ভারতীর মন হল কাশীনাথ রাস্তায় নেই। সে পাঁচ তলার ছাদে উঠে এল। চৌকো ছাদ, তার এককোণে ইটের চারটে পায়ার উপর লম্বা জলের ট্যাঙ্ক। একতলা থেকে পাম্পে জল তুলে রাখা হয়। ছাদে আর আছে দুটো টিভি অ্যান্টেনা, এর একটা কাশীনাথের অন্যটা চারতলার এক গুজরাটি পরিবারের। ভারতী শ্বশুরকে বলেছিল, ‘মাসে নব্বুই টাকা। বাবা কেবল কানেকশানটা নিয়ে নিন না, সবাই তো নিয়েছে। অনেক রকমের জিনিস, খেলা, সিনেমা দেখতে পাবেন।’
‘সবাই নিলেই কী আমায় নিতে হবে। কাজকম্ম সিকেয় তুলে তখন তুমিই তো সিনেমা দেখতে বসে যাবে, তাও রক্ষে ঘরে পড়াশুনোর পাট নেই। দোতলার ওদের তো টিভি নেই, ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো করে বলে নেই।’
ভারতী ছাদে ট্যাঙ্কের গা ঘেঁষে রাস্তার দিকের পাঁচিলে হাত রেখে কাশীনাথকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। এই রাস্তায় তাদের ছাদটিই পাঁচতলায়। অনেকদূর পর্যন্ত চোখ গিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যুর ওপারে পাশাপাশি দুটো ছ—তলা বাড়িতে দৃষ্টি রাখা যায়। বিস্তৃত একটা শূন্যতা, নেমে আসা হেমন্ত সন্ধ্যার ঘোলাটে আলো, তার পটভূমিতে সাদা পাঞ্জাবি পরা শীর্ণ চেহারাটিকে ভারতীর মনে হল চারদিক থেকে তাড়াখাওয়া বেড়ালের মতো কাশীনাথ একটা কোণে আশ্রয় নিয়েছে আত্মরক্ষার জন্য। কাশীনাথের শরীরটা যদি একটু নড়ে উঠত তা হলে সে অন্যরকম ভাবত। বৃদ্ধ মানুষটিকে তার অন্তত আশ্রয়প্রার্থী মনে হত না।
‘বাবা, হিম পড়বে, ঠান্ডা লাগবে নীচে আসুন, ওরা চলে গেছে।’
মন্থরভাবে কাশীনাথ ঘুরে দাঁড়াল।
‘আমি কি খুব অসভ্যতা করলুম?’
ভারতী উত্তর দিল না।
‘আমার জন্য অনির বিয়ে কি ভেঙে যাবে?’
‘না।’
‘তোমার বাবা কিন্তু হাত জোড় করে আমার কাছে এসেছিলেন।’
‘তখন ওটাই রীতি ছিল, সময় তো বদলে গেছে।’
‘কতটা বদলেছে?’
‘আজ তো দেখলেনই। বাবা, এদের কাউকে দোষ দেওয়া ঠিক হবে না। আপনি একটা সময়ের, এরা আর একটা সময়ের।’
‘তুমি মধ্যিখানের সময়ের!’
‘হ্যাঁ। এবার নীচে আসুন।’
‘কয়েকটা কথা বলার আছে বউমা, খুব গুরুতর কিছু নয়, চলো নীচে যাই।’
ফিরে এসে ভারতী বলল, ‘চা খাবেন? অনি ভালো চা এনেছে।’
‘এদের জন্য এনেছে, অন্য দিন তো আনে না! এই ব্যাপারটাই বলতে চাই। দুপুর থেকে তোমাদের মধ্যে এমন একটা ভাব দেখলুম যেন বাড়িতে লাটসাহেব আসবে। ঘরদোর পরিষ্কার কী নতুন চাদর পাতা, কাপ ডিশ কেনা, চা কেনা এসব ঘরের লোকের জন্য তোমরা করো না। ভাবতে ভাবতে মাথাটা গরম হয়ে উঠেছিল, তখনই লোকটা বলল, ওর মেজোশালা অনিকে সিলেক্ট করেছে। তার মানে তার অনুগ্রহেই চাকরিটা পেয়েছে। শুনেই মনে হল বুঝিয়ে দেওয়া দরকার চাকরি দিয়ে মাথা কিনে নাওনি।’
ভারতী বলল, ‘বাবা শিবেনবাবু কিন্তু মাথা কিনে নেওয়ার মতো করে কথা বলেননি, বেশ ভদ্র বিনয়ীই তো দেখলুম। বসুন চা করে আনি।’
চা করছিল ভারতী তখন ফিরে এল পুলিন। ঘরে উঁকি দিয়ে টিভি চালিয়ে কাশীনাথকে বসে থাকতে দেখে তার চোখ বিরক্তিতে ভরে গেল।
‘কোথায় গেছলে তুমি? গোরু খোঁজার মতো এধার—ওধার ছাতুবাবুর বাজার পর্যন্ত ঘুরে এলুম।’ গলা চড়ে গেল পুলিনের, ‘আমাদের সঙ্গে যা করো তা করো সেটা ওদের সঙ্গে করতে গেলে কেন? কীরকম ছোটোলোক ভাবল আমাদের, ছি ছি লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছিল।’
কাশীনাথ টিভি বন্ধ করে দিল। দেওয়ালে হেলান দিয়ে খাটে পা ছড়িয়ে বসল। ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে বলল, ‘লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছিল? কই তোর মাথাটা তো দেখছি ঘাড়ের ওপর ঠিকই রয়েছে।’ চোখ পিট পিট করল কাশীনাথ।
এমন হালকা কথার কী জবাব দেবে ঠিক করতে না পেরে পুলিন বলল, ‘এটা ফাজলামো করার মতো ব্যাপার নয়। তোমাকে সামনে রেখে ভদ্রলোকদের সঙ্গে কথা বলা যায় না। কী কুক্ষণেই যে তোমার ছেলে হয়ে জন্মেছিলুম।’
কাশীনাথের চোখ দুটি স্থির হয়ে গেল। গাঢ় হয়ে উঠল মণি। চশমার পুরু কাচ ভেদ করে ধিক্কার আর ঘৃণার মতো চাহনি বেরিয়ে আসছে।
‘হাঁ কুক্ষণেই, তবে তুই নয় আমি। কী কুক্ষণে তোকে জন্ম দিয়েছি সেটাই ভেবে আসছি যেদিন তুই বললি বাবা ব্যবসা আর চালাতে পারছি না, দোকানটা তুলে দোব। মনে পড়ে? মাত্র দু—বছর চালালি।’
পুলিনের অন্তরাত্মা কেন্নোর মতো গোল হয়ে গুটিয়ে গেল বাবার কথার ছোঁয়ায়। সে জানে এবার শুনতে হবে, আমার টাকা শোধ করে দিবি বলেছিলিস। পঁচিশ বছর হয়ে গেল একটা আধলাও শোধ করতে পারিসনি। দোকানটা একটা মেড়োকে ভাড়া দিয়েও আজও তুই বসে বসে ভাড়ার টাকা খাস।
‘কী রে পুলিন, মাথাটা তো দেখছি এখনও ঘাড়ের ওপর ঠিক রয়েছে, বাবুর চুলে আবার টেরি কাটা!’ এরপরই গলার স্বর বদলে গেল, ‘হারামজাদা, তোর জন্য আজ আমার এই দুরবস্থা। ছোটোলোক বানিয়েছিস তো তুই, সংসারটাকে গরিব করেছিস তো তুই। কোথায় শোব এই সমস্যায় আজ কী পড়তে হত তোকে?’
চা নিয়ে আসছিল ভারতী, শ্বশুরের গলা শুনে থমকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে পড়ল, পুলিন ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ভারতীর মুখের দিকে একঝলক তাকিয়ে দালানে চেয়ারে বসল দু—হাতে মুখ ঢেকে। চা নিয়ে ঘরে ঢুকল ভারতী, থমথমে মুখ।
‘টেবিলে রেখে যাও।’
কাপটা রেখে বেরিয়ে এসে সে দেখল পুলিন ফোঁপাচ্ছে। ভারতী তার পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে আলতোভাবে মাথায় হাত রাখল। পুলিন মুখ তুলল, চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে।
