বিরাট আশা ছিল কাশীনাথের ব্যবসা করে পুলিন ধনী হবে নামি হবে। আশাভঙ্গের যন্ত্রণা সে শোষণ করে নিতে পারেনি, যন্ত্রণা সে ফিরিয়ে দিয়েছে পুলিনকে। তার দৃঢ় ধারণা বা বদ্ধমূল বিশ্বাস ছেলে তাকে ঠকিয়েছে, তার প্রত্যাশার অবমাননা করেছে, মমতাহীন ছিল সে পুলিনের প্রতি। ভারতীর জন্য বরাবরই একটা চাপা স্নেহ সে লালন করে এসেছে। নিজে পছন্দ করে যাকে ঘরে এনেছে সে কখনো মন্দ হতে পারে না, তার কোনো খুঁত থাকতে পারে না এমন একটা আত্মম্ভরিতা সে পোষণ করে।
কাশীনাথের সবথেকে দুর্বল জায়গা তার নিজের চেহারা। সে জানে হাস্যকরভাবে সে অসুন্দর। একবার হাওড়ায় যাচ্ছিল বাসে কাজে যোগ দিতে। বাসে একজনের পকেটমার হয়। সারা বাস পকেটমার সন্দেহে তার দিকেই তাকাতে থাকে। বাস থেকে নামিয়ে তার শরীর তল্লাসি করেছিল তিনজন। ভিড় জমে যায়। সেদিনের অপমান আর লজ্জা এখনও সে বহন করে চলেছে। তার ধারণা এটা ঘটেছিল তার চেহারার জন্য। এইজন্য সে উপেক্ষিত হয় লোকবহুল অনুষ্ঠানে এবং কর্মস্থলেও।
অনীশের স্কুলের বা কলেজের বন্ধুরা প্রায়ই আসত। তারা এলেই ছুতো করে কাশীনাথ বেরিয়ে যেত গুহ ভবন থেকে। অনীশ এটা লক্ষ করে একদিন বলেছিল, ‘দাদু আমার বন্ধুরা এলেই দেখেছি, তুমি বেরিয়ে যাও, কেন?’
কাশীনাথ দুর্বল একটা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে বলেছিল, ‘কে বলল তোর বন্ধুরা এলেই বেরিয়ে যাই। বাইরে কী আমার কাজকম্ম থাকতে পারে না? তোদের কথার মধ্যে আমি বসে থেকে কী করব। তার থেকে বরং ওই সময় লন্ড্রি থেকে কাপড়গুলো আনা যায়। সেদিন কলঘরের টিউবলাইটটা কিনতে বেরিয়েছিলুম।’
বাইরের কেউ উপেক্ষা বা অবজ্ঞা করলে কাশীনাথ তা সহ্য করতে পারে না।
অনীশের এক কলেজের বন্ধু তার খোঁজে প্রথমবার এসে দরজা খুলেই দাঁড়ানো কাশীনাথকে বলেছিল, ‘অনীশ আছে?’ কাশীনাথ বলেছিল, ‘বেরিয়েছে।’ বন্ধুটি ইতস্তত করে বলে, ‘খুব দরকার ছিল, এই বইটা ওকে দিয়ে দেবেন রেয়ার দামি বই, হারাবেন না যেন। আর বলবেন আজ বিকেলে যেন অবশ্যই কফি হাউসে অপুর সঙ্গে দেখা করে।’ এই বলে অনীশের বন্ধু মোটা একটা পুরোনো বই কাশীনাথের হাতে দিল। ঠিক তখনই ভিতর থেকে পুলিন উৎসুক মুখে বেরিয়ে আসে। তাকে দেখা মাত্র অনীশের বন্ধু কাশীনাথের হাত থেকে বইটি প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে পুলিনকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনি কি অনীশের বাবা?’ পুলিন ‘হ্যাঁ’ বলতে সে বইটা পুলিনের হাতে দিয়ে বলে, ‘এটা অনিশকে দিয়ে দেবেন, ও চেয়েছিল। ছেঁড়াখোড়া বই একটু যত্ন করে রেখে দেবেন। আমার নাম অপু, বিকেলে কফি হাউসে থাকব, ও যেন আমার সঙ্গে দেখা করে।’ যাবার আগে বন্ধুটি আবার বলল, ‘বইয়ের অনেক পাতা খোলা রয়েছে, আপনি যেন খোলাখুলি করবেন না।’
তরুণটি চলে যাবার পরই কাশীনাথ রাগে ফেটে পড়ল।
‘আপনি কি অনীশের বাবা?’ অনীশের বন্ধুর গলা নকল করে ভেংচে ওঠে কাশীনাথ। ‘আমাকে বিশ্বাস করল না। অনির সঙ্গে আমার চেহারার মিল নেই তাই করল না।’
এর পাঁচ বছর পর অনীশের হবু শ্বশুর শিবেন ভট্টাচাযকে তার স্ত্রী ও মেয়ের সামনে কাশীনাথ বলে দেয়, ‘বরের বাড়ি যেমন চাইবে তেমনভাবেই বিয়ে হবে।’
বিয়ে অবশ্য তেমনভাবে হয়নি। অনীশ যেমন চেয়েছিল সেইভাবেই হয়। পুলিন ও ভারতী আর বরের সঙ্গে বরযাত্রী হয়ে প্রণববাবু, উমার দুই ভাইও টালিগঞ্জে যায় ভাড়া করা মিনিবাসে, কাশীনাথ একা ছিল ফ্ল্যাটে। বউভাতেও সারা গুহভবন মায় দারোয়ান ও ঠিকে ঝি পর্যন্ত বাড়ির আধ মাইল দূরে ভাড়া নেওয়া ‘মিত্রা হাউসে’ নিমন্ত্রণে যায়, কাশীনাথ থেকে যায় ফ্ল্যাটে একা।
‘যাব না। আমার ইচ্ছে। আর কিছু বলার আছে?’ তিনটি বাক্যে কাশীনাথ বুঝিয়ে দিয়েছিল তাকে নড়ানো যাবে না সিদ্ধান্ত থেকে। কেউই তাকে জোরাজুরি কী মিনতি পর্যন্ত করেনি।
তারা রাত্রে কোথায় শোবে? প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে খুঁজতে শেষপর্যন্ত বউভাতের এক সপ্তাহ আগে ভারতী হাল ছেড়ে দিয়ে বলে, ‘বাবার খাটের পাশে, যেখানে ফোল্ডিং খাটে অনি শোয়, সেখানেই মেঝেতে শোব, কী আর করা যাবে! ইট দিয়ে ওনার খাট উঁচু করতে রাজি না হলে তখন কষ্ট করে রাত কাটানো ছাড়া আর উপায় কী?’
পুলিন বলেছিল, ‘ইটের কথাটা বাবাকে বলে দ্যাখো। ওখানে যদি শুতে হয় তাহলে সাইজমতো তোশক করাতে হবে। এতবড়ো বালিশগুলো জায়গাটায় আঁটবে না।’
‘দোকান থেকে রেডিমেড কিনে আনো। আমাদের পুরোনো বালিশে নতুন ওয়াড় পরিয়ে আপাতত ওরা কাজ চালাক। অনি বলেছে আস্তে আস্তে সব নতুন করে নেবে। দরজা জানলায় পর্দাও ঝোলাবে। খাওয়ার টেবিলটা বাঁদিকে একটু সরাতে হবে ফ্রিজ রাখার জন্য। নতুন টিভিটা আমি বলি কী ওদের ঘরেই থাকুক। কেবলওয়ালাকে তুমি বলে রেখো লাইন নোব। বাবার ঘরেরটা যেমন আছে তেমনই থাকুক।’
পুলিন শিউরে উঠে বলে, ‘ওরে বাবা, এই সেটটা তো ওনার স্মৃতিস্তম্ভ। নড়ানড়ির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ফ্রিজ, কালার টিভির কথা কিচ্ছু এখন ওকে বোলো না। আগে ইটের কথাটা পেড়ে দেখো কী হয়!’
সাইকেলের ধাক্কা খাওয়ার পর কাশীনাথ গুহ ভবনের গেটের বাইরে একা যান না, শুধু মাসে একবার বাড়ি থেকে তিনশো গজ দূরের ব্যাঙ্কে পেনশন তুলতে যান, সঙ্গে থাকে পুলিন কেননা সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যুটা পার হতে হয়। ট্র্যাফিক পুলিশ গাড়ি থামিয়ে ওকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করে।
