‘এখন ধূপগুলো যা হয়েছে, একটা গোটা দেশলাই খরচ হয়ে যায়।’
‘রোজ জ্বালেন?’
‘প্রতি শুক্কুরবার জ্বালি, এই বারেই উনি মারা গেছেন।’
বাবার মৃত্যুর তারিখটা তার মনে আছে কিন্তু বার কী ছিল মনে নেই। তারিখটা এলে বাবাকে মনে পড়ে। ছড়ানো এলোমেলো কিছু ছবি, কিছু ভঙ্গি,…থালায় ভাত মাখার, জুতোয় ফিতে বাঁধার, রাস্তা দিয়ে হাঁটার। কিছু কথার… ‘পায়ের আঙুলে ময়লা কেন?’; পেনসিলটা দু—আধখানা করে দু—জনে নাও’; ‘রান্নাঘরটা এত নোংরা থাকে কেন?’ সেদিন অন্যদের কীভাবে বাবাকে মনে পড়ে তা জানে না, কেউ বাবার প্রসঙ্গ তোলে না। তাদের জীবনে আর যেন মানুষটির কোনো দরকার নেই। মা—ও কখনো কিছু বলে না।
অথচ এই ঘরে বাবাকে মনে রাখা হয়েছে। কিছু একটা দিয়েছেন যা মিনতি করের জীবনে গভীরভাবে শিকড় ছড়িয়েছে। কী সেটা? ভালোবাসা! বাবাও নিশ্চয় ওঁর কাছ থেকে পেয়েছেন। ব্যাপারটা সে ঠিকমতো বুঝতে পারছে না। আর কিছু জিজ্ঞাসা করাটাও উচিত হবে না।
‘চাকরি নেই তা হলে ভাড়া দেবেন কী করে, এখন চালাচ্ছেন কীভাবে?’
‘টিউশানি করছি, সকাল বিকেল রাত, খাওয়াটা চলে যায়।’
‘কিন্তু ভাড়া?’
‘আমি জানি না…কীভাবে যে দোব! উনি থাকলে আজ এসব চিন্তা করতে হত না।’
অনন্ত উঠে দাঁড়াল।
‘যাচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ। আমাকে আর আপনি করে বলবেন না, লজ্জা পাব।’
‘আমাকে তুলে দেওয়া হবে কি? আমি তো জানতাম না পরিমলবাবু এভাবে ঠকাবেন!’
‘দেখি কী করা যায়।’
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নিতাইকে সে খুঁজে পেল না। নন্দকিশোর তাকে দেখে চেঁচিয়ে বলল, ‘দেখবেন বাবু, আমার ভাইয়ের ছেলের কথাটা মনে রাখবেন।’
অঘোর এস্টেটে ফিরে এসে অনন্তকে অপেক্ষা করতে হল। ম্যানেজার অজয় হালদার ব্লাডপ্রেশারের রুগি, দুপুরে ঘণ্টা দুই ঘুমোন। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে অনন্ত জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাল। তখন সে গোপন একটা ব্যাপার জেনে ফেলার ধাক্কা সামলে নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে যায়। সে ঠিক করে ফেলে মিনতি করের কথা বাড়িতে কাউকে বলবে না।
তার আজকের অভিজ্ঞতার কথা সে অজয় হালদারকে বলল। তিনি চোখের ইশারায় দোতলার বৈঠকখানাকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘ওনাকে জানাতে হবে। নিতাইকে সরিয়ে অন্য কাউকে রাখা না—রাখার মালিক উনি। তবে এরকম যে চলছে সেটা আঁচ করে ঠারে ঠোরে ওনাকে বলেওছি কয়েকবার। যাই হোক পরিমলকে শেষ পর্যন্ত অ্যাটর্নিবাবুর পরামর্শে সরানো হল। এটা এমনি এক চাকরি প্রলোভন পদে পদে। সৎ মানুষকে অসৎ করে দেয়, দশ বছরে তিনজনকে সরানো হল। তুমি যেসব কথা খুলে জানালে এটাই দরকার। সৎ থাকবে তা হলে জীবনে উন্নতি করতে পারবে।’
কথাগুলো শুনতে শুনতে অনন্তের বুকের মধ্যে কাঁপন লাগল। সেসব কথাই বলেছে শুধু একটি ঘরের কথা বলেনি যেখানে বাস করে এমন একজন যে তার বাবাকে ভালোবাসত, আজও ভালোবাসে।
সে বিমর্ষ হয়ে বাড়ি ফিরল। জেনেশুনে এই প্রথম সে অসাধু হল। কেউ জানতে পারলে তাকে আর ভালো বলবে না। কাউকে বোঝাতেও পারবে না কেন সে মিনতি কর নামটা খাতাপত্রের বাইরে রাখতে চায়।
রাত্রে সাধন বিশ্বাসকে সে এন্টালির বাড়ির কথা বলল। তিনি যে ঠিক লোককেই কাজটার জন্য সুপারিশ করেছেন, লোক চেনার সেই বিরল ক্ষমতার গর্ব তার চোখেমুখে প্রতিফলিত হল। এবারও একতলার ঘরের কথাটা সে বলতে পারল না।
রাতে খাওয়ার পর হঠাৎই সে মাকে বলল, ‘বাবার কোনো ছবি নেই?’
‘আছে তো।’
‘কই দেখি?’
শীলা ট্রাঙ্ক খুলে কাপড় ঘাঁটাঘাঁটি করে ছবি বার করে আনল।
অনন্ত অবাক হয়ে দেখল সেই ছবিটাই যা আজ সকালে সে দেখেছে, তবে এটা আকারে অনেক ছোটো পোস্টকার্ড মাপের।
‘কবেকার তোলা?’
‘বিয়ের পর।’
‘রেখে দাও।’
সে দ্বিতীয়বার আর ছবিটার দিকে তাকায়নি।
ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে মনের মধ্যে একটা খচখচানি অনুভব করেছিল। সে তখন জানত না আজীবন এটা তাকে অস্বস্তি দেবে।
.
সাত
পরের মাসেই অনন্তের চাকরি পাকা হয়ে গেল। যে উদবেগ সে এবং তাদের সংসার কাঁটা হয়ে থাকত, সেটা আর নেই। এখন তারা নিরাপদ, এই বোধ তাদের স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছে পরিচিতের সঙ্গে মেলামেশায়।
অজয় হালদারের অবসর নেবার সময় হয়ে এসেছে, ব্লাডপ্রেশারের জন্য প্রায়ই কামাই করে। বাবার আমলের লোক, সমীরেন্দ্র তাই ওকে বসিয়েই মাইনে দেন। ওর কাজগুলো একে একে অনন্তের উপর এসে পড়তে লাগল। এতে সে খুশিই। অবসর সময় কীভাবে কাটাবে সেই সমস্যা অনেকটা মিটিয়ে দেয় বাড়তি কাজগুলো।
কর্মস্থল থেকে সে সোজা বাড়ি ফিরে আসে। সে সিনেমা দেখে না, আড্ডাও দেয় না যেহেতু তার বন্ধু নেই। মায়ের সঙ্গে সাংসারিক কথাবার্তা ছাড়া আর তার অবসর কাটাবার কিছু নেই।
ধুতি—শার্টের মতোই অঘোর এস্টেট থেকে বাড়ি প্রায় দেড়মাইল রাস্তা হেঁটে যাতায়াতের অভ্যাসটা সে ছাড়েনি।
আহিরিটোলার বাড়ির ভাড়া আদায়ে বা কর্পোরেশন অফিসে ট্যাক্স, ইলেকট্রিক অফিসে বিল জমা দিতেও সে হেঁটে যায়। হাঁটা তার কাছে নেশার মতো।
‘শরীর ফিট থাকে।’
‘তাই বলে রোজ রোজ এত হাঁটবি? এখন তো আর ট্রাম বাসের খরচ বাঁচাবার মতো অবস্থা নয়।’
‘না হলেই বা, খরচ না করলে যখন চলে তখন করব কেন, এ তো আর চাল নুন তেল নয়? হিসেব করে দেখেছি হাঁটলে আঠারো থেকে কুড়ি টাকার মতো সেভ হয়, বাড়িভাড়ার প্রায় ওয়ান—ফোরথ।’
