‘জবাব দেননি, ঘুমের ভান করে রইলেন।’
শুনে কালো হয়ে গেল পুলিনের মুখ। বলল, ‘বিকেলে চা দেবার সময় একবার বোলো।’
কাশীনাথ বেরোবার জন্য ধুতি পাঞ্জাবি পাম্পশু পরে তৈরি। ভারতী চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকল।
‘বউমা কী যেন বলছিলে তখন?’ কাপটায় চুমুক দিয়ে কাশীনাথ তাকিয়ে রইল।
‘দোকান ঘরটা একজনকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আপনার ছেলে বলছিল এবার থেকে বাজারটা উনিই করবেন, আপনাকে আর টাকা দিতে হবে না।’ ভারতী আশা—নিরাশা মেশানো অনুভূতি নিয়ে অপেক্ষা করল।
‘ভালোই তো! পুলিন বড়ো হয়েছে, বাবাও হয়েছে, খরচ—খরচার সব দায়িত্ব তো ওরই নেওয়ার কথা। আমিও এইভাবে নিয়েছিলুম। তোমাদের ছেলেটিও ভবিষ্যতে নেবে। শুধুই বাজার করা, আর সব খরচ নেবে না কেন?’
ভারতী শ্বশুরের প্রথমদিকের কথায় আশান্বিত হচ্ছিল, শেষ বাক্যটিতে প্রমাদ গুনল। দু—হাজার টাকায় মাস চালানো হয়তো যায় কিন্তু সেটা হবে গরিবদের মতো। সামনের বছরই অনিকে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভরতি করাবে বলে তারা ভেবে রেখেছে। সেও একটা খরচ যা বছর বছর বাড়তে থাকবে, ভাড়ার টাকা আর বাড়বে না!
‘ভাড়ার টাকাটা এমন নয় যে সব কিছু খরচের দায় নেওয়া যায়।’
ভারতীর স্বরে প্রায় ভিক্ষুকের মিনতি, ‘বাকি সবকিছু আপনি যেমন দিচ্ছেন তেমনিই দেবেন।’
‘না, দোব না’।
ভারতী অবিশ্বাসী চোখে তাকাল। রূঢ় প্রত্যাখান সে আশা করেনি, তার চোখে জল এসে গেল।
‘বাবা তাহলে আমরা যে বিপদে পড়ে যাব।’
‘পড়লে পড়বে। যদি রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে যায় যাবে। ইলেকট্রিক লাইন যদি কেটে দেয় দেবে। ভাড়া বাকি পড়লে যদি মামলা হয় হবে। আমি আর কোনো কিছুর মধ্যে নেই।’
ভারতী মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে। খালি কাপ রেখে দিয়ে কাশীনাথ তার পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। ভারতী ডাকল, ‘বাবা। আমরা কী অপরাধ করেছি?’
থমকে দাঁড়াল কাশীনাথ। ‘তোমরা করোনি আমি করেছি। অপদার্থ পুত্রের জন্ম দিয়ে। আমার কষ্ট তোমরা বুঝবে না, ছেলে বড়ো হোক তখন টের পাবে।’ বলেই সে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেল।
ভারতীর মনে হল কাশীনাথ এমনভাবে ‘তখন টের পাবে’ কথাটা উচ্চচারণ করল যেন অভিশাপ দিল। অনি বড়ো হলে কী হবে, আর এক পুলিন? সে খাটের উপর ধীরে ধীরে বসে পড়ল। অনেকক্ষণ থম হয়ে থেকে সে ঠিক করে ফেলল অনিকে সে নিজে বড়ো করে তুলবে। সেজন্য শ্বশুরের সব গঞ্জনা সে সহ্য করবে। যত কষ্ট করতে হয় করবে, ছেলের গায়ে কষ্টের আঁচড়টুকু লাগতে দেবে না।
সেদিন রাতে পুলিন চারতলায় গেল প্রণববাবুর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি রেডিয়ো শুনছিলেন। পুলিনকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, ‘ব্যাপার কী?’
‘ব্যাপার কিছুই নয়, একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি। ভবানীপুরে আপনার ছাত্রের বাবাকে একটা কথা যদি বলে দেন তা হলে আমরা শান্তি পাব স্বস্তি পাব।’
‘কীরকম অনুরোধ?’
‘তিনি যেন বাবাকে ফ্ল্যাট বিক্রি না করেন। কেউ বুকিং ছেড়ে দিলেও যেন চিঠি দিয়ে বাবাকে না জানান। বাবার শরীর একদম ভালো নয়, একটা স্ট্রোকের মতো হয়ে গেছে, ডায়বিটিসও আছে। একা থাকবেন, যদি হঠাৎ কিছু হয়ে যায়, তখন কে দেখবে, কে ডাক্তার ডাকবে, কে হাসপাতালে নিয়ে যাবে? এসব কথা ভদ্রলোককে জানিয়ে দেবেন। বাবা এইসব কথা জানিয়েছে কিনা জানেন?’ পুলিন সাক্ষীকে জেরা করা উকিলের মতো তাকিয়ে রইল।
‘আমি বলতে পারব না কী জানিয়েছেন। তবে এইটুকু বলতে পারি লোকটি অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ, যা করবেন না বা পারবেন না তাই নিয়ে সময় নষ্ট করেন না। আপনার বাবার সঙ্গে পাঁচ মিনিটের বেশি কথা বলেছেন বলে তো মনে হয় না। তার মধ্যে অসুখবিসুখের কথা শুনবেন এমন লোক উনি নন। যাই হোক চা খাবেন?’
পুলিন মনে মনে আশ্বস্ত বোধ করছে। বাবা মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ছেলেবউয়ের নামে নিন্দে মন্দ করে ফেলতে পারবে না। এজন্য কম করে মিনিট পনেরো কথাবার্তা আর শ্রোতার আগ্রহ থাকা দরকার, দুটোই নিশ্চয় পাননি।
চা খেয়ে ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের কট্টর ভক্ত প্রণবের সঙ্গে মোহনবাগান সমর্থক, যদিও কখনো খেলা দেখতে ময়দানে যায় না, পুলিন কলকাতার ফুটবলে কে সেরা তাই নিয়ে কিছু তর্কাতর্কি করে সময় কাটিয়ে নীচে নেমে আসে।
‘কথা বললুম প্রণববাবুর সঙ্গে, নিশ্চিন্ত থাকতে পার বাবা আমাদের সম্পর্কে কিছু বলেননি। ওহহ কী ভয়েই না ছিলুম।’ পুলিন রাত্রে খাবার টেবিলে বসে নীচু গলায় বলে। ভারতী কোনোরকম আগ্রহ দেখাল না এই নিয়ে কথা বলায়। পুলিন তাইতে আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘আমার কথাটা কী শুনতে পেলে না?’
‘পেয়েছি।’
ঘুমন্ত অনিকে কলঘর থেকে ঘুরিয়ে এনে বিছানায় শুইয়ে ভারতী ভূমিকা না করেই বলল, ‘বাবা বলেছেন আর সংসারের খরচ দেবেন না। তোমাকেই সব টানতে হবে।’
ধড়মড়িয়ে উঠে বসল পুলিন।
‘সব খরচ মানে?’
‘সব খরচ মানে সব খরচ। ঝিয়ের মাইনে থেকে গ্যাসের দাম, কাগজের দাম, ইলেকট্রিক বিলও।’ নিস্পৃহ গলায় বলল ভারতী। অন্ধকারে স্ত্রীর মুখটা দেখার ব্যর্থ চেষ্টা করে পুলিন বলল, ‘এইভাবে টাইট দিচ্ছেন। ঠিক আছে আমিও দোব। কাল থেকে সবাই কচু ভাতে ভাত খাব, বাবাকেও তাই দিয়ো।’
‘আমি নয় তুমি দিয়ো। তবে বলে রাখছি অনিকে কচু ভাতে কিন্তু খাওয়াতে পারব না।’
পরদিন পুলিন বাজার থেকে আর কিছু না কিনে মানকচুর একটা দু—কেজির খণ্ড কিনে আনল। দেখে হতভম্ব হয়ে গেল ভারতী।
