বিকেলে ছাদে পায়চারি করে নেমে আসতেই ভারতী চা দিয়ে কাশীনাথকে বলল, ‘বাবা এখন কিছু খাবেন?’
শ্বশুরকে নরম অবস্থায় পাওয়ার জন্য কী করতে হবে ভারতী তা জানে। যেসব মুখরোচক খাদ্য বা কুখাদ্য পঞ্চাশ—ষাট বছর আগে খেয়েছিলেন স্মৃতি থেকে সেগুলো এখন টেনে বার করাই তার শখ।
‘খিদে তেমন এখন পাচ্ছে না। বাড়িতে পলতা আছে?’
‘নেই।’
‘থাকলে বলতুম ব্যাসন দিয়ে পলতার বড়া ভেজে দাও। পুলিনকে কাল বাজার যাওয়ার সময় বলে দিয়ো যেন কাঁকড়া আনে, কোম্পানির বাগানের কাছে ফটিকের দোকানে লঙ্কা মাখানো লালরঙের কাঁকড়া ভাজা পাওয়া যেত, যেমন ঝাল তেমনি টেস্ট। ওর দোকানটা মোদো মাতালের আড্ডা ছিল। কাছেই তো রামবাগান!’
ভারতী শুনেছে রামবাগান বেশ্যাপাড়া। দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল তার মাথায়। ‘বাবা আপনি রামবাগানে মাতালদের দোকানে গিয়ে খেতেন?’
ভারতীর চোখেমুখে গলার স্বরে বিস্ময় ভেঙে পড়ল। কাশীনাথ তাই দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘রামবাগানে কে বলল, কোম্পানি বাগানের কাছে বলেছি। আমি তো একদিন মাত্র বিকেলে কিনে খেয়েছি, আমার সঙ্গে বাদু আর সত্যও ছিল। মাতালরা তো বিকেলে আসত না, সন্ধের পর আসত।’
কটুভাষী বদরাগী শ্বশুরকে এভাবে কৈফিয়ত দিতে দেখে ভারতী বুঝে গেল সর্বদা উঁচিয়ে থাকা ওর আক্রমণের অস্ত্রগুলো এখন নীচে নেমে গেছে। সে সুযোগটা নিয়ে বলল, ‘বাবা, একটা কথা বলব। অনির বিয়ে হলে আমাদের দু—জনের রাতে শোয়ার অসুবিধা হবে সেটা তো জানেন।’
‘জানিই তো।’
‘এই ঘরেই মেঝেতে শুতে হবে এইটুকু ফালি জায়গায়। তাই বলছিলুম কী খাটটা যদি ইট দিয়ে একটু তুলে দেওয়া যায় তাহলে কিছুটা জায়গা বেরোবে। অনেকের বাড়িতেই তো এভাবে শোয়।’ ঝুলি থেকে বেড়ালটা বার করে ভারতী দুরুদুরু বুকে তাকিয়ে রইল।
‘পারবে ওভাবে দু—জনে শুতে? যদি পারো তাহলে তুলে দাও, শুধু তো রাতটুকু থাকা।’
হাঁফ ছেড়ে ভারতী বলল, ‘কালই পলতার বড়া আপনাকে খাওয়াব। কিন্তু বাবা, কাঁকড়া কী করে ভাজতে হয় আমি জানি না।’
‘জান না! ঠিক আছে অন্যভাবে রাঁধো। তোমার শাশুড়ি কাঁকড়া বানাত লাউ চিংড়ির মতো। পুলিনকে বোলো কাল একটা লাউও আনতে।’
‘সে তো কালকের ব্যাপার, এখন কী খাবেন?’ ভারতী খুশি চাপতে চাপতে বলল। ইট এখন সে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে পারে। চিড়ে ভাজা করে দোব? পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, চিনে বাদাম, ধনেপাতা, গোলমরিচ গুঁড়ো দিয়ে?’ ভারতী দু—সেকেন্ড থেমে বলল, ‘শশা আছে দোব? ঝুরি ভাজাও আছে।’
ভারতী দেখল তার চুরাশি বছর বয়সি শ্বশুরের গলার কণ্ঠা নড়ে উঠল।
বলাকার সঙ্গে মানিয়ে নিতে কোনো অসুবিধে হয়নি ভারতীর কেননা শাশুড়িদের মতো বিধিনিষেধ আরোপ বা বউয়েদের করণীয় কাজ সম্পর্কে সে কখনো একটি কথাও বলেনি। সে জানে মেয়েটি চাকরি করে, প্রায় আট—ন ঘণ্টা বাইরে থাকে, লেখাপড়া করেছে। হাসে না, কথা কম বলে এবং যথেষ্ট পরিণত। বলাকা যতক্ষণ ফ্ল্যাটে থাকে নিজের ঘরেই বেশিরভাগ সময় থাকে। সে অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘরটার দখল পায় পুলিন আর ভারতী।
প্রায় তিরিশ বছর যে ঘরে দু—জনে দিনরাত বাস করেছে, সে ঘরকে তারা বলে এসেছে ‘আমাদের ঘর’ সেই ঘরই এখন তাদের কাছে অন্যরকম লাগে। এটা এখন ‘ওদের ঘর’। অভ্যাস বশে ভারতী একবার ঢুকে পড়েছিল, বলাকা তখন গা ধুয়ে খাটে লম্বা হয়ে শুয়ে ট্রেনে কেনা ম্যাগাজিন পড়ছিল। মুখের সামনে থেকে সেটা নামিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে শুধু তাকায়। অপ্রতিভ ভারতী তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছে।
ঘরের কাঠের আলমারিটা ছিল ভারতীর শাশুড়ির, সেটাই সে তিরিশ বছর ধরে ব্যবহার করে এসেছে, এটাকে ঘর থেকে বার করে নেওয়া হয়নি কেননা আর কোথাও রাখার জায়গা নেই। এখনও তার আর পুলিনের এবং কাশীনাথেরও জামাকাপড় তাতে রয়েছে। অনীশ আয়না লাগানো একটা স্টিলের আলমারি থেকে বার করা দরকার। ইতস্তত করে ভারতী ঘরে ঢুকে চাবি দিয়ে পাল্লা খুলে জিনিসটি বার করে নিয়েই দ্রুত বেরিয়ে এসেছে। তার তখন মনে হয় নিজেকে অনধিকারীর মতো।
দুপুরে ওদের ঘরের খাটে পুলিন আর ভারতী পাশাপাশি শুয়ে সকাল থেকে দাঁড়ানো, চেয়ারে বসা আর হাঁটাচলা করা শরীরকে বিশ্রাম দেয়। এমনই এক দুপুরে ভারতী বলে, ‘মনে হচ্ছে না চুরি করে অন্যের ঘরে শুয়ে আছি।’
পুলিন বলে, ‘ঘরের কোনো জিনিসে হাত দিতে ভয় করে। এধার—ওধার হলে ধরে ফেলতে পারে বউমা, আর তখন যদি দুটো কথা শোনায়! অবশ্য জানি কিছু বলবে না, তেমন মেয়ে নয় তাহলেও—।’
‘তাহলেও কী?’
‘তাহলেও কেন জানি মনে হয় হয়তো বলবে এবার থেকে ঘরে তালা দিয়ে বেরোব।’
ভারতী বলল, ‘তুমি একটু বেশি বেশি ভাব। বউমা মোটেই ওরকম মেয়ে নয়। অত্যন্ত ভদ্র আমাকে সম্মান দিয়ে কথা বলে, সংসারের কোনো ব্যাপারে নাক গলায় না।’
পুলিন বলল, ‘বড্ড গম্ভীর, ভালো করে কথা বললেও মনে হয় যেন অসন্তুষ্ট হয়ে কথা বলছে। বোধহয় নানা ধরনের লোকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এমন গলা হয়ে গেছে। ব্যাঙ্কের চাকরি তো।’
ভারতী বলল, ‘গম্ভীর মনে হয় ওর মুখটার জন্য। ছেলেমেয়েরা যেন মায়ের মুখ না পায়।’
‘আমি কিন্তু মায়ের মুখ পেয়েছি, গায়ের রংটাও, বাবা তাই চেয়েছিলেন।’
