‘আমি আত্মহত্যা করব। সত্যিই অপদার্থ! বেঁচে থাকার মানে হয় না।’
ভারতী এর আগেও স্বামীর মুখে এমন কথা শুনেছে। সে শুধু পুলিনের মাথায় হাত রেখে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মতো আর কেউ জানে না দুটো বছর ধরে পুলিন নিরন্তর কী পরিশ্রম করে গেছল।
একবার হতাশ হয়ে পুলিন বলেছিল, ‘এত কম টাকা নিয়ে এমন ব্যবসা দাঁড় করানো যায় না। পাঁচ—ছ লাখ টাকা নিয়ে নামলে কলকাতার বাইরে গ্রামের দিকে বিক্রি হবার তবু একটু আশা থাকত। বড়ো বড়ো কোম্পানি কী সুন্দর সুন্দর ক্যাবিনেটে কম দামে ট্রানজিস্টার বিক্রি করছে সারা দেশ জুড়ে। এদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যায় না।’
আর একদিন বলেছিল, ‘এবার দোকানটা বন্ধ করে দোব, গত তিনদিনে চারটে মাত্র বিক্রি হয়েছে। দুটো মাত্র মেকানিক, মাইনে দিতে পারিনি তাদের। কতদিন আর বাবার টাকা দিয়ে চালাব।’
পুলিন ব্যবসার কথা ভারতীর সঙ্গে আলোচনা প্রথম দিকে করত তারপর আর করত না। ভারতীও ঔৎসুক্য দেখাত না, কী খারাপ খবর শুনতে হবে এই ভয়ে। অবশেষে একদিন রাতে বাড়ি ফিরে খাওয়ার পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্ত স্বরে পুলিন বলেছিল, ‘বন্ধ করে দিয়ে এলুম, পাকাপাকি। তোমার নামে ব্যবসা, ঘরটা ভাড়াও নেওয়া তোমার নামে, চাবি তোমার কাছে রেখে দিয়ো। ভাড়া তিন মাসের বাকি।’
শুনেই কেঁপে গেছল ভারতীর বুক। অস্ফুটে বলেছিল, ‘একেবারে বন্ধ করে দিলে?’
‘হ্যাঁ, দেনা বাড়িয়ে লাভ কী?’
‘চেষ্টা করে দেখো না।’
‘নাহ, হবার নয়।’
দু—দিন পর কাশীনাথ ভারতীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘পুলিন ঘরে বসে কেন, বেরোবে না?’
ক্ষীণস্বরে ভারতী বলেছিল, ‘শরীর ভালো নয়, জ্বরজ্বর লাগছে।’
তিন—চার দিন পর কাশীনাথ রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘জ্বর কি এখনও সারেনি?’
ভারতী আর মিথ্যা বলার সাহস পেল না, বলল, ‘ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। দোকান আর খুলবেন না।’
কাশীনাথ বজ্রাহতের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঘরে গিয়ে গুম হয়ে বসে থাকে। তিন—চার দিন সে কারোর সঙ্গে কথা বলেনি। ভারতী দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করে কবে কাশীনাথ ফেটে পড়বে। ফেটে পড়েনি। সকালে সে বেরিয়ে যায় দুপুরে ফিরে ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে আবার বিকেলে বেরিয়ে রাত্রে ফেরে। কোথায় যায় কী করে কেউ জানে না।
একদিন একটি লোক এসে পুলিনকে খুঁজল। ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে লোকটির সঙ্গে দু—চারটা কথা বলেই সে ঘরে এসে প্যান্ট পরতে লাগল বেরোবার জন্য। ভারতী জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায় বেরোচ্ছ?’
‘স্বরূপ পোদ্দার কথা বলতে চায়, লোক পাঠিয়েছে যাই শুনে আসি কী বলে।’
ঘণ্টাখানেক পরে পুলিন ফিরে আসে। ভারতী জিজ্ঞাসু চোখে শুধু তাকিয়ে থাকে। পুলিনের মুখে চোখে উদ্দীপনার ছোঁয়া দেখে তার মনে হল কিছু একটা ভালো খবর সে দেবে। হাওয়াই শার্ট খুলতে খুলতে পুলিন বলল, ‘ব্যবসায়ী বটে। ঠিক নজর রেখেছে আমার দোকান ঘরটার দিকে। ক—দিন বন্ধ দেখেই বুঝেছে আমি আর বোধহয় খুলব না। কী বলল জান?’ ধাঁধা জিজ্ঞাসা করার মতো চোখ নিয়ে পুলিন তাকিয়ে ছিল।
ভারতী বলল, ‘ঘরটা নিতে চায়।’
পুলিনের চোখের উপর দিয়ে মুহূর্তের জন্য হতাশার মেঘ ভেসে গিয়ে আবার রোদ ফুটে উঠল। ‘ভারতী নামটাও নিতে চায়। আমার দোকান থেকে প্রায় একশো গজ দূরে ওর শাড়ির দোকান সরস্বতী। এয়ারকন্ডিশনড, কাচের দরজা। রাজস্থান থেকে ওদের জরিটরি বসানো দামিদামি শাড়ি আনায়। আমার ছোট্ট সাইনবোর্ডে ভারতী ট্রানজিস্টরস নামটা চোখে পড়া থেকেই স্বরূপ পোদ্দারের ইন্টারেস্ট তৈরি হয়। আজ বলল, আপনার দোকানটা একদিন বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে দেখলাম, দেখেই বুঝে গেলাম বেশিদিন চলবে না। তালা পড়তেই বুঝলাম আপনি ব্যবসা তুলে দিয়েছেন।’
ভারতী অধৈর্য হয়ে বিরক্ত স্বরে বলল, ‘এইসব বলার জন্য লোকটা ডেকে নিয়ে গেল?’
‘আরে না, সরস্বতীর সঙ্গে মিল রেখে ভারতী নাম দিয়ে ও ফ্রিজ আর টিভি—র দোকান খুলতে চায়। কলকাতায় টিভি শুরু হয়েছে এবার টিভি সেট কেনার ধুম পড়ে যাবে। ওই সঙ্গে টেপ রেকর্ডার, ক্যাসেট ম্যাসেট আরও কী কী সব রাখবে।’
‘বুঝলুম, তাতে তোমার কী?’
‘আমাকে পঁচিশ হাজার টাকা দিতে চেয়েছে যদি ঘরটা ওকে ছেড়ে দিই।’ বলেই পুলিন অপেক্ষা করল ভারতীয় চোখ কতটা জ্বলজ্বল করে ওঠে দেখার জন্য। তার বদলে পেল কঠিন দৃষ্টি।
‘পঁচিশ হাজার টাকা নিয়ে করবে কী?’
‘বাবাকে দিয়ে দোব।’
‘তারপর খাবে কী? বাচ্চচা ছেলেটাকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করতে হবে। তুমি কি ভেবেছ সেজন্য বাবা টাকা দেবেন? সে আশা কোরো না।’
‘তা অবশ্য করি না কিন্তু যেভাবে বাবা কথা না বলে বাইরে বাইরে থাকছেন তাতে মনে হচ্ছে এটা ঝড়ের পূর্ব লক্ষণ। ঝঞ্ঝাট বাধাবার আগেই সেটা থামিয়ে দিতে চাই। পঁচিশ হাজার পেলে অনেকটা তো নরম হবেন।’
‘না, টাকা এখন দেওয়ার দরকার নেই।’
ভারতীর গলা রূঢ়, দুটো ঠোঁট টিপে তার আপত্তিকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। তার চিন্তা বৃদ্ধ শ্বশুরের ছোড়া বাক্যবাণ নিয়ে নয়, দু—বছরের অনীশের ভবিষ্যতের কথা ভেবে।
‘বাবার কষ্টে রোজগারের টাকা নষ্ট করলুম সেটা ওকে ফেরত দোব না, বলছ কী!’
‘ঠিকই বলছি। তোমাকে টাকা দিয়েও রিটায়ার করে পাওয়া টাকা এখনও ওনার ব্যাঙ্কে রয়েছে, আর এখন পেনশন যা পাচ্ছেন এগুলো যোগ করে যদি দেখো তাহলে হেসে খেলে বাবার বাকি জীবন চলে যাবে। আমাদের সংসারে তো কোনো বাজে খরচ নেই। কারোর কোনো নেশা নেই, সিনেমা থিয়েটারে যাওয়া নেই, লোকজনও কেউ আসে না, আমরাও কোথাও যাই না। টাকা ফেরত দেওয়ার থেকে অন্য কিছু ভাবো।’
