কিছুদিন হল অনীশ অফিসের ছুটির পর টালিগঞ্জে বলাকাদের বাড়ি ঘুরে শেষ মেট্রোয় বাড়ি ফিরছে।
‘এগুলো কিনতে নিউ মার্কেটে গেছলুম। দ্যাখো তো কেমন হল। দুটো বেডকভার, তোমাদের আর দাদুর খাটের জন্য, রোববার পেতে দিয়ো। পুরোনোগুলোর যা চেহারা হয়েছে। আর ফ্ল্যাটটা একটু পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন করে রেখো, রান্নাঘরটাও। বলাকার মা আসতে পারেন।’
অনীশ স্নান করতে যাওয়ার পর ভারতী বেডকভার দুটো খুলে যখন দেখছে তখন পুলিন ফিরে এল। ভারতী মুগ্ধ চোখে বলল ‘এই দ্যাখো, অনি কিনে আনল। সুন্দর না? ময়ূরগুলো কত বড়ো বড়ো, চার কোণে চারটে হরিণ সঙ্গে বাচ্চচা।’
পুলিন একটা বেডকভার হাতে নিয়ে দুই আঙুল দিয়ে কাপড় ঘষে ভারী গলায় বলল, ‘দামি, দুটো শ—পাঁচেক টাকা তো হবে, আমাদের ঘরে বেমানান, তুলে রাখো এখন, বাবার চোখে যেন না পড়ে। দেখতে পেলে খ্যাচ খ্যাচ করবে টাকার ছেরাদ্দ হচ্ছে বলে।’
অনি কলঘর থেকে বেরিয়ে ওদের দু—জনের পাশ দিয়ে ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, ‘পছন্দ হয়েছে?’
‘খুব সুন্দর।’ ভারতী উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল, ‘এত দামি জিনিস কিনতে গেলি কেন?’
‘ওদের দেখাবার জন্য।’
অনীশ ঘরে ঢুকে গেল। পুলিন আর ভারতী পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল বিভ্রান্তের মতো। অনীশ এখন খাটে শুয়ে সকালের দুটো ইংরেজি খবরের কাগজ উলটেপালটে দেখবে, পড়বে। তারপর নীচু স্বরে টেপ রেকর্ডারে চোখ বুজিয়ে কিছুক্ষণ শুনবে কোনো খেয়াল বা ঠুংরি। ততক্ষণ পুলিন ও ভারতী বারান্দায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বা টুলে চুপ করে বসে থাকবে, কাশীনাথ তার ঘরে তখন টিভি দ্যাখে।
আজ বারান্দায় পুলিনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নীচু গলায় ভারতী বলল, ‘চণ্ডীবাবুর কাছে গেছলে?’
পুলিন বলল, ‘গেছলুম। যা দেখলুম আমাদের পক্ষে ওভাবে থাকা সম্ভব নয়। স্বামী—স্ত্রী তিনটে ছেলে। দশ, আট আর চার বছরের। একটা মাত্র শোওয়ার ঘর। রান্নাঘরটা টালির চালের। তক্তপোশটার প্রতি পায়ায় তিনটে ইট। ওর নীচে দুটো ছেলে ঘুমোয়। ছোটটাকে নিয়ে ওরা তক্তায় শোয়। ওভাবে আমরা খাটের নীচে শুতে পারব না।’
‘কেন পারব না! তিনটে ইটের ওপর খাট থাকলে সেটা কী কম উঁচু হবে? হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকা যায়।’
‘তুমি বেঁটে, পারবে আমি পারব না।’
‘তুমি হামাগুড়ি দেবে কেন, মেঝেয় শুয়ে একপাক গড়িয়ে গেলেই ঢুকে যাবে। খাটের তলায় বসে তো আর নাম জপ করবে না, শুধু শোবে।’
‘তাহলে বাবাকে গিয়ে তুমি বলো।’
‘আমি! পাগল হয়েছ, সেদিন বললেন কুচুটে বুদ্ধি, এবার বলবেন ডাইনি বুদ্ধি। তার থেকে তুমিই বলে দেখো।’
পুলিন আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে রইল। একটু পরে ভারতী বলল, ‘নীচের উমার মা জিজ্ঞেস করল বিয়ের পর অনি কি এ বাড়িতেই থাকবে, না বড়ো ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অন্য কোথাও থাকবে?’ গলা আরও নামিয়ে এরপর সে বলল, ‘অন্য কোথাও থাকলে তো ভালোই। তাতে ওরও সুবিধে আমাদেরও সুবিধে।’
‘সুবিধে তো হবেই। ও যে মাপের চাকরি করে তাতে এইরকম বাড়িতে থাকা মানায় না, এতে সম্মান নষ্ট হবে । কত বাইরের লোকজন আসবে তাদের বসাবে কোথায়? যখন ছাত্র ছিল তখন বন্ধুরা এলে দাদুর ঘরে বসাত। বাবা খালি গায়ে লুঙ্গি পরে থাকত। অল্পবয়সি ছেলেরা ওদিকে তাকাতই না। কিন্তু এখন অনির স্ট্যাটাস তো অন্যরকম। ওর নিজেরই উচিত সল্টলেক ফল্ট লেকের দিকে ফ্ল্যাট ভাড়া করে চলে যাওয়া। নিশ্চয় ও ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের আগেই ভেবেছে তবু ওকে একবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস কোরো।’
যতটা সম্ভব গলা চেপে ভারতী ঝেঁঝেঁ উঠে বলল, ‘সবসময় তুমি বলো তুমি জিজ্ঞেস করো, তোমার এই কুঁকড়ে পিছিয়ে যাওয়া স্বভাবের জন্যই ব্যবসাটা লাটে ওঠে। সেই সময় থেকেই বাবা আমাদের সঙ্গে শেয়াল কুকুরের মতো ব্যবহার শুরু করেন। ওনাকে দোষ দোব কী, কষ্ট করে রোজগারের অতগুলো টাকা যদি নর্দমা দিয়ে চলে যায় তাহলে দাগা পাবেন না? তিন ঘরের কো—অপারেটিভ ফ্ল্যাট পেয়েও পেলেন না, সেই দুঃখ কী কোনোদিন ভুলতে পারবেন?’
গলায় উঠে আসা বাষ্প চাপতে চাপতে ভারতী থেমে গেল। পুলিন অপ্রতিভ। ছাব্বিশটা বছর কেটে যাওয়ার পর, ট্রানজিসটার তৈরি করে ব্যবসায়ী হবার উচ্চচাকাঙ্ক্ষা ধুলোয় লুটিয়ে পড়ার পর, ভারতী তাকে ধিক্কার দিল। এতগুলো বছর তাহলে সে মনে মনে স্বামীকে কী চোখে দেখেছে, কত অশ্রদ্ধা করেছে? বারান্দার পাঁচিল আঁকড়ে পুলিন ভিতরে ভিতরে ধসে পড়তে লাগল। কথাগুলো এতকাল না বলে পুষে রেখেছিল কেন, সম্পর্কটা সুন্দরভাবে ধরে রাখার জন্য? আর ক—টা বছরই বা বাঁচব! ততদিন কি ভারতী তার ক্ষোভ, রাগ ধরে রাখতে পারত না।
আড়চোখে পুলিন তাকাল। রাস্তার আলো আবছা হয়ে লেগে রয়েছে ভারতীয় মুখে, শক্ত হয়ে রয়েছে চোয়াল, এক দৃষ্টে সামনে তাকিয়ে। একটি কথাও না বলে পুলিন ঘরের ভিতরে এল। অনীশ তার পায়ের শব্দ চোখ খুলে দেখে নিয়েই চোখ বন্ধ করল।
‘অনি একটা কথা ছিল।’
অনীশ এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। এমন গম্ভীর ব্যক্তিত্বপূর্ণ স্বর বাবার গলা দিয়ে বেরোতে পারে তার ধারণায় ছিল না।
‘বলো।’
‘তোর বিয়ে হলে আমি আর তোর মা শোব কোথায় সেটা ভেবেছিস?’
অনীশ আবার চোখ বন্ধ করে পাঁচ সেকেন্ড পর খুলে বলল, ‘তুমি ভেবেছ?’
