ভারতী কথা বলা কয়েক সেকেন্ড থামিয়ে আবার শুরু করল, ‘বড়ো এলোমেলো অস্থির হয়ে পড়ছি। অনেকদিনের জমে থাকা রাগ আর চেপে রাখতে পারছি না। এমন কিন্তু আমি ছিলুম না। তোমাকে আজও আমি আগের মতো ভালোবাসি, ভক্তি করি। মেয়ে ছিলুম, বউ হলুম এখন মা হয়েছি। আমার বদলটাকে দয়া করে বোঝো, রাগ করতে হয় কোরো কিন্তু সেই সঙ্গে বোঝার চেষ্টাটাও কোরো।’
পুলিন নিঃসাড়ে একইভাবে ঘুমের ভান করে রইল। ভারতীর হাত তার বাহু থেকে সরে গেছে। পুলিন সুখাবেশে তলিয়ে যেতে লাগল।
.
রবিবার সকাল থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল অনীশ। পুলিন গামছা মাথায় জড়িয়ে সিলিঙের কোনা থেকে ঝুল ঝাড়ল, পাখার ব্লেডে জমা ঝুল পরিষ্কার করল, দালানের মেঝেয় সোডা ছড়িয়ে ঝাঁটা দিয়ে ঘষল, ন্যাতা দিয়ে মুছে দিল ভারতী। বেডকভার দুটো বিছানায় পাতবে বলে বার করল পুলিন। অনীশ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘এখন নয় ময়লা হয়ে যাবে, বিকেলে পাঁচটায় ওরা আসবে তার আগে পাতবে।’ সকলের উৎসাহ কর্মতৎপরতার সঙ্গে শামিল হবার চেষ্টা কাশীনাথের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। কোথায় কী নোংরা জমে, কোনটা অগোছালো, ফোল্ডিং খাটটা বারান্দায় বার করে দেওয়া, চারতলার প্রণববাবুর থেকে দুটো বেতের চেয়ার চেয়ে আনা ইত্যাদি নির্দেশ ও পরামর্শ দিতে দিতে বলল, ‘ওদের তো জলখাবার দিতে হবে, কী খেতে দেওয়া হবে?’
পুলিন বলল, ‘রাজভোগ সন্দেশ শিঙাড়া, আবার কী?’
কাশীনাথ বলল, ‘বাজার থেকে এনে তোর শ্বশুরকে তাই দিয়েছিলুম, এদেরও কী তাই দেওয়া যায়!’
পুলিনের মাথায় ‘এদেরও কী’ কথাটা ধাক্কা দিল। সে কথাটা কঠিন করে বলল, ‘কেন এরা কী? লাটসাহেব? মেয়ের বাড়ির লোক তো, তবে?’
কাশীনাথ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তার আগেই ভারতী বলল, ‘খাবার কীসে করে দেবে? ভালো কাপ ডিশ গেলাস চামচ তো নেই, প্লেটও নেই। স্টিলের প্লেটে কী ওদের খেতে দোব, না ওই মোটা কাচের গেলাসে জল দোব? আগে ওগুলো কিনে আনো তবে খাবারের কথা ভাবো।’
পুলিন উদবিগ্ন হয়ে অনীশকে বলল, ‘আজ রোববার সব জায়গায় দোকান বন্ধ, তুই এখুনি শ্যামবাজারে যা, মনে হয় পেয়ে যাবি।’
অনীশ বেরিয়ে পড়ল তখনি। সিঁড়ি দিয়ে সে নেমে যাচ্ছে তখন ভারতী ছুটে দরজার কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘অনি দুশো গ্রাম চা আনিস আড়াইশো টাকা কিলোর।’
দালানে দাঁড়িয়ে পুলিন ইলেকট্রিক বালবের কাচের শেডের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওটা পরিষ্কার করা হল না।’
ভারতী বলল, ‘থাকগে, অত কেউ নজর করবে না। আর শোনো বগলা থেকে মিষ্টি এনো না, মিঠাইরাজার মিষ্টি অনেক ভালো। ক্ষীরের চন্দ্রপুলিটা যদি পাওয়া যায় তা হলে অবশ্যই এনো।’
মেট্রোর গিরিশ পার্ক স্টেশনে অপেক্ষা করছিল অনীশ। তিনজন এসেছে, বলাকার বাবা শিবেন, মা গীতা আর ছোটোবোন বিশাখা। তিন মিনিট হেঁটেই তারা গুহ ভবনে পৌঁছে যায়। কাশীনাথ আর পুলিন পাটভাঙা ধুতি আর পাঞ্জাবি এবং ভারতী চওড়া জরি পাড় বুটিদার সাদা টাঙ্গাইল পরে তিনজনকে অভ্যর্থনা জানিয়ে কাশীনাথের ঘরে নতুন বেডকভার পাতা খাটে এবং বেতের চেয়ারে বসাল। বালিশগুলো উঁচু হয়ে রয়েছে বেডকভারের নীচে। জিনস আর কালো টি শার্ট পরায় অনীশকে যেন আরও ফরসা দেখাচ্ছে। সে ওদের পরিচয় করিয়ে দিল বাবা মা দাদুর সঙ্গে।
কাশীনাথ কথা শুরু করল, ‘আসতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো?’
‘না না কিচ্ছু অসুবিধে হয়নি।’ শিবেন দ্রুত জবাব দিলেন, ‘মেট্রো হয়ে খুব সুবিধে হয়েছে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে আপনাদের এখানে পৌঁছতে ঠিক পঁয়ত্রিশ মিনিট লাগল, বাসে এলে কম করে পঞ্চাশ মিনিট তো লাগতই।’
‘উইক ডে হলে লাগবে এক ঘণ্টা।’ পুলিন নিজেকে কথাবার্তার মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। ‘আপনারা সাউথ ক্যালকাটায় কতদিন আছেন?’
‘টালিগঞ্জে বাড়ি করেছি বছর দুই, তার আগে পাঁচ বছর ছিলাম চেতলায়, তার আগে আসামে। বলাকা কলেজে আর ইউনিভার্সিটিতে পড়েছে কিন্তু কলকাতায়।’
গীতা বললেন, ‘বেকবাগানে আমার মেজদার বাড়িতে থেকে পড়ত। আমার বাপের বাড়ি কলকাতায়, আপনাদের বাড়ি থেকে বেশি দূর নয় আহিরিটোলায়।’
‘তাই নাকি!’ কাশীনাথ উৎসাহিত হল, ‘আহিরিটোলার কোথায়?’
‘বি কে পাল পার্কের উলটোদিকে।’
ভারতী লক্ষ করছিল ওদের হাবভাব কথা বলার ধরন, তার ভালো লাগল। বলার ভঙ্গিতে গেরস্থালি ঢঙ, নাক উঁচু ভাব নেই। যেটার সে আশঙ্কা করেছিল অনির সমীহ করে ওদের সম্পর্কে কথাবলা থেকে। এখন তার মনে হচ্ছে নিজেদের অত খাটো করে ভাবার কোনো দরকার নেই। স্বচ্ছন্দ বোধ করে সে বলল, ‘কলকাতার এদিককার লোক পেলে বাবার আর কথা নেই, খালি পুরোনো দিনের গল্প করে যাবেন আর বলবেন কী ছিল আর কী হয়েছে।’
‘এদিককার লোক বলতে কিন্তু শুধু আমি একাই। উনি আর আমার মেয়েরা কিন্তু নয়। ওরা উত্তর কলকাতা একদম চেনে না।’
ভারতী হাসিমুখে বলল, ‘মামার বাড়িতে তো গেছে।’
গীতা বলল, ‘ছোটোবেলায় কয়েকবার গেছে, দু—দিনের বেশি থাকেনি। এত লোক আমাদের বাড়িতে, তিন ভাইয়ের এগারোটি ছেলেমেয়ে, থাকার জায়গা কোথায়! তাও তো মেজদা থাকত না।’
ভারতী কৌতূহলী হল, ‘কোথায় থাকতেন?’
উত্তর দিলেন শিবেন, ‘মেজোশালা প্রথম চাকরি নিয়ে যান সুইজারল্যান্ডে। আট বছর সেখানে থেকে যান জার্মানির বায়ার্স কোম্পানিতে, সেখানেও ন—বছর কাটিয়ে ছ—বছর আগে ফিরে এসে জয়েন করেন এই স্টান্ডার্ড পেইন্টসে। ইস্টার্ন রিজিয়নে মার্কেটিঙের টপম্যান এখন। উনিই তো অনীশকে সিলেক্ট করেন।’
