বিশাখা চুপ করে বসে আছে দেখে অনীশ বলল, ‘মামা, মামার বাড়ি, মেজদা এসব তো হল, জানো মা বিশাখার নজরুলের গানের ক্যাসেট বেরিয়েছে!’
‘ওমা, তাই নাকি!’ ভারতী সত্যিই অবাক হল। ‘কই আমাকে তো তুই আগে বলিসনি। নজরুলের গান আমার ভীষণ ভালো লাগে। ছোটোবেলায় রেডিয়োয় নজরুলগীতি হলেই শুনতে বসে যেতুম, অনি ওর ক্যাসেট কিন্তু আমায় শোনাবি।’
কাশীনাথ এবার বলল, ‘আমাদের স্কুলে নন্তু বলে একটা ছেলে ছিল খুব নজরুলের গান গাইত। তখন রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার এত চল ছিল না।’
পুলিন অনেকক্ষণ কথা বলেনি। এবার তার মনে হল একটা কথা সে বলতে পারে। ‘বাবা কিন্তু ভালো তবলা বাজাতেন। ছোটোবেলায় একবার দেখেছি পাড়ায় লক্ষ্মীপুজোর জলসায় বাবা সংগত করেছিলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গানের সঙ্গে।’
‘ওরে বাব্বা, তাহলে তো উনি খুবই ভালো বাজাতেন।’ শিবেন বললেন।
কাশীনাথ মুখে হাসি ছড়িয়ে বলল, ‘ছেলে বাপের প্রশংসা তো করবেই। আমি খুব ভালো বাজাতুম না, ইচ্ছে ছিল খুব বড়ো তবলচি হব। বউবাজারে কেরামত উল্লা খাঁ সাহেবের কাছে যেতুম, মসিত খাঁর ছেলে, ফারুকবাদ ঘরানার স্টাইল আর টেকনিক গিলে খেয়েছিলেন। কিন্তু আমার যা চাকরি তাতে ওর উগরে দেওয়া জিনিস চেটে নেওয়ারও টাইম পেতুম না। শেষকালে রেওয়াজ ছেড়ে দিলুম, একসময় তবলাটাও ভুলে গেলুম।’
কাশীনাথের হাসিটা যে কষ্টের হাসি পুলিন এবং ঘরের সকলেই বুঝতে পারল। ভারতী তার শ্বশুরকে একটা নতুন ভূমিকায় দেখতে পেল। মানুষটির এই গুণের কথা তিরিশ বছরেও সে জানত না এমনকী পুলিনও কখনো তাকে বলেনি। থিয়েটারের পর্দার মতো ধীরে ধীরে তার অশ্রদ্ধা বিতৃষ্ণা সরে গিয়ে মঞ্চে কাশীনাথকে সামনে এনে দিল নায়ক চিহ্নিত করে। ঘরের সবাই ঘোর কৃষ্ণবর্ণ অষ্টআশি বছর বয়সি শীর্ণ লোকটির উপস্থিতিকে আর অগ্রাহ্য করতে পারছে না।
এবার বিশাখা বলল, বলার জন্য উপযুক্ত কারণ ছাড়াই, ‘ছোটো মামার শালির কবিতার বই গত বছর সাহিত্য আকাদেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে।’
পুলিন বলল, ‘তাই নাকি!’
কবিতার বই বা অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড ঘরের কাউকে আকর্ষণ করল না। অনীশ বলল, ‘মা এবার একটু চায়ের ব্যবস্থা করো।’
শিবেন বলে উঠলেন, ‘শুধু চা কিন্তু সঙ্গে টা নয়।’
গীতা বললেন, ‘আজ বেলায় খাওয়া হয়েছে একদম খিদে নেই।’
ভারতী অনুযোগ মিশিয়ে বলল, ‘প্রথম এলেন মিষ্টিমুখ করাব না তাই কী কখনো হয়। বসুন।’
শিবেন বা গীতা আর কথা বাড়াল না। ওদের মুখ দেখে ভারতীয় মনে হল ঘর পছন্দ হয়েছে, ওরা এখানে মেয়ে দেবে। ঘর থেকে তার সঙ্গে অনীশও বেরিয়ে এল। রান্নাঘরে বাক্সে আর ভাঁড়ে মিষ্টি রয়েছে। নতুন কেনা প্লেটে অনীশ সেগুলো সাজাতে লাগল, ভারতী চায়ের জল চড়াল বার্নারে।
‘আমার তো বেশ ভালোই লাগল।’ ভারতী বলল। ‘ক—দিন ধরে তুই যা বলছিলিস ভাবছিলুম না জানি কী। হ্যাঁরে বলাকার মামা তোকে চাকরি দিয়েছে বলল, কই সেটা তো আমাদের জানাসনি!’
‘এটা কী একটা জানাবার মতো কথা! চাকরি দেবে আবার কী? এটা কর্পোরেট কোম্পানি, কারোর নিজের ব্যবসা নয় যে ধরাধরি করলেই চাকরি দিয়ে দেবে।’
ছেলের গলার স্বরে বিরক্তি আর ঝাঁঝ দেখে ভারতী অনুতপ্তের মতো বলল, ‘সিলেক্ট করেছে বলল কি না, তাই বললুম।’
‘ও নিয়ে তোমায় মাথা ঘামাতে হবে না। এদিকে দেখো ঠিকঠিক দেওয়া হল কি না।’
ভারতী তিনটে প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। তুই দুটো প্লেট নে আমি বাকিটা নিচ্ছি। পরে জলের গ্লাস নিয়ে যাব। ততক্ষণ চা—টা ভিজুক।’
‘একটা ট্রে থাকলে ভালো হত, তখন বললে না কেন কাপ ডিশের সঙ্গেই কিনে আনতুম।’
প্লেট হাতে ঘরে ঢোকার সময় ভারতী শুনল শিবেন বলছেন, ‘মেজোশালা ভীষণ ভালোবাসে বলাকাকে, অনীশের কথা তো উনিই আমাদের বলেন। মেজদাই তো ওকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসে আলাপ করিয়ে দিলেন। বলাকার সঙ্গে তো অনীশের পরিচয় হল তখনই।’
ভারতী তার প্লেট গীতার হাতে দেবার জন্য বাড়িয়ে ধরল, ‘একি এত মিষ্টি!’ বলে গীতা আঁতকে ওঠার ভান করল।
শিবেন আর বিশাখার হাতে প্লেট না দিয়ে অনীশ খাটের উপর রেখে বলল, ‘টেবল থাকলে চলাফেরার অসুবিধে হবে বলে রাখিনি। বিশাখা একটাও ফেলে রাখবে না।’
গীতা বললেন, ‘খুকু মিষ্টি খেতে ভালোবাসে।’
শিবেন প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কোথাকার মিষ্টি, দেখছি সীতাভোগ রয়েছে।’
পুলিন বলল, ‘হ্যাঁ, আপনার দেশের। এখানকার একটা দোকান তৈরি করে আর চন্দ্রপুলিটা আমাদের এখানকার। খেয়ে দেখুন কলকাতার আর কোনো জায়গায় এমন টেস্টফুল চন্দ্রপুলি পাবেন না।’
শিবেন চামচ দিয়ে চন্দ্রপুলির একটা কোনা ভেঙে মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে চিবিয়েই চোখ খুলে বললেন, ‘চমৎকার’। স্ত্রীকে বললেন, ‘খেয়ে দেখো, খুকু তুই আগে এটা খা।’
পুলিন আর চুপ করে থাকতে পারল না, বলল, ‘এটা কিন্তু আমি পছন্দ করে এনেছি। অনি মিঠাইরাজা থেকে কিনে যাবার সময় ওদের দিস।’
‘না না, কিনে দিতে হবে না,’ ‘শিবেন আপত্তি করে উঠল। ‘আমরা কিনে নোব।’
ভারতী আরও চন্দ্রপুলি নিয়ে এল। প্রত্যেকের প্লেটে দুটি করে দিয়ে বলল, ‘অনি কিনে দেবে আমার তরফ থেকে বলাকার জন্য।’ এই বলে সে চা আনতে গেল, সঙ্গে গেল পুলিন।
‘ভদ্দরলোক তখন কী যেন বলছিল? অনির কথা নাকি বলাকার মেজোমামাই ওদের বলেন? ‘ ভারতী চা কাপে ঢালতে ঢালতে বলল, ‘হঠাৎ একথা উঠল যে?’
