‘অনির মুখ কার মতো হোক চেয়েছিলে?’
‘ওর মায়ের মতো।’
ভারতী পুলিনের বাহুতে চিমটি কেটে বলল, ‘মিথ্যে কথা এই বুড়ো বয়সে আর বোলো না।’
‘বলব না কেন, অনির মাকে তার শ্বশুর পছন্দ করেছিল তো মুখ আর রং দেখে। বাবা কিন্তু বলাকাকে কেন জানি একদম পছন্দ করেন না। ভয় হয় কোনোদিন কী ফট করে ওকে বলে বসেন।’
ভারতী বলল, ‘বুঝতে পারি না অনি কী দেখে বলাকাকে পছন্দ করল, মনে হয়তো দু—জনে সমবয়সি।’
পুলিন বলল, ‘আমারও মনে হয়েছে কী করে পছন্দ করল, বোধহয় চাকরি করে বলে, এখন তো ব্যাঙ্কের মাইনে ভালো।’
ক্ষুব্ধ স্বরে ভারতী বলল, ‘তুমি বলছ টাকার লোভে অনি বিয়ে করেছে?’
পুলিন লজ্জিত স্বরে বলল, ‘আরে না না তুমি ওইভাবে দেখছ কেন, কখন কী হয়ে যায় মানুষের কেউ কী তা বলতে পারে, বউ স্বাবলম্বী হলে বউ ছেলেমেয়ে বিপদে পড়বে না। অনি ভালোই করেছে।’
কিছুক্ষণ দু—জনে চুপ থাকার পর ভারতী বলল, ‘মনে হয় বউমার বাচ্চচা হবে।’
পুলিন কথা বলল না। ভারতী পিঠ ফিরিয়ে চোখ বন্ধ করল।
বলাকার সন্তান প্রসবের কুড়ি দিন আগে বিরোধের মেঘ ঘনিয়ে উঠল। বিকেলে কাশীনাথ পুত্রবধূকে ডেকে জানতে চাইলেন, ‘নাতবউয়ের বাড়ির লোকেদের বলেছ মেয়েকে নিয়ে যেতে।’
‘কেন বাবা?’ ভারতী হঠাৎ এমন একটা কথায় অবাক হল।
‘কেন কী! মেয়েদের প্রথম সন্তান বাপের বাড়িতে হয়। পুলিন হয়েছিল, আমিও হয়েছি। তুমি কোথায় হয়েছ?’
‘হাসপাতালে, তবে আমি প্রথম সন্তান নই। দাদা হয়েছে মামার বাড়িতে কোতরংয়ে।’
‘তবে! অনিকে বলো শ্বশুরবাড়িতে জানাতে। ওদেরও তো দায়দায়িত্ব আছে প্রথম মেয়ের প্রথম সন্তান। ওদের তো নিজের থেকে বলা উচিত।’
শ্বশুরের কথাটা ভারতীর মনে ধরল। সন্ধ্যায় শ্যামনগর থেকে বলাকা ফিরে আসার পর যখন সে গা ধুয়ে ঘরে এসেছে তখন ভারতী পরোটা আর তরকারির প্লেট ছোট্ট টেবলটায় রেখে বলল, ‘বউমা তোমার মা কী বলেছেন কোথায় ডেলিভারি হবে?’
বিস্মিত চোখে বলাকা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ‘কেন, নার্সিং হোমে হবে! যে ডাক্তারকে দেখাচ্ছি তিনি ‘পরিচর্যা’ নার্সিং হোমের সঙ্গে অ্যাটাচড, ওখানেই ভরতি হব।’
শুনে থিতিয়ে গেল ভারতী। নার্সিং হোমের ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই তাহলে করে রাখা হয়েছে অথচ সে তা জানে না। ব্যবস্থাটা নিশ্চয় অনিই করেছে, তাকে একবার বলতেও তো পারত।
‘প্রথম সন্তান, বাপের বাড়িতে হলে ভালো হত।’
পরোটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলাকা বলল, ‘একই ব্যাপার। বাড়িতে তো এখন আর হয় না, হয় হাসপাতালে বা নার্সিং হোমে। সেটা টালিগঞ্জে না হয়ে শ্যামবাজারে একই কথা। সাত তারিখ থেকে দেড় মাসের ছুটি নিচ্ছি।’
ভারতীর মনে হল, বলাকার যুক্তিও ফেলে দেবার মতো নয়, ‘একই কথা’। ডেলিভারির পর বাপের বাড়ি গিয়ে থাকতে পারে। মা আছে, দুই বোন আছে যত্ন আত্তিতে কার্পণ্য হবে না। বাচ্চচা নাড়ানাড়ি তার থেকে বলাকার মা বেশি করেছেন।
কাশীনাথ আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘বলেছ বউমা?’
‘বলেছি। শ্যামবাজারে নার্সিং হোমে ডেলিভারি হবে।’
ভারতী ভাবতে পারেনি কথাটা শুনে কাশীনাথ রাগে জ্বলে উঠবে। গলা চড়িয়ে সে বলে উঠল, ‘না হবে না, হবে না, আমি বলছি হবে না। এ বংশের বউয়েরা প্রথম সন্তান বিইয়েছে তাদের বাপ—মায়ের কাছে। তুমিও তো বাপের বাড়ি গিয়ে থেকেছিলে, সেখান থেকে তোমার বাবাই মেডিকেল কলেজে ভরতি করায়। প্রথমবার বাপের বাড়িতে থাকাটাই আমাদের নিয়ম। বিয়োতে গিয়ে যদি মরে তাহলে বাপ—মা আমাদের দুষতে পারবে না।’
ভারতী বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এসব কী অলুক্ষুণে কথা বলছেন!’
কাশীনাথ প্রায় চিৎকার করে উঠল ‘ঠিকই বলছি, আমার পিসি মরেছে, একমাত্র বোনও মরেছে। এসব তো তুমি জান না।’
গলা চেপে ভারতী বলল, ‘বাবা আস্তে বলুন, ও ঘরে বলাকা রয়েছে শুনতে পাবে।’
‘শুনবে পাবে পাক, আমি ভয় করি নাকি।’
স্বর প্রখর করে ভারতী বলল, ‘কাউকে আপনার ভয় করতে হবে না, বলাকার ডেলিভারি ও যেখানে চাইছে সেখানেই হবে, আপনি মাথা গলাবেন না।’
‘বটে, তুমিও দলে ভিড়ে গেছ!’
‘বলাকা আমার ছেলের বউ, ওর শাশুড়ি আমারও মতামত দেবার অধিকার আছে আর সেটা আপনার থেকে বেশিই আছে।’
চশমার পিছনে কাশীনাথের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। দাঁত চেপে একান্ন বছর বয়সি পুত্রবধূকে বলল, ‘বেশিই আছে, অধিকার বেশিই আছে! বেরোও ঘর থেকে, আর একটা কথা বললে এই ফ্ল্যাট থেকে বার করে দোব।’
ভারতী কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চেয়ারে বসে রইল গুম হয়ে। একবার তাকাল বলাকার ঘরের দিকে। ঘরে পাখা ঘুরছে, পর্দাটা কেঁপে কেঁপে উঠছে, আলো জ্বলছে, বোধহয় কিছু একটা পড়ছে। নিশ্চয় কাশীনাথের চেঁচিয়ে বলা কথাগুলো কানে গেছে। কোনো একটা ছুতো করে ঘরে গিয়ে বলাকার মুখের ভাবটা এখন কেমন দেখার ইচ্ছে হল ভারতীর।
‘বউমা’ বলে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকল ভারতী। আয়নার সামনে বসে চুল এলিয়ে বলাকা চিরুনি চালাচ্ছে মাথা থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত। মুখ ফিরিয়ে তাকাল সে।
‘কাল তোমায় টিফিনের জন্য পরোটা করে দোব, রোজ রোজ পাঁউরুটি একঘেঁয়ে লাগে না? কেমন হয়েছে আজ পরোটা? এক একদিন এক একরকম খেলে মুখের অরুচিটা কাটাবে। লেবুর আচার খানিকটা দিয়ে দোব, আর ঝালঝাল আলু পেঁয়াজের চচ্চচড়ি।’
