‘সত্যি সত্যিই তা হলে আনলে! ঠিক আছে সেদ্ধ করে দিচ্ছি তোমরা খেয়ো, আমি পারব না উপোস দোব।’
ভারতী কচু সেদ্ধ করে তেল নুন কাঁচালঙ্কা দিয়ে চটকে দলা পাকিয়ে রেখে ভাতের হাঁড়ি টেবলে বসিয়ে দিয়ে, গলা চড়িয়ে ঘরে শুয়ে কাগজ পড়া পুলিনকে উদ্দেশ করে বলল, ‘বাবা এলে ভাত বেড়ে দিয়ো। তুমিও খেয়ে নিয়ো। অনিকে নিয়ে আমি বেরোচ্ছি।’
‘বেরোচ্ছি মানে!’ খবর কাগজ হাতে পুলিন ঘর থেকে বিস্মিত মুখে বেরিয়ে এল। ‘এখন এগারোটার সময় কোথায় যাবে।’
বাচ্চচা অনিকে জুতো পরাতে পরাতে ভারতী বলল, ‘যেদিকে দু—চোখ যায় যাব। বুড়ো মানুষকে আমি শুধু কচুভাতে ধরে দিতে পারব না।’
‘শুধু কচুভাতে কেন? কাল বেগুন এনেছি কুমড়ো পটল আলু এনেছি। এসবই কি রেঁধে ফেলেছ কাল?’
‘কিছু আছে এখনও। ওগুলো রাঁধলে তুমি টাইট দেবে কী করে? ভাড়ার টাকাগুলো আলমারির ওপরের তাকে আছে, ওখান থেকে যা পারো কিনে এনে খেয়ো।’
দড়াস করে দরজা বন্ধের শব্দ পুলিনকে ভাবিয়ে দিল। ভারতীর মধ্যে এত রাগ থাকতে পারে সেটা জানা ছিল না তার। ছেলেকে নিয়ে এখন গেল কোথায়, এই বাড়িরই অন্য কোনো ফ্ল্যাটে না শ্যামসুন্দরের মন্দিরে? কোন ফ্ল্যাটে সে খোঁজ নেবে? দু—ঘরের ফ্ল্যাটে দুপুরবেলায় বাইরের স্ত্রীলোক এসে বসে থাকলে বাসিন্দারা যে বিরক্ত হবে এ বোধটা ভারতীর আছে। আর একটা জায়গার কথা তার মনে পড়ল, বাপের বাড়ি! এটা তার প্রথমেই ধরে নেওয়া উচিত ছিল।
পায়ে চটি গলিয়ে পুলিন বেরিয়ে পড়তে যাচ্ছে তখনই ফিরল কাশীনাথ। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সে ঘরে ঢুকে গেল।
দরজার কাছ থেকে পুলিন চেঁচিয়ে বলল, ‘টেবিলে ভাত আছে খেয়ে নিয়ো।’
জবাবে কাশীনাথ বলল, ‘বউমাকে দেখলাম ছেলেকে নিয়ে পার্কে বসে রয়েছে।’
পুলিন বেরোল তবে শ্বশুড়বাড়ির দিকে নয়, পাড়ার চিলড্রেন্স পার্কের উদ্দেশে। ঘিঞ্জি বসতবাড়ি সমৃদ্ধ এলাকার মধ্যে ওয়েসিসের মতো একচিলতে খোলা রেলিংঘেরা জমি। অল্প ঘাস আছে, মাঝখানে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ, পাঁচ বছর আগেও পার্কটি রেলিংঘেরা ছিল, এখন কোমর সমান ইটের পাঁচিল। চারদিকে চারটি কাঠের বেঞ্চ ছিল, এখন তা সিমেন্টের। তার একটিতে ভারতী বসে, অনি পাঁচিলের মাথা ধরে ঘুলঘুলিতে পা রেখে ওঠা যায় কী করে সেই চেষ্টায় ব্যস্ত।
‘একী! এখানে এভাবে বসে? লোকে দেখলে বলবে কী?’ পুলিন বিরক্ত ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, ‘চলো, বাড়ি চলো। খুব রাগ দেখানো হয়েছে, বাবা ফিরেছেন।’ অনিকে কোলে তুলে নিল পুলিন। ভারতী কথা না বলে থমথমে মুখে উঠে দাঁড়াল।
বাইরের দরজা ভেজানো। পুলিন পাল্লা ঠেলে ঢুকতে গিয়ে থমকে রইল। কাশীনাথ টেবলে বসে ভাত খাচ্ছে। ভারতী পিঠে ঠেলা দিয়ে বলল, ‘ঢোকো।’
দু—জনকে দেখে কাশীনাথ বলল, ‘বউমা ভাতে করলে কেন, পুলিন খুব ভালো কচুই এনেছে, বাটা করলে আরও ভালো খেতে লাগত। কাল বাটা কোরো।’
অনিকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছে পুলিন। কাশীনাথ হাত বাড়িয়ে ডাকল, ‘এসো দাদু একটু খেয়ে যাও।’
‘না।’ বলেই ভারতী টেনে নিল ছেলেকে।
কাশীনাথ অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ‘যে খাবার ওকে খেতে দেবে না সেটা বুড়ো শ্বশুরকে খেতে দেওয়া যায়! এ খাবার তোমরাও খাওনি তার বদলে বাইরে থেকে খেয়ে এলে।’
‘না আমরা বাইরে খাইনি।’ পুলিন জোরে প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করল কিন্তু গলার স্বর বসে গেল।
ভারতী ছুটে গিয়ে ভাতের থালাটা তুলে নিয়ে রান্নাঘরে যেতে যেতে বলল, ‘আর খেতে হবে না আপনাকে। ঘরে যা আছে তাই দিয়ে আপনাকে রেঁধে দিচ্ছি।’
কাশীনাথ মিট মিট করে ছেলের দিকে তাকিয়ে নীচু গলায় বলল, ‘হারামজাদা, জব্দ করবি ভেবেছিলিস? জব্দ করতে হলে ক্ষমতা থাকা চাই। তোর মতো অপদার্থ রামছাগলের কম্ম নয় কাশীনাথ রায়কে জব্দ করা।’ এরপরই গলা তুলে বলল, ‘কাল ইলেকট্রিক বিল জমা দেবার শেষ দিন। মনে করে টাকা নিয়ে যাবি।’
বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে পুলিন নিজের ঘরে ঢুকে গেল। কাশীনাথ উঠে রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
‘এই কুচুটে বুদ্ধিটা কার, তোমার?’
দুটো বার্নার জ্বালিয়ে ভারতী রাঁধছিল। মুখ না ফিরিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ। কাল—পরশুই গ্যাস দিয়ে যাবে, টাকাটা বার করে রাখবেন আর সারাদিন টোটো করে ঘুরে বেড়ানোটা বন্ধ করুন, ওভাবে ফ্ল্যাট খুঁজে বার করা যায় না।’
কাশীনাথ বলল, ‘ফ্ল্যাট খুঁজছি কে বলল?’
‘আমার কুচুটে বুদ্ধি বলল। এখানে আপনার অসুবিধেটা কী হচ্ছে?’
‘কিছুই হচ্ছে না, শুধু পুলিনটাকে সহ্য করতে পারছি না।’ বলেই কাশীনাথ তার ঘরে ফিরে এল।
এরপর কাশীনাথ তৈরি হতে থাকা বাড়ি খুঁজে বার করার জন্য আর কলকাতা চষে বেড়ায়নি। তার বদলে গুহ ভবনের তিন তলায় নিজের ঘর থেকেই ছেলে আর ছেলের বউ—এর জীবন নাজেহাল করে তোলায় ব্যস্ত থেকেছে বছরের পর বছর। বয়স যত বেড়েছে ততই রুক্ষ অযৌক্তিক হয়েছে তার আচরণ, বাজার খরচ বাদে সংসারের যাবতীয় খরচ মায় নাতির বিদ্যাশিক্ষার দায়ও সে বহন করে গেছে। একমাত্র সেই যে পরিবারের প্রধান পুরুষ এই অভিধাটিকে পুলিন ও ভারতীর চেতনায় ঢুকিয়ে দিতে দিনের পর দিন সে কঠিন কর্কশ বাক্যে, ক্রীতদাসদের প্রতি প্রভুর মতো ব্যবহারে, সুযোগ পেলেই পুলিনকে অপমানকর কথা বলে বুঝিয়ে দিয়েছে এই সংসার টিকে আছে তার দয়ায় তার টাকায়।
