ফাঁপরে পড়ল পুলিন, তারা যা ভেবেছে সেটা বলা যায় না। নিজেকে কঠিন করে নিয়ে বলল, ‘কোথায় একটা ফ্ল্যাট নিয়ে যদি থাকিস তাহলে সবারই সুবিধে হয়।’
‘এটা কি মায়েরও ইচ্ছে?’
‘হ্যাঁ, ওরও।’
‘এখন ডিসেন্ট একটা ফ্ল্যাটের ভাড়া কত জানো?’
পুলিন জানে না। ইতস্তত করে বলল, ‘কত?’
‘একটু ভালো জায়গায় পাঁচ হাজার টাকা, আটশো স্কোয়ার ফুট সাইজটা আমাদের এই ফ্ল্যাটের মতো, তাও কলকাতার কিনারে ভি আই পি, সন্তাোষপুর, বেহালার মতো জায়গায়। বলাকার অসুবিধে হবে শ্যামনগর যাতায়াতে।’
‘তোর কোম্পানি তোকে দেবে না?’
‘এখন নয়, আর এক ধাপ উঠলে পাব।’
‘কবে উঠবি?’
অনীশের মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘কবে উঠব সেটা জ্যোতিষী বলতে পারবে। এই তো চাকরিতে ঢুকলুম মাস ছয়েকও হয়নি।’
‘তাহলে এখনি বিয়ে করছিস কেন?’
অনীশ উঠে বসল বিছানায়। চোখে দপ করে উঠল রাগ। তীব্র স্বরে বলল, ‘ব্যাপার কী? এভাবে কথা বলছ যে! আমার বিয়ে করায় তোমাদের আপত্তি আছে কিনা সেটা পরিষ্কার করে খুলে বলো।’
পুলিন জানত না কথায় কথায় প্রসঙ্গটা এমন জায়গায় এসে পড়বে। বিপন্ন হয়ে সে বারান্দার দরজার দিকে তাকাল। ভারতী দাঁড়িয়ে।
‘মা তোমাকেও বলছি স্পষ্ট করে বলো বিয়েতে তোমার মত আছে কি নেই?’
‘আছে। তুই বিয়ে করবি আমাদের কোনো অসুবিধে হবে না।’
অনীশ তাকাল তার বাবার দিকে। পুলিন মুখ কালো করে ঘর থেকে দালানে বেরিয়ে এসে খাবারের টেবলের চেয়ারে বসে পড়ল। একটু আগে ভারতীই বলেছিল আমি অন্য কোথাও থাকলে তো ভালোই। ওরও সুবিধে আমাদেরও সুবিধে। অথচ কী নির্বিকারভাবে বলল আমাদের কোনো অসুবিধে হবে না। এভাবে কথা পালটে নিয়ে তার মুখ পুড়িয়ে দেবে এমনটা সে কল্পনাও করতে পারে না। পুলিন দুই মুঠোয় চুল টেনে ধরল। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল টেবলে পড়ে থাকা রঙিন পলিথিন ব্যাগটার দিকে। সে তো চেষ্টা করল কুঁকড়ে পিছিয়ে যাওয়ার স্বভাবটা থেকে নিজেকে বার করে আনতে। আনা হল না। অনি এখন থেকে কী ভাববে তার সম্পর্কে!
তার চটকা ভাঙল ভারতীর কথায়, ‘ঘরে যাও, অনিকে খেতে দোব।’
পুলিন উঠে কাশীনাথের ঘরে ঢুকল। টিভি—তে খবর পড়া হচ্ছে। খাটের একধারে বসে সে তাকিয়ে রইল টিভি—র দিকে। কানে কিছু ঢুকছে না। স্ক্রিনে কালো কালো কিছু মূর্তি নড়ে চড়ে উঠছে। পুলিন স্পষ্টভাবে কিছু দেখতে পাচ্ছে না। খবর শেষ হতেই কাশীনাথ বলল, ‘সুইচটা অফ করে দে।’ কথাটা পুলিনের কানে পৌঁছল না। কাশীনাথ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কীরে কথাটা কানে গেল? টিভি বন্ধ করে দে।’ পুলিন উঠে গিয়ে বন্ধ করল। ‘হল কী তোর?’ কাশীনাথ অবাক হয়ে বলল।
‘কিছু না।’ কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে পুলিন বলল, ‘আচ্ছা বাবা, আমাকে ব্যবসার জন্য টাকাটা না দিলে আজ তুমি বেলঘরিয়ায় তিন ঘরের একটা ফ্ল্যাটে থাকতে, এর থেকে ভালোভাবে থাকতে, ঠিক কিনা।’
‘ভালোভাবে থাকতুমই তো।’
‘তাহলে আমাকে শেয়াল—কুকুর ভাবতে না, মনের শান্তি নিয়ে আজ থাকতে।’
কাশীনাথ যেন ধাঁধায় পড়ে গেল। সেইভাবে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। বাবার দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে পুলিন বলল, ‘তোমার মনের শান্তি আমি নষ্ট করেছি আমার অযোগ্যতা দিয়ে।’
‘হঠাৎ এসব কথা বলছিস কেন?’
‘বলছি না, স্বীকার করছি, ছাব্বিশ বছর পর মনটাকে হালকা করলুম।’
‘এভাবে দুম করে আমি অযোগ্য বললেই কি মন হালকা হয়ে যায়? দেখবি ওই হালকা জায়গাটার আবার একটা ওজন বসে গেছে। দাঁড়িপাল্লায় পাষাণ ফেরানোর জন্য যেমন দু—দিকে সমান সমান ওজন চাপাতে হয় তেমনি মনটাকে ঠিক রাখতে শান্তি আর অশান্তি দুটোই সমানভাবে চাই।’
পুলিন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে দেখে কাশীনাথ আবার বলল, ‘বুঝতে পারলি না?’
পুলিন মাথা নেড়ে বলল, ‘খানিকটা বুঝেছি।’
‘বয়স আর একটু বাড়ুক পুরোটা বুঝতে পারবি।’
অনীশ ঘরে ঢুকল, এবার সে ফোল্ডিং খাটটা পাতবে। পুলিন তার মুখের দিকে না তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পুলিনের খিদে নষ্ট হয়ে গেছে। একটা রুটি কোনোরকমে খেয়ে সে ঘরে এসে আলো নিবিয়ে খাটে শুয়ে পড়ল দেওয়ালের দিকে মুখ করে। বাইরে খাওয়ার টেবলে ভারতী। পুলিনের চোখে ঘুম নেমে আসছে। দালানে চেয়ার সরাবার, রান্নাঘরে বাসন রাখার শব্দ সে শুনল। টের পেল ভারতী ঘরে ঢুকল, আলো জ্বেলে নেবাল। বিছানায় তার পাশে শুয়ে পড়ল। অন্যদিন বাহুতে ছোঁয়া লাগে, এখন লাগছে না। ধীরে ধীরে পুলিন ঘুমের মধ্যে ডুবে যেতে লাগল।
পচা গরমে দখিনা বাতাস শরীরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার মতো একটা স্নিগ্ধ অনুভূতি পুলিনকে ঘুমের তলদেশ থেকে ধীরে ধীরে তুলে দিচ্ছে। শিশুকে আদর করার মতো মমতা—ভরা একটা হাত তার বাহু গলা ঘাড়ের উপর সান্ত্বনা ছড়িয়ে দিচ্ছে। পুলিন নিশ্বাস চেপে রইল। হাতটা ভারতীর।
‘আমার কী যেন হয়েছে’ ফিস ফিস করে নিজেকে শোনাবার জন্যই যেন ভারতী আবেদনের মতো মিনতিভরা স্বরে বলে চলল, ‘তোমাকে আজ অপমানই করলুম। কটু কথা বলেছি, ছেলের সামনে মিথ্যেবাদী করে দিয়েছি। অনিকে বলে দিয়েছি বিয়ে করলে অসুবিধে হবে একথা আমিও বলেছি। কিন্তু অনি আমার ছেলে, একমাত্র ছেলে। ওর মনে আঘাত লাগুক এমন কোনো কথা ওকে বলতে পারব না, এমন কোনো কাজও আমি করতে পারব না। তুমি ভুল বুঝো না আমায়।’
