‘বাবাই জিজ্ঞেস করল অনির খবর আপনারা পেলেন কী করে তাইতেই উনি এটা বললেন। তুমি কী ভেবেছ ওপরওলার ভাগনি বলে অনি বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, পরে উন্নতি করে দেবে?’
পুলিন মাথা নাড়ল। ‘অনি ভালোবেসেই বিয়ে করছে, মেয়েটার গুণ অনেক।’
অনীশ রান্নাঘরে এসে বলল, ‘হয়েছে? আমাকে দুটো কাপ দাও। আর একটু দুধ দাও, ওরা বেশি দুধ দিয়ে খায়। বাবা বেশ ভালোই মিষ্টি কিনে এনেছে, তবে রাজভোগ কেউ খায়নি।’
ভারতী বলল, ‘গোটা দশেক চন্দ্রপুলি কিনে দিস।’
বিয়ের প্রস্তাব দিলেন গীতা। ‘আমরা সামনের মাঘেই ওদের বিয়ে দিতে চাই।’
শিবেন বললেন, ‘ও মাসে পাঁচটা বিয়ের দিন আছে। একুশ তারিখ রবিবার পড়ছে। মেজোশালা মঙ্গলবার কুয়ালালামপুর চলে যাবেন, সেখান থেকে ব্যাঙ্কক হয়ে ফিরতে ফিরতে দিন পনেরো হয়ে যাবে। ওর যাবার আগেই শুভ কাজটা সেরে ফেলতে চাই।’
খাটের একধারে চুপচাপ পা ঝুলিয়ে এতক্ষণ বসেছিল কাশীনাথ। কথাবার্তায় অংশ নেয়নি। হঠাৎ সে বলে উঠল, ‘আপনার মেজোশালা ফিরে আসুক, তখনই বিয়েটা ফাল্গুন মাসে হবে।’
সবাই তটস্থ হয়ে তাকাল তার দিকে। কাশীনাথের গলার স্বর রূঢ়, তার তাকানোটাও গোঁয়ারের মতো। যেন ইচ্ছে করেই নিজের কর্তৃত্ব দেখাবার জন্য চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
‘কেন মাঘে হলে অসুবিধে কী?’ পুলিন বলল।
‘আমার বিয়ে ফাল্গুনে হয়েছে, তোর বিয়েও ফাল্গুনে হয়েছে, অনির বিয়েও ফাল্গুনে হবে।’
কথা হুকুম দেওয়ার মতো ঘোষণা করে কাশীনাথ উঠে দাঁড়াল। সবার অবাক হওয়া মুখের উপর চোখ বুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় বলল, ‘বরের বাড়ি যেমন চাইবে তেমনভাবেই বিয়ে হবে।’
কাশীনাথ ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বেরিয়ে ইতস্তত করে সিঁড়ি ধরে ছাদে উঠে গেল।
প্রথম কথা বলল ভারতী। ‘ওনার বয়স হয়েছে, শরীরটাও ভালো নেই, আপনারা কিছু মনে করবেন না। বিয়ে মাঘ মাসেই হবে।’
পুলিনও বলল, ‘হ্যাঁ, মাঘ মাসেই হবে, ছেলের বাবা হিসেবেই বলছি।’
‘না না আমরা কিছু মনে করছি না। বুড়োমানুষ অনীশের কাছে শুনেছি আশি পার হয়েছেন এই বয়সে উলটোপালটা কথা বলতেই পারেন।’ শিবেন সান্ত্বনা দেবার মতো করে বললেন।
ভারতী হাত ধরল গীতার। ‘আসুন, বিয়ের পর অনিরা যে ঘরে থাকবে সেটা এখনও আপনার দেখা হয়নি।’
পাশের ঘরে বিশাখা আর গীতা এসে চোখ বুলিয়ে দেখে খাটে বসল।
গীতা বলল, ‘ও ঘরের থেকে মনে হচ্ছে এটা যেন বড়ো।’
‘হ্যাঁ, দু—দিকেই দু—ফুট করে বড়ো। আমার বিয়ে হতে আমি এই ঘরটা পেয়েছিলুম, এবার পাবে বলাকা।’
আচমকা বিশাখা বলে উঠল, ‘তা হলে আপনারা থাকবেন কোথায়, আর কোনো ঘর আছে?’
সঙ্গে সঙ্গে ভারতী বলল, ‘ছাদে একটা খালি ঘর আছে, সেটা ভাড়া নেবার কথা হচ্ছে।’
পরে ভারতী ভেবে দেখেছিল, এমন একটা মিথ্যা কথা হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরোল কেন! ওদের চোখে ছোটো হয়ে যাওয়ার ভয়ে? ছোটো হয়ে যাবে অনীশ সেইজন্য? ছাদের ঘরের কথা বলে তখনকার মতো সামাল দিয়ে সে অনেকটা ভরসা এই ভেবে পায় যে, ওরা নিশ্চয় ছাদ দেখতে যাবে না। ছাদে কোনো ঘর নেই।
‘ঘরটা অনেক দিন মনে হয় পেইন্ট করা হয়নি, ইলেকট্রিক অয়ারিং বদলানোও দরকার। গদিটা কত দিনের মাসিমা?’
ভারতীর মনে হল মেয়েটি ইচ্ছে করেই তাদের প্রাচীনত্ব নিয়ে খোঁচা দিয়ে বলল, আরও হয়তো বলত, হাতে মায়ের একটা চিমটি পেয়ে চুপ করে গেল। কাশীনাথের একগুঁয়েমিরই পালটা প্রতিক্রিয়া এগুলো।
পুলিন এসে তাগিদ দিল, ‘শিবেনবাবু ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন যাবার জন্য।’
যাবার সময় ভারতী আবার বলল, ‘কিছু মনে করবেন না। শ্বশুরকে সামলাতে হিমশিম খেতে হয়, যত বয়স বাড়ছে ছেলেমানুষ হয়ে যাচ্ছেন।’
শিবেন বললেন, ‘ছেলেমানুষ হয়ে যেতে পারা তো ভাগ্যের কথা। আমি রোজ চেষ্টা করি ছেলেমানুষ হয়ে যেতে, পারছি কই।’ বলেই হেসে উঠে পরিবেশ হালকা করতে চাইলেন।
গীতা এতক্ষণে বুঝে গেছেন আসল কথাবার্তা কার সঙ্গে বলতে হবে; তাই ভারতীর হাত ধরে তিনি বললেন, ‘বিয়ের তারিখ ঠিক করে পরে জানিয়ে দোব। কিছু নেবেন না বললে আমরা কিন্তু শুনব না। আমার তিন মেয়ে। বুঝতেই পারছেন দায় সামনে কতটা, তাহলেও বড়ো মেয়েকে যতটা পারি সাজিয়ে দোব। খাট আলমারি না নিলেও ফ্রিজ, টিভি, ওয়াশিং মেশিন দুই মেয়ে তাদের দিদিকে বলে নিশ্চয় আপত্তি করবেন না। অনীশকে আমি বুঝিয়ে রাজি করাব।’
মাথা হেলিয়ে চওড়া হাসি ছাড়া ভারতী আর কোনোভাবে সম্মতি জানাতে পারল না। সে দেখল গীতা চোখের ইশারায় তার পা দেখিয়ে বিশাখাকে প্রণাম করতে ইঙ্গিত করছেন। সে পরপর পুলিন ও ভারতীকে প্রণাম করে বলল, ‘আমি কিন্তু আবার আসব, মাসিমা মেসোমশাই আপনারাও যাবেন আমাদের বাড়িতে।’
পুলিন আপ্লুত। অনীশকে বলল, ‘ওদের সঙ্গে যা, ট্রেনে তুলে দিয়ে আয়।’
ভারতী সিঁড়ির মাথা পর্যন্ত এসে দাঁড়াল। যতক্ষণ পায়ের শব্দ পাওয়া যায় শুনে ফিরে এসেই পুলিনকে বলল, ‘একবার শিগগিরি রাস্তাটা দেখে এসো, বাবা কোথায় গেলেন, খুঁজে দেখো।’
ব্যস্ত উদবিগ্ন পুলিন পায়ে চটি গলিয়ে বেরিয়ে পড়ল, ভারতী কাপ ডিশ প্লেটগুলো রান্নাঘরের বেসিনে রেখে বারান্দায় এসে ঝুঁকে যতদূর সম্ভব সদ্য সন্ধ্যার এবং ম্লান রাস্তার আলোয় দেখা যায় দু—দিক তাকিয়ে শ্বশুরকে খোঁজার চেষ্টা করল। দেখল পুলিন সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যুর মোড়ে দাঁড়িয়ে এধার—ওধার তাকিয়ে বাবাকে খুঁজছে।
