‘আর কী ভাবব। পোদ্দারকে বলেছি ঘর নেওয়া আছে বউয়ের নামে, শ্বশুরই এটা পঞ্চান্ন সালে ভাড়া নিয়েছিলেন, বউকে জিজ্ঞেস না করে আপনাকে কিছু বলতে পারব না, কালকে আপনাকে জানাব।’
‘ভালোই বলেছ। এখনও চব্বিশ ঘণ্টা হাতে আছে, ভেবেচিন্তে ভবিষ্যতের কথা ভেবে বলবে।’
‘আচ্ছা চল্লিশ হাজার টাকা চাইলে কেমন হয়?’ সমর্থন পাবে আশা নিয়ে পুলিন তাকাল ভারতীর দিকে।
মাথা নাড়ল ভারতী, ‘অনিকে মানুষ করতে হলে এখনও কুড়ি—বাইশ বছর লাগবে। চল্লিশ হাজারে কতদিন আর চলবে, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ানোর খরচ যা তাতে ওই টাকা তো পাঁচ—সাত বছরেই শেষ হয়ে যাবে। অন্য কিছু ভাবো। বাবাকে কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কিছু বোলো না।’
ভেবে বার করল ভারতীই, চব্বিশ ঘণ্টা নয় চার ঘণ্টাতেই সে ভেবে ঠিক করে ফেলেছে। বিকেলে কাশীনাথ বেরিয়ে যাবার পর পুলিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। ভারতী তাকে ঘরে ডাকল।
‘শোনো থোক টাকা নয়, আমার কাছ থেকে লেখাপড়া করে ভাড়া নিক। আমরা চোরবাগানে যে বাড়িতে থাকতুম সেটা বাবা ওইভাবেই নিয়েছিলেন দত্তবাবুর কাছ থেকে। উনিই ছিলেন মূল ভাড়াটে। এখানে আমি মূল ভাড়াটে। তখন বাবা দোকানঘরটা ভাড়া নিয়েছিলেন পঁচাত্তর টাকায়। সেই ভাড়াই এখনও চলে আসছে। কেউ যদি এখন ওপাড়ায় এমন জায়গায় একটা দোকান ভাড়া নিতে চায় তাহলে কত সেলামি আর কত ভাড়া দিতে হবে?’
‘ওরে বাব্বা এখন তো লাখ টাকা সেলামিই দিতে হবে, বেশিও হতে পারে। ভাড়া ধরো হাজার টাকা।’
‘আর তুমি পঁচিশ হাজার শুনেই লাফাচ্ছ!’
‘তাহলে কত বলব, লাখ টাকা?’
‘হাঁস মেরে সব ডিম একসঙ্গে পাওয়ার লোভটা সামলাও। সেলামি টেলামি চাই না, মাসে মাসে দু—হাজার টাকা ভাড়া দিক আমাদের আর বাড়িওলার যা ভাড়া সেটা তাকে দিক। গিয়ে বলো। দেখবে প্রথমে রাজি হবে না। ঝানু ব্যবসায়ী ওরা, ঠিক বোঝে পঁচিশ তিরিশ বছর পর ওই ঘরটার দাম কত দাঁড়াবে। তুমি কিন্তু কোনো গরজ দেখাবে না।’
পরদিন পুলিন যায় স্বরূপ পোদ্দারের সঙ্গে কথা বলতে। ফিরে এসে একগাল হেসে ভারতীকে বলল, ‘তোমার একখানা মাথা আছে বটে। অত টাকা ভাড়ার কথা বলব, এটা তো ভাবতেই পারতুম না, পারলেও বলতে সাহসে কুলোত না।’
‘ভণিতা রাখো। লোকটা রাজি হল?’
‘কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে কী ভেবে নিয়ে বলল, ঠিক আছে তবে দু—হাজার নয় দেড় হাজার।’
‘তুমি রাজি হয়ে গেলে?’
‘পাগল। বললুম এক পয়সাও কম নয়। বউ তাহলে মাথা ফাটিয়ে দেবে।’ বলেই পুলিন জোরে হেসে উঠল। এভাবে শব্দ করে ওকে এই প্রথম ভারতী হাসতে শুনল, বোধহয় কাশীনাথ অনুপস্থিত বলে। ‘দু—হাজারেই রাজি হল। এক মাসের ভাড়া অ্যাডভান্সও দিয়ে দিল, এই দেখো।’ পুলিন পকেট থেকে একগোছা নোট বার করে ভারতীর চোখের সামনে ধরল। ‘কাল স্ট্যাম্পপেপার নিয়ে একজন কর্মচারী আসবে তোমাকে সই করাতে।’
‘কখন আসবে?’ ভারতী ভীতস্বরে বলে উঠল, ‘বাবা থাকার সময় যেন না আসে।’
‘আরে আমি কী অত বোকা, বলেছি এই সময়ে এগারোটায় আসতে।’ নোটগুলো স্ত্রীর হাতে দিয়ে পুলিন বলল, ‘এবার থেকে বাজার খরচটা আমি দোব বাবাকে বলে দিয়ো।’
‘বললেই বলবেন, টাকা পেলে কোথায়?’
‘বলবে চাকরি পেয়েছি একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে।’
‘তাহলে তোমাকে রোজ ন—টায় খেয়েদেয়ে জামাপ্যান্ট পরে বেরোতে হবে।’
পুলিন বিপন্নের মতো বলল, ‘তাই তো! খেয়াল করিনি!’
ভারতী বলল, ‘আমার মনে হয় ওনাকে বলে দেওয়াই ভালো। একদিন তো জানতে পারবেনই।’
‘সেই ভালো, তুমি কালই বলে দিয়ো নইলে কাঁটার মতো খচখচ করবে।’
‘আমি কেন তুমি বলতে পার না? সব ব্যপারেই আমাকে সামনে ঠেলে দেওয়া!’ প্রায় মুখঝামটা দিয়ে ভারতী দ্রুত ঘরে ঢুকে গেল টাকাটা রেখে আসতে।
তিনদিন পর কাশীনাথ ভাত খেয়ে ঘুমোবার উদ্যোগ করছে, পুলিন ইশারায় ভারতীকে ঘরের দিকে আঙুল দেখিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যায়।
একটা বছর দশেকের পুরোনো পাতলা র্যাপার গায়ে দিয়ে পাশ ফিরে কাশীনাথ শুয়ে। ভারতী খাটের ধারে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বাবা ঘুমিয়ে পড়েছেন?’
মুখ না ফিরিয়েই কাশীনাথ বলল, ‘না’।
‘একটা কথা বলব বলে এসেছি। দোকানঘরটা ভাড়া দেওয়া হয়েছে।’
কাশীনাথের দিক থেকে সাড়া এল না।
‘আপনার ছেলে বলছিলেন এবার থেকে বাজার খরচটা উনিই দেবেন।’
কাশীনাথ নীরব। ভারতী মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে থেকে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
পুলিন চিলড্রেনস পার্কের বেঞ্চে ঘণ্টাখানেক বসে থেকে ফিরে এল। গুহ ভবনের কোলাপসিবল গেট পেরিয়ে সিমেন্ট বাঁধানো উঠোন। বাঁদিকে ওপরে যাবার সিঁড়ির আগে সাত—আট হাতের একটা চাতাল। তার একদিকে দেওয়ালে ইলেকট্রিক মিটার বক্সগুলো, অন্যদিকে সার দিয়ে লেটারবক্স। সিঁড়িটা ঘুরে দোতলায় উঠেছে, ঠিক তার তলার ফাঁকা জায়গাটিতে পাঁচিল তুলে বানানো হয়েছে ছোট্ট একটা ঘর। তাতে দরজা আছে, মাথায় আছে টিনের আচ্ছাদন। ঘরে কেউ বাস করে না কারণ বাসযোগ্য নয়। ঘরটিকে সবাই ‘ফালতু ঘর’ বলে।
ছ—টা ফ্ল্যাটের প্রত্যেকটির লেটার বক্স আছে। পুলিন তাদের বক্সে শেষ কবে চিঠি পেয়েছে মনে করতে পারে না। উঠোন থেকে চাতালে পা রেখেই দেখল চারতলার প্রণববাবু লেটার বক্স থেকে চিঠি বার করছেন। পুলিনকে দেখে তিনি বললেন, ‘এই দুপুরে! কোথা থেকে?’
