতে লজ্জায় মাথাকাটা যায়।’
অনীশের থমথমে মুখে, গাঢ় গলায় বলা কথাগুলো শুনে ভারতী স্বর নামিয়ে বলল, ‘বলেছি তো, আপনি এ ব্যাপারে মাথা ঘামাবেন না, বললেই কী শোনেন, আমাকে বললেন ফ্ল্যাট থেকে বার করে দোব।’
‘হুঁ উউউ,’ অনীশ গম্ভীর হয়ে গেল। খাওয়া শেষ করে ঘরে গিয়ে দু—মিনিট পর বেরিয়ে এল, হাতে নোটের গোছা।
‘এই নাও দু—হাজার, মাসে মাসে যা দিচ্ছি তার সঙ্গে আরও দু—হাজার করে দেব। দাদু যা যা খরচ করে সেই সেই খরচ তুমি এই টাকা থেকে করবে। কুলোবে?’
ভারতী ঘাড় নাড়ল, ‘হয়ে যাবে।’
‘দেখি বিষদাঁত ভাঙে কিনা।’ বলে অনীশ ঘরে ফিরে গেল।
পুলিন ফিরে আসামাত্র ভারতী হাতছানি দিয়ে ডেকে তাকে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করল।
‘কী ব্যাপার!’
পুলিনকে একটার পর একটা শিহরন জাগিয়ে ভারতী সন্ধ্যা থেকে যা যা ঘটেছে সংক্ষেপে দ্রুত বলে গেল নীচু স্বরে।
‘ছি ছি ছি বাবা এভাবে বললেন। এখন তো ছেলের বউয়ের কাছে মুখ দেখানো দায় হয়ে উঠবে। টাকাটা মনে হচ্ছে বউমাই দিয়েছে।’
‘আমারও তাই মনে হচ্ছে, টাকাগুলো এখন রাখি কোথায়। এখন ও ঘরে গিয়ে আলমারি খুলে টাকা রাখতে পারব না। বাবার ঘরেও রাখা যাবে না।’
‘আঁচলে ভালো করে বেঁধে নাও। শুতে এমন কিছু অসুবিধে হবে না। কাল আলমারিতে তুলে রেখো।’
পরদিন টেলিফোনের তার রাস্তা থেকে বাড়ির গা বেয়ে উঠল। রিসিভারটা রাখা হল অনীশের ঘরে টেবলের উপর। কাশীনাথ বারান্দায় দাঁড়িয়ে টেলিফোন মিস্ত্রিদের কাজ নীরবে দেখল, পরীক্ষা করার জন্য একজন লাইনম্যান নীচে থেকে ফোন করল। ঘরের রিসিভার বেজে উঠতে ভারতী আর পুলিন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ভারতীই বলল, ‘তুমি ধরো।’
পুলিন রিসিভার তুলে বলল ‘হ্যালো’।
‘ঠিক শুনতে পাচ্ছেন তো?’
‘পাচ্ছি।’
‘আপনার টেলিফোন নম্বরটা অফিস থেকে আজই জানিয়ে দেবে, এখন রাখুন।’
রিসিভার রেখে পুলিন উত্তেজিত মুখে ভারতীর দিকে তাকাল। সে এই দ্বিতীয়বার ফোনে কথা বলল, তাও আট বছর পর। অনীশের এক বন্ধু ফোন করেছিল। প্রণববাবুর ছেলে নেমে এসে খবর দেয়। অনীশ বাড়ি ছিল না, পুলিন উপরে গিয়ে ফোনে কথা বলেছিল।
‘বেশ সুন্দর, রংটা পাকা টমেটোর মতো!’ ভারতী সন্তর্পণে আঙুল দিয়ে রিসিভারটা ছুঁয়ে লাজুক স্বরে বলল, ‘আমি কখনো ফোনে কথা বলিনি।’
‘বলো না। কার সঙ্গে কথা বলবে?’
‘কারোর নম্বরই তো জানি না। জানলে অনির সঙ্গে কথা বলতুম।’
‘এবার থেকে একটা নোট বইয়ে সবার নম্বর লিখে রেখে দিতে হবে। অনির অফিসের, বউমার অফিসের, অনির শ্বশুর বাড়ির।’ থেমে গেল পুলিন। সে আর কাউকে পেল না যাকে ফোন করা যায়।
ভারতী বলল, ‘এ বাড়িতে এই নিয়ে চারটে ফোন হল।’
বিকেলে কাশীনাথকে চা দিয়ে ভারতী বলল, ‘ফোনটা দেখেছেন বাবা, ভারি সুন্দর রংটা। দেখুন না গিয়ে।’
‘তোমরা দ্যাখো। টেলিফোন একটা দেখার জিনিস নাকি, কলকাতা শহরে অমন হাজার হাজার আছে’। কথাটা বলে কাশীনাথ চায়ে চুমুক দিল। ভারতীর মুখের ঔজ্জ্বল্য মলিন হয়ে গেল।
পয়লা তারিখেই গুহ এস্টেটের সরকার বিমানবাবু সকাল দশটায় প্রতি মাসের মতো কলিংবেল বাজাল। দরজা খুলে পুলিন অন্যান্যবারের মতো বলল, ‘দাঁড়ান।’ এরপর এত বছর যা করেছে—কাশীনাথের কাছে গিয়ে বলা, ‘বাবা ভাড়া নিতে এসেছে’—তা না করে সে ভারতীর কাছে গিয়ে বলল, ‘ভাড়ার টাকাটা দাও।’
ভাড়ার টাকা নিয়ে বিল দিয়ে ব্যস্ত বিমানবাবু চলে গেল। অন্যান্য ফ্ল্যাট আর নীচের দোকানগুলো থেকে তাকে ভাড়া নিতে হবে। বিলটা ভারতীকে দিয়ে পুলিন বলল ‘আলমারিতে রেখে দাও, বাবাকে বলার দরকার নেই। দশরথের মায়ের মাইনেটা আজই দিয়ে দিয়ো।’
