‘একটু কাজে বেরিয়েছিলুম। আপনি চললেন কোথায়, কলেজে?’
‘হ্যাঁ, তিনটের সময় ক্লাস।’ প্রণববাবু দক্ষিণ কলকাতায় একটি কলেজে বিজ্ঞানের শিক্ষক।
‘পুলিনবাবু একটা কথা জিজ্ঞাসা করব। আপনার বাবা কি এখান থেকে চলে যাবেন?’
হতভম্ব পুলিন শুধু বলল, ‘তার মানে!’
‘এমনিই বললাম, আমার এক ছাত্রকে পড়াতে যাই ভবানীপুরে। ছাত্রটির বাবা ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি করে বিক্রি করেন। পরশু পড়াতে গেছি দেখি আপনার বাবা ছাত্রের বাড়ি থেকে বেরোলেন, আমার পাশ দিয়েই গেলেন আমাকে দেখতে পেলেন না। কৌতূহল হল। ছাত্রের বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ধুতিপরা যে ভদ্রলোক এইমাত্র বেরিয়ে গেলেন তিনি আমার নীচের ফ্ল্যাটে থাকেন; পাশ দিয়েই গেলেন অথচ আমাকে চিনতে পারলেন না! তখন তিনি বললেন, বেহালার পর্ণশ্রীতে একটা ষোলো ফ্ল্যাটের বাড়ি করছি। ওই ভদ্রলোক ঘুরতে ঘুরতে বাড়ি তৈরি হচ্ছে দেখে খোঁজ নেন। কেয়ারটেকারের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে এসেছিলেন কথা বলতে। উনি একটা একঘরের ফ্ল্যাট চান। একঘরের ফ্ল্যাট দুটি মাত্র, আর দুটিই বুকড হয়ে গেছে। শুনে ভদ্রলোকের কী আপশোস। বারবার বলতে লাগলেন কেউ যদি বুকিং ফিরিয়ে নেয় তাহলে অবশ্যই যেন ওকে একবার চিঠি দিয়ে জানাই। ঠিকানাও লিখে দিয়ে গেছেন, এই বলে তিনি কাগজটাও দেখালেন। দেখি আপনার বাবা কাশীনাথ রায়ের নাম আর এ বাড়ির ঠিকানা লেখা। বুড়ো মানুষ একা ফ্ল্যাটে থাকবেন কী করে, এটা তো যেকোনো মানুষকেই ভাবাবে, তাই জিজ্ঞাসা করলাম। আপনি কিছু মনে করলেন না তো।’
কথাগুলো বলতে প্রণববাবুর খুব বেশি দেড় মিনিট লাগল, পুলিনের জীবনের সবথেকে অবাক আর চেতনা অসাড় করা দেড়টা মিনিট।
‘না না না মনে করব কেন, বাবা রিটায়ার করার পর থেকেই তো একা থাকতে চাইছিলেন। হাঁপিয়ে উঠেছিলেন একই বাড়িতে একই ঘরে টানা প্রায় ষাট বছর বাস করে। একটা পরিবর্তন চাইছেন।’
প্রণববাবু আর কথা বাড়াননি। পুলিন উত্তেজিতভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে এল তিনতলায়। ভারতী দরজা খুলে দিল। ভিতরে ঢুকেই পুলিন প্রথমে ঘরের ভিতরে তাকিয়ে দেখল কাশীনাথ র্যাপার মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে। ফিসফিস করে সে ভারতীকে বলল, ‘এ ঘরে এসো, কথা আছে।’
পুলিনের মুখের ভাব দেখে ভারতীর প্রথমেই মনে হল, স্বরূপ পোদ্দার কি ঘরটা নেবে না বলেছে? সে স্বামীর পিছনে প্রায় দৌড়ে গেল।
‘বাবা রোজ বেরিয়ে যায় কেন এইমাত্র জানতে পারলুম। উফফ কী লোক রে বাবা! নীচে প্রণববাবুর সঙ্গে দেখা, তিনি যা বললেন সে এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড!’
‘কী বললেন প্রণববাবু?’
এরপর পুলিন যা শুনেছে হুবহু তা বলে গেল। শুনতে শুনতে ভারতীর চোখ কখনো বিস্ফারিত হল কখনো পাতা কুঁকড়ে গেল। কথা শেষ করে পুলিন পাশের ঘরের দেওয়ালের দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘এতসব ভেবে রেখেছেন অথচ কিচ্ছুটি জানতে দেননি।’
ভারতী গালে হাত দিয়ে আনমনার মতো দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে। পুলিন বুঝল ভাবছে। ভাববার জন্য একটা সূত্র ধরিয়ে দিতে সে বলল, ‘প্রণববাবুকে তার ছাত্রের প্রোমোটার বাবা নিশ্চয় আরও কিছু বলেছে যেটা উনি আমাকে বলেননি।’
‘প্রণববাবুকে আরও কিছু বলেছে মানে?’
‘মানে একটা বুড়ো লোক একা একঘরের ফ্ল্যাটে থাকবেন কেন? নিশ্চয় কৌতূহলী হয়ে ভদ্রলোক বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, বাবাও একটা কারণ বলেছেন। কারণটা কী হতে পারে বলে তোমার মনে হয়? আমি তো প্রণববাবুকে একটা কারণ তখন মান বাঁচাতে বলে দিলুম। কিন্তু সেটা তো ঠিক নয়, বাবার মোটেই এই পাড়া এই বাড়ি এই ফ্ল্যাট একঘেয়ে লাগে না বরং অন্য কোথাও গেলে ডাঙায় তোলা মাছের মতো অবস্থা হবে।’
ভারতী বলল, ‘আমাদের পাড়ায় এক বিধবা বুড়ি ছিল। সে লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খেতে চাইত, বলত ছেলেরা খেতে দেয় না, ছেলের বউয়েরা দুর ছাই করে বলে ঘাটে যাবেন কবে, নাতি—নাতনিরা একটুও মানে না। লোকেরা সহানুভূতিতে গলে গিয়ে খেতে দিত, পুরোনো ধুতিকাপড় পরার জন্য দিত। এমনকী এক আধ দিন থাকতেও দিত। বুড়ির ছেলে বউয়েরা সেইসব লোকেদের বাড়ি গিয়ে বলত, সব মিথ্যে কথা, ওকে খেতে যথেষ্টই দেওয়া হয়, পরার কাপড় বিছানা—বালিশ সব দেওয়া হয়, এমনকী হাতে দু—চার টাকাও দেওয়া হয়। বুড়ি সাতাত্তর বছর পেরিয়েছে তাই ভীমরতিতে ধরেছে। লোকে কিন্তু বিশ্বাস করেছিল বুড়িকেই। মারা যাওয়ার পর, যে ঘরটায় বুড়ি থাকত সেখানে একটা পলিব্যাগ থেকে আটশো টাকা, চারটে নতুন থানকাপড় আর বহুকালের বাসি সন্দেশ জিবেগজা বেরোল। বাবা এই বুড়ির মতো কিছু বলেননি তো?’
পুলিন চিন্তিত মুখে বলল, ‘হতেও পারে, আশ্চর্যের কিছু নয়। হয়তো বলেছেন ছেলে আর ছেলের বউ আমাকে দেখে না, ভালো করে খেতে দেয় না, বিদায় করতে পারলে বাঁচে, এমন হতশ্রদ্ধার মধ্যে আর থাকতে চাই না তাই আলাদা হয়ে থাকার জন্য একটা ফ্ল্যাট খুঁজছি।’
‘তোমার ধারণা যদি সত্যি হয় মানে বাবা যদি এইরকম কথা লোকটিকে বলে থাকেন, আর তিনি যদি তা প্রণববাবুকে বলে দেন তা হলে তো এ—বাড়িতে আমাদের মুখ দেখানোই দায় হবে।’ ভারতীর চোখে ভয় ফুটে উঠল।
‘হবেই তো। তবে এটা আমার অনুমান। অত ঘাবড়াচ্ছ কেন। ব্যাপারটা আসলে কী সেটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নেবার চেষ্টা করব। ভালো কথা বাবা কী বললেন বাজার করা নিয়ে?’
