ছবিটা কবে তোলা? সতেজ যুবকের মতো দেখাচ্ছে। চাহনিটা জ্বলজ্বলে, তীক্ষ্ন অথচ হালকা হাসিতে ছাওয়া। বাবার এমন মুখ সে কখনো দেখেনি। ঘন থাক থাক চুল কপাল থেকে পিছনে ওলটানো। চুল উঠে কপালটা চওড়া হয়ে গেছল শেষ দিকে। চোয়ালে চর্বি জমেছিল কিন্তু এই ছবিতে গালদুটো মসৃণ, সমান। বাবার বয়স তখন কত, পঁচিশ—আঠাশ? ছবিটা কি বিয়ের আগে তোলা? অনন্ত কখনো তার বাবার এই ছবি দেখেনি।
সে কথা বলছে না। উনি অবাক হয়ে অনন্তের দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালেন। ছবিটার দিকে সারাক্ষণ চোখ স্থির হয়ে রইল।
‘এটা তো পাঁচ মাস আগের, তারপর আর ভাড়া দেননি?’
পাংশু হয়ে গেল ওর মুখ। শিশুর মতো মাথা নাড়তে লাগলেন।
‘চার মাস দেননি, এইটে নিয়ে পাঁচ মাস।’
‘হ্যাঁ। আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয়নি, এখনও সম্ভব নয়। অ্যাঞ্জেল কেমিক্যালসে কাজ করতুম, আজ ছ—মাস সেখানে লক আউট চলছে। জানি না অফিস আর কখনো খুলবে কি না।… আমাকে কি তুলে দেবেন?’
অনন্তের বড়ো করুণ লাগল ওর শেষের কথাটি। কিন্তু বাবার সঙ্গে এর কোথায় পরিচয়, কেমন করে পরিচয়? এই রকম একটা ছবি তাদের সংসারে নেই কেন? গত ছ—মাসের মধ্যে একবারও কি কেউ বাবার সম্পর্কে কোনো কথা বলেছে…অনু, অলু, মা? সে নিজে?
প্রশ্নগুলো একসঙ্গে তার মাথাটাকে কামড়ে ধরছে আর যন্ত্রণাটা বুকের দিকে এগোচ্ছে।
সে কি নিজের পরিচয়টা এবার দেবে? ওঁর সঙ্গে বাবার সম্পর্কটা আগে জানা দরকার। ধূপ কি রোজ জ্বালেন? বাবার কোনো ছবি সে আজ পর্যন্ত দেখেনি। তাদের ঘরে মানুষের কোনো ছবি নেই।
‘তুলে দেওয়ার মালিক তো আমি নই। তবে আপনি বেআইনিভাবে রয়েছেন।’
‘আমি তো ভাড়া দিয়ে গেছি। ভাড়া বাকি তো পড়তেই পারে।’
‘কিন্তু আমাদের খাতায় আপনার নাম নেই, আপনার ভাড়াও জমা পড়েনি। সবই পরিমলবাবু নিজে গাপ করেছেন।’
‘সে কী! আমি তা হলে ভাড়াটে নই? পরিমলবাবু এইরকম লোক তা তো বুঝতে পারিনি। আমাদের অফিসে ওর ভাই কাজ করেন তার মারফত ওর সঙ্গে পরিচয়। খুব দরকার শুনে ঘরটা আমাকে দিলেন। ওঁকে ছাড়া আর কাউকে চিনিই না।’
অনন্ত মাথা নাড়ল।
‘বাইরে পানওলারও একই ব্যাপার।’
‘আমাকে আপনারা তা হলে রাস্তায় বার করে দিতে পারেন?’
‘আপনি অত ভাবছেন কেন? আর কোথাও কি থাকার জায়গা আছে?’
‘আমার কোথাও কেউ নেই।’
আর্তনাদের মতো অনন্তের কানে ঠেকল। অবিনাশকাকা বলেছিল বাবা প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে দু—বারে সাত হাজার টাকা তুলেছে, সে কি এনারই জন্য? কীভাবে খরচ হল?
চিঠিটায় একটা লাইন ছিল : ‘গত এক মাসে একবারও এলে না।’ এখানে কি বাবা আসত! কিন্তু মিনতি কর তিন বছর এই ঘরে, তার মানে বাবা মারা যাওয়ার পর এসেছেন। আগে তা হলে কোথায় থাকতেন?
‘আপনার আত্মীয়স্বজন, ছেলেমেয়ে…!’
‘নেই।’
‘আপনি অবিবাহিতা?’
প্রশ্নটা করেই শ্বাসবন্ধ করে উত্তরের অপেক্ষায় রইল। জিজ্ঞাসা করাটা বোধহয় গর্হিত হয়ে গেল।
মিনতি করের চাহনিটা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এল নিবিয়ে দেওয়া সলতের আগুনের মতো। চোখের মণিদুটো গাঢ় হয়ে উঠল। মাথাটা একটু নুয়ে পড়ল।
অনন্ত আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। উত্তেজনার আধিক্যে সে বলে ফেলল, ‘ওই ছবিটা কার, আপনার স্বামীর?’
প্রশ্ন করেই মায়ের মুখটা একবার তার চোখে ভেসে উঠল। বাবার গোপন জীবনের মধ্যে সে ঢুকতে যাচ্ছে। উচিত কি অনুচিত, বুঝতে পারছে না। সে অঘোর এস্টেটের কর্মচারী, ভাড়া আদায় করতে এসেছে। তার সামনে এমন একজন যিনি আইনত ভাড়াটে নন। সেইভাবেই তার আচরণ, কথাবার্তা হওয়া উচিত নয় কি? কারোর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকার তার নেই।
তবে ওঁকে অঘোর এস্টেটের একজন কর্মচারী এমনভাবে ঠকিয়েছে যেটা ধরা ওঁর পক্ষে সম্ভব নয়। দোষটা ওঁর নয়। অনন্ত তার অনভিজ্ঞতা সত্ত্বেও বুঝতে পারছে তার তরফ থেকে বলার কিছু নেই।
কিন্তু সে বাবার জীবনেরই একটা অংশ। ওই ছবিটায় তারও এক ধরনের অধিকার আছে। সুতরাং সে জিজ্ঞাসা করতে পারবে না কেন?
‘উনি আমার কেউ না অথচ সব।’
মৃদু স্বরের কথাগুলো চন্দনের গন্ধের সঙ্গে ভেসে অনন্তের রোমকূপগুলোয় ধীরে ধীরে থিতিয়ে বসল। অযথা একটা ভার তার শরীরকে ক্লান্ত করতে শুরু করল। সে চুপ করে থাকল।
‘জীবনটা একসময় বড়ো ছোটো মনে হত, সময় কীভাবে যেন হু হু করে চলে যেত।’
মিনতি কর আবার মুখ ফিরিয়ে ছবিটার দিকে চেয়ে রইলেন। অনন্ত, ওঁর ডান চোখের কিনারা বাষ্পে চকচক করছে, দেখল।
‘পাশের বাড়িতে ওঁরা থাকতেন, ছোটো থেকে আলাপ। আমাদের বিয়ে হবে ঠিক ছিল, হয়নি।’
‘কেন?’
‘আমার নামে অনেক কিছু রটনা করেছিল ওঁর ভাই, উনি তা বিশ্বাস করেছিলেন। তখন আমার উপর রেগে তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলেন।…পরে অবশ্য ভুল বুঝতে পারেন।’
‘আপনি বিয়ে করেননি?’
মিনতি কর ধীরে মাথা নাড়লেন।
‘মেয়েরা একজনকেই ভালোবাসে।’
‘ওঁর বউকে দেখেছেন।’
‘না।’
অনন্ত ইতস্তত করে বলল, ‘ওর পরিবার সম্পর্কে কিছু জানেন না?’
‘খুব বেশি নয়। দুটি ছেলে দুটি মেয়ে জানি, তারা স্কুলে পড়ে। বড়োটি হয়তো এখন কলেজে।’
‘তারা কি আপনার কথা জানে?’
‘বোধ হয় না।’
মিনতি কর উঠে ছবিটার কাছে গেলেন। দু—তিনটে ধূপ নিবে গেছে, দেশলাই জ্বেলে ধরালেন।
